Skip to content

৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ক্রীতদাসকন্যার কোটিপতি হয়ে ওঠার গল্প

সি জে ওয়াকার আমেরিকার প্রথম নারী, যিনি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে কোটিপতি হিসেবে নাম লিখিয়েছিলেন। চুলের প্রসাধনী বিক্রির মাধ্যমে তিনি কোটিপতি হয়েছিলেন। তার আসল নাম সারা ব্রেডলভ। ১৮৬৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর লুজিয়ানার ডেল্টায় জন্মগ্রহণ করেন ম্যাডাম সি জে ওয়াকার। তার বাবা-মা ওভেন এবং মিনার্ভা। তার বাবা-মা ক্রীতদাস হিসেবে আমেরিকায় আসেন। তাদের পঞ্চম সন্তান ছিলেন সারা। পরবর্তীতে দাস প্রথা মুক্তির ঘোষণার পর তার পরিবার মুক্ত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত মাত্র ৬ বছর বয়সে সারা তার মা-বাবাকে হারায়। এরপর ১৪ বছর বয়সে মুসা ম্যাক উইলিয়ামসের সঙ্গে তার ১৮৮৫ সালে বিয়ে হয়। আবারও দুর্ভাগ্য হানা দেয় সারাকে। বিয়ের মাত্র ৬ বছরের মাথায় স্বামীকে হারান সারা। তখন ২ বছরের মেয়ে আলিয়া সেন্টকে নিয়ে লুইতে যান তার ভাইদের কাছ।  তাদের সহযোগিতায় সারা একটি সেলুনে কাজ শুরু করেন।

 

সেলুনে অনেক নারীই চুলের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আসতেন। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের চুল বেশি কোঁকড়ানো হওয়ায় তাদের মাথায় ময়লা জমে বিভিন্ন চর্মরোগ হয়ে থাকে।  মাথা নোংরা থাকায় অনেক নারীরই চুল পড়ে যেত। সারা যেহেতু সেলুনে কাজ করতেন, তাই এসব দৃশ্য তিনি রোজই দেখতেন। সারাও চুলের বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতেন। তখন চুলের যত্ন নেওয়ার মতো তেমন কোন ভালো প্রসাধনীও ছিল না বাজারে। 

 

নারীদের এই অবস্থা দেখে সারা ঠিক করলেন তিনি নিজেই চুলের প্রসাধনী তৈরি করবেন। ভাইদের সহযোগিতায় সারা প্রাকৃতিক উপায়ে বিভিন্ন ভেষজ দিয়ে তৈরি করে ফেলেন ‘ওয়াকার সিস্টেম’। চুলে ব্যবহৃত শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, লোশন, ভেষজ তেলসহ যাবতীয় প্রসাধনীর পরবর্তীতে সারার ওয়াকার সিস্টেম বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সেলুনে আসা নারীদের প্রাথমিক অবস্থায় সারা এসব প্রসাধনী ব্যবহারের পরামর্শ দিতেন। এরপর নারীরা সারার প্রসাধনী ব্যবহার করে সুফল পেতে থাকেন। চারদিকে নাম-ডাক ছড়িয়ে পরে সারার। কেমিক্যাল বা প্রসাধনী সম্পর্কে সারার তেমন কোন জ্ঞান ছিল না, তবুও নিজের চেষ্টা আর পরিশ্রমে সারা নিজের মেধা প্রমাণ করেন।

 

১৯০৫ সালে সারা পকেটে মাত্র ১ ডলার নিয়ে কলোরাডোর ডেনভারে চলে যান। এরপর তিনি চুল গজানোর তেল, ভেজিট্যাবল শ্যাম্পুর মতো প্রাকৃতিক চুলের প্রসাধনী তৈরির কাজে নেমে পড়েন। সেখানেই সারার সঙ্গে পরিচয় হয় সেন্ট লুইসের একজন সংবাদপত্র বিজ্ঞাপন বিক্রয়কারী চার্লস জোসেফ ওয়াকারের সাথে। পরবর্তীতে তাদের বিবাহ হয়। 

 

প্রথমে তার স্বামী তাকে বিপণন, বিজ্ঞাপন এবং মেল অর্ডারগুলোয় ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছিলেন। ১৯০৮ সালে পেনসিলভেনিয়ার পিটসবার্গে সারা তার স্বামীর সহযোগিতায় একটি বিউটি সেলুন এবং কারখানা চালু করেন। কারখানাটি সারা তার মেয়ের নামানুসারে করেন। ১৯১০ সালে সারার ব্যবসায়িক পরিধি বাড়তে শুরু করে। ১৯১১ থেকে ১৯১৯ সালের মধ্যেই কোটিপতি ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের পরিচয় গড়েন। তার নাম হয়ে যায় ম্যাডাম সি জে ওয়াকার। তার কারখানা তখন বেশ বড় হয়ে ওঠে। ১৯১৭ সালের মধ্যে তার কারখানায় ২০ হাজার নারী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে চুলের প্রসাধনী তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিলেন।

 

তিনি কর্মীদের জন্য ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাদের বিভিন্ন সময় বোনাস দিয়ে পুরস্কৃত করতেন সারা। তখনকার সময় কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের চাকরির ক্ষেত্রে অনেক বৈষম্য ও সীমাবদ্ধতা ছিল। তিনি নারী শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অবদান রেখেছেন। টাস্কিজি ইনস্টিটিউটের নারীদের জন্য বৃত্তি অর্থায়নসহ বিভিন্ন কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের প্রতিষ্ঠানে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন ম্যাডাম সি জে ওয়াকার।

 

১৯১৯ সালের ২৫ মে হাইপারটেনশনের কারণে  মাত্র ৫১ বছর বয়সে মারা যান ওয়াকার। তার মৃত্যুর পরে ১৯২০ সালের দিকে ওয়াকারের নামটি আরও বেশি পরিচিত হয়ে ওঠে। কারণ তার ব্যবসায়ের পরিধি বাড়তেই থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও কিউবা, জ্যামাইকা, হাইতি, পানামা এবং কোস্টারিকা পর্যন্ত প্রসারিত হয়েছিল তার কোম্পানি।

 

ইতিহাসে এই নারী বিখ্যাত হয়ে আছেন তার কীর্তির জন্য। ক্রীতদাসের সন্তান হয়েও কোটিপতি হয়ে নিজেকে প্রমাণ করে গেছেন এই নারী। প্রচুর খ্যাতি আর জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন তার জীবনকালে। আজ তিনি বিশ্ববাসীর কাছে রোল মডেল।