Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মানুষ তো বাঁচতে চায়

 

কলম্বাস এমনই এক সভায় উপস্থিত। সবাইকে একটা টেবিলের পাশে জড়ো করিয়ে একটি ডিম হাতে নিয়ে তিনি নাটকীয়ভাবে বললেন, এখানে কেউ এই ডিমটাকে লম্বালম্বি টেবিলের ওপর দাঁড় করাতে পারবেন?

 

সভায় উপস্থিত জ্ঞানীগুণীরা যতই চেষ্টা করেন ডিমটাকে লম্বালম্বিভাবে টেবিলের ওপর দাঁড় করাতে, ততই সেটা হেলে পড়ে আড়াআড়ি। একসময় সবাই স্বীকার করলেন, এটা অসম্ভব কাজ। কলম্বাস তখন মুচকি হেসে ডিমটাকে ঠুকুস করে লম্বালম্বি টেবিলের ওপর সাবধানে ঠুকে দিলেন। তলার দিকটা একটু ভেঙে গেল বটে, তার জন্যই ডিমটা দাঁড়িয়ে গেল টেবিলের ওপর। সবাই তখন বললেন, এ তো আমরাও পারব।

 

‘তাই তো,’ কলম্বাস বললেন, ‘যা অসম্ভব বলে মনে হয়, তা করার নিয়ম জানা থাকলে যে কেউ পারে।’

 

অর্থাৎ পন্থা জানা থাকলে আমেরিকার মতো দেশও আবিস্কার করা যায়। গল্পটা এই কারণে অবতারণা করা হলো—আমাদের দেশে মেয়েদের ক্ষেত্রেও অনেক কিছু অসম্ভব বলে মনে করা হয়। কিন্তু শিখিয়ে দিলে এবং সুষ্ঠু পরিবেশ পেলে তারাও যে কোনো কাজ পারবেন। পারবেন যে, তার প্রমাণ কিন্তু প্রতিনিয়তই আমরা নানানভাবে পাই। এক্ষেত্রে বেশ ভালো একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে ডিজিটাল প্ল্যাটফরমের উই (WE) অর্গানাইজেশন।

 

এই সংস্থাটির মাধ্যমে কোভিডের পর থেকে এখন পর্যন্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফরমে প্রায় ১০ লাখ ছোট-বড় উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখও যদি সফল হয়, সেটা কিন্তু কম বড় ব্যাপার নয়। উই সংস্থাটি দাবি করে, তাদের উদ্যোক্তারা সবাই দেশীয় পণ্য নিয়ে কাজ করছেন এবং তাদের অনেকেই এক বছরেই, মানে—২০২০ থেকে এখন পর্যন্ত লাখপতিতে পরিণত হয়েছেন।

 

আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছে এমন এক নারী উদ্যোক্তার সঙ্গে। ধানমন্ডির বাসিন্দা আমি। খাঁটি দুধ, ঘি, পনিরের খোঁজে ছিলাম অনেক দিন ধরে। একদিন পাক্ষিক ‘অনন্যা’র সন্ধ্যাকালীন অনলাইন শোতে এমনই এক উদ্যোক্তার কথা জানলাম। মেয়েটির নাম রাজিয়া। পুরান ঢাকার মেয়েটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। রাজিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানলাম, গরু নিয়ে সে ব্যবসায় শুরু করেছিল প্যান্ডেমিকের বেশ আগেই। তখন সে কেরানীগঞ্জে থাকত। কোভিডের সময় ডিজিটাল প্ল্যাটফরম ব্যবহারের মাধ্যমে সে তার ব্যবসায়কে আরো সহজে প্রসারিত করতে পারে। বুদ্ধিমতী রাজিয়া ও তার পরিবার বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে বসবাস করে আরো বড় পরিসরে ব্যবসায় করার জন্য। ৩০টি গরু তার, তা থেকে দুধ, মাখন, ঘি, চাকা পনির ও মেওয়া প্রস্তুত করে সে। সরষের তেলও করে। আমি তার কাছে সবকিছুই অর্ডার করেছিলাম কিছুদিন আগে। আমি অবাক হয়ে দেখেছি, সেসব পণ্যের মান ভীষণ ভালো। দামও ঠিকঠাক।

 

এখন রাজিয়ার মতো উদ্যোক্তা যেসব মেয়ে হতে চান, যাদের উদ্যম আছে, প্রাণশক্তি আছে, কিছু করার মরিয়া ইচ্ছা আছে, তাদের যদি ন্যূনতম পুঁজি না থাকে, ক্ষুদ্রঋণ পাওয়ার মতো জটিল প্রক্রিয়া যদি তারা না বোঝেন, তাদের যদি তথ্যপ্রযুক্তির ন্যূনতম জ্ঞান না থাকে এবং পদে পদে তারা যদি বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতার শিকার হন, তবে আমরা দেশীয় পণ্যের জন্য আরো বেশি বেশি নারী উদ্যোক্তা কী করে পাব? এই সমাজ ‘মেয়েরা পারবে না’ বলে তাদের আটকে রাখতে চায়। যাদের স্বামী, বাবা কিংবা ভাই সহযোগিতা করে, তারা তুলনামূলক কম প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। কিন্তু যাদের সেই সহযোগিতা পাওয়ার সুযোগ নেই, তাদের পথে পথে কেন কাঁটা বিছানো থাকবে? দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী যখন নারী, তখন তাদেরকে অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে গত ২০০৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ কতখানি এগিয়ে নিতে পেরেছে?

 

সরকারের উন্নয়নদর্শন হচ্ছে, কাউকে পেছনে ফেলে এগোনো যাবে না। এই দর্শনটি নির্ভর করে ফাইনান্সিয়াল ইনক্লুশন ও ডিজিটালাইজেশনের ওপর। এ দুটো ভীষণ জরুরি। এখন ডিজিটাল সক্ষমতার জন্য কী দরকার? দরকার কম্পিউটার-দক্ষতা ও ডিজিটাল সুযোগের সুবিধা। অতএব সে ব্যাপারে নারীদের প্রশিক্ষিত করতে হবে।

 

 

নারীরা অবশ্যই পারবে, কিন্তু এই প্রশিক্ষণগুলো কে দেবে? ডিজিটাল লিটেরেসির ক্ষেত্রে নারীদের এত বেশি পিছিয়ে রাখা হবে কেন? সম্ভবত আমাদের মনস্তত্ত্ব এখনো এমন বৃত্তে আটকে আছে যে, আমরা ধরেই নিই প্রযুক্তিজ্ঞান নারীদের জন্য নয়। সেই যে শুরুতে কলম্বাসের গল্পটি উল্লেখ করেছিলাম, তার মূল কথা হলো, যেই জ্ঞানকে প্রথমে অসম্ভব বলে মনে হয়, সেটা জানার পর মনে হয়—আরে, এটা এত সহজ! এই ব্যাপারটা শতভাগ প্রযোজ্য কম্পিউটার তথা ব্যাবহারিক ডিজিটাল জ্ঞানের ক্ষেত্রে। আমরা দেখেছি, এখন স্কুলে স্কুলে ডিজিটাল ল্যাব চালু হয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব বসেছে। কিন্তু সত্যিই কি আমাদের শিক্ষার্থীরা এসব ল্যাব থেকে কিছু শিখতে পারছে? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলে, অনেক স্কুলে এগুলো কেবল শো হিসেবে রাখা হয়েছে। কারণ, সেখানে এ ব্যাপারে প্রশিক্ষিত কোনো শিক্ষকই নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে ল্যাপটপ দেওয়া হলেও কোভিডের সময় দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সেগুলো প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছে বা যাচ্ছে।

 

কম্পিউটার মেশিনগুলো প্রধান শিক্ষক কিংবা অধ্যক্ষরা কাউকে দিয়ে মাঝেমধ্যে চালু করে সচল রাখার কথা ভেবেও দেখেন না। ফলে পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ-টু-আই কম্পিউটার বিল্ডিংও করে দিচ্ছে। অর্থাৎ পয়সা খরচ হচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। আমাদের গ্রামের কলেজে ইসলামিক হিস্ট্রির শিক্ষককে কম্পিউটার শিক্ষকের চাকরি দেওয়া হয়েছে। কেন? এজন্য কি শিক্ষা বিভাগের দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা উদাসীনতা দায়ী নয়? সরকার এত প্রকল্প করছে, এত কিছু দিচ্ছে, তার নিট রেজাল্ট কী হচ্ছে? দিন শেষে কারা লাভ হচ্ছে? যারা প্রজেক্টের সঙ্গে যুক্ত, যারা কেনাকাটায় যুক্ত—তারাই কেবল লাভবান হচ্ছে। অর্থাৎ যার মাধ্যমে লাখ লাখ নারীর উপকার হতো, সেটা কেবল গুটি কয়েক মানুষের পকেট ভারী করছে। সুতরাং আগে প্রশিক্ষিত শিক্ষক তৈরি করা হোক। তারপর না হয় ইকুইপমেন্ট দেওয়া যাবে।

 

আমাদের সমাজে নারীরাই আমাদের পরিবারের ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজার। সমীক্ষা বলে, পরিবারের অর্থের ৬৮ শতাংশ ব্যবহূত হয় খাদ্যে, তারপর শিক্ষায়, তারপর স্বাস্থ্য বা মেডিক্যাল খাতে। বর্তমান সরকার সামাজিক সুরক্ষা খাতে যেসব ভাতা দিয়ে থাকে, এসব সুবিধাভোগীর বড় অংশই নারী। কাজেই প্রযুক্তিকে নারীবান্ধব করার কথাটাও মনে রাখতেই হবে। কারণ, কোনো নারীকে প্রথাগত আর্থিক বা ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে দরকার ন্যাশনাল আইডি, স্মার্টফোন, কম্পিউটার। এ সকল সুযোগ সাধারণ খাতে যেসব নারী কাজ করেন তাদের জন্য। আমরা গার্মেন্টস সেক্টরে কোভিডকালে শ্রমিকদের বেতন ডিজিটাল পেমেন্ট করার ক্ষেত্রে দেখেছি, অনেক শ্রমিকই জাতীয় পরিচয়পত্র-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়েছেন। বিকাশ, নগদ ইদানীং ব্যবস্থা মানুষের টাকা আদান প্রদানের ক্ষেত্রে ডিজিটালাইজেশন পথকে সহজ করেছে বলা মনে করা হয়। কিন্তু অনেক নারীই মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের একটা রিকোয়ারমেন্ট থাকে, যাকে বলে কেওয়াইসি। অর্থাৎ নো ইওর কাস্টমার।

 

সেটা পূরণ করতে গেলেই এজেন্ট পয়েন্টে অনেক নারী নিজের তথ্য দিতে রাজি হন না, কারণ এসব তার ব্যক্তিগত তথ্য, যা দিতে তিনি নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না। এই সমস্যা ছাড়াও কেওয়াইসি জিনিসটাই জটিল এবং এগুলো ইংরেজিতে থাকে। ফলে সাধারণের বোধগম্য নয়। ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে আমাদের দেশীয় পণ্যের মাধ্যমেই নারীরা অনেক কিছু করতে পারত। কিন্তু সব সিস্টেম এবং ব্যুরোক্রেসি এত জটিল যে এগুলো সহজে সাধারণ মানুষের দরজায় পৌঁছানো যায় না। ডিজিটাল সেবায় জাতীয় পরিচয়পত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অথচ জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়েও সমস্যার শেষ নেই। এটার সংশোধনও খুব সহজ নয়। এসব সমস্যার সমাধান সরকার এত জটিল করে রেখেছে যে, সাধারণ নারীদের পদে পদে হোঁচট খেতে হয়। ছোটখাটো উদ্যোক্তা বা আনপেইড কেয়ার ওয়ার্কার যারা আছেন, যারা কখনো ঘরের বাইরে বেরিয়ে কাজ করেন না, যারা কেয়ার ইকোনমি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন, তারা ডিজিটাল সিস্টেমের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। ভেবে দেখা প্রয়োজন, প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরা তাদের আর্থিক খাতে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে পারি। কারণ জিডিপিতে তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হলে তাদের কাজের মূল্যকে সবার আগে মূল্যায়ন করতে হবে।

 

সরকার টাকা নিয়ে ঘুরছে, উদ্যোক্তা-বান্ধব হতে চাইছে। অথচ সিস্টেমকে সহজ করে না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সহজে ব্যবসায় করার পরিবেশ কেমন—এটা নিয়ে প্রতি বছর বিশ্বব্যাংক ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ রিপোর্ট প্রকাশ করে। সর্বশেষ রিপোর্টে বাংলাদেশ আট ধাপ এগিয়েছে বটে। কিন্তু ১৯০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। দুঃখজনকভাবে সহজে ব্যবসায় করার পরিবেশ তৈরিতে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে এখনো বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। অর্থাৎ, একমাত্র আফগানিস্তানের চেয়ে আমরা এগিয়ে আছি। সুতরাং এসব জায়গায় আমাদের হাত দিতেই হবে।

 

সরকার আমাদের যতখানি সুবিধা দিয়ে থাকে, তার কতটা প্রকৃতভাবে সদ্ব্যবহার করা হচ্ছে? এত রকম দুর্নীতি, এত ধরনের প্রতিবন্ধকতা কেন এখনো বিরাজমান থাকবে? ২০০-৩০০ বছরের পুরোনো আইন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংশোধন না করে চালানো হচ্ছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা তো এখনো অধরা। বহুদলীয় গণতন্ত্র নামেই রয়েছে। বলার আছে অনেক কিছু, কিন্তু বলা কি যায়?

 

আমাদের সাধারণ মানুষগুলোও খুব বুদ্ধিমান। তাদের শিখিয়ে দিলে তারা সব পারে। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণটা তো দিতে হবে। মানুষ তো বাঁচতে চায়। নিজেরাই কাজ করে খেয়ে-পরে টিকে থাকতে চায়। সুতরাং এই মানুষের দিকে সরকারকে তাকাইতেই হবে। ব্যুরোক্রেসির জন্য তো মানুষ নয়, মানুষের জন্য ব্যুরোক্রেসি। এই ব্যুরোক্রেসিকে ঢেলে সাজাতে হবে। যা-ই কিছু করা হোক না কেন—তা যেন মানুষের জন্য হয়, তা যেন মানুষের কাজে লাগে। মানুষই আমাদের একমাত্র রিসোর্স।

 

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক ইত্তেফাক ও পাক্ষিক অনন্যা