Skip to content

৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মুক্তিযুদ্ধের একমাত্র নারী কমান্ডার আশালতা বৈদ্য

 মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন এমন নারীদের নাম বলতে গেলেই যাঁর নাম বিশেষভাবে আসে তিনি হলেন আশালতা বৈদ্য। মুক্তিযুদ্ধের সময় একমাত্র নারী হিসেবে তিনি কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেছেন। পাকসেনার আক্রমণের মুখে তিনি দিয়েছেন সাহসিকতার পরিচয়। আজ আমরা তাঁর সম্পর্কে কিছু তথ্য জানবো।

 

১৯৫৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন আশালতা বৈদ্য। পিতা হরিপদ বৈদ্য ছিলেন স্কুল শিক্ষক এবং মা সরলাময়ী বৈদ্য ছিলেন গৃহিণী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন এসএসসি পরীক্ষার্থী। তাঁর বয়স ছিলো মাত্র ১৫ বছর। যুদ্ধ শুরু হলে একদিন রাজাকাররা তাঁর বাবা হরিপদ বৈদ্যর কাছে ছয় লক্ষ টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে মেয়েদের তুলে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয় তারা। হরিপদ বৈদ্য মেয়েদের বাঁচাতে সপরিবারে ভারতে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আশালতার মন অন্যকিছু চাইছিলো। যুদ্ধে যোগ দেয়ার সুযোগের অপেক্ষা করছিলেন তিনি। 

 

সেই সুযোগ পেয়েও যায় আশালতা। হেমায়েত বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা হেমায়েত উদ্দিন বীরবিক্রম আসেন হরিপদর কাছে। তিনি হরিপদকে ভারতে যেতে নিষেধ করেন এবং আশালতাকে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেন। আশালতা এই প্রস্তাবে একেবারে রাজি হয়ে যান। শুরু হয় তাঁর প্রশিক্ষণ। কোটালিপাড়ার লেবুবাড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে প্রথম প্রশিক্ষণ শুরু হয় তাঁর। এখানেই তিনিসহ মোট ৪৫ জন নারী একসাথে প্রশিক্ষণ নেন। তারপর তিনি প্রশিক্ষন নেন হেমায়েত বাহিনীর আরেকটা প্রশিক্ষনকেন্দ্র কোটালিপাড়ার নারকেলবাড়ি হাইস্কুলে। এখানে নারী পুরুষ সকলের সাথে সম্মিলিত প্রশিক্ষন নেন। তারপর গেরিলা প্রশিক্ষন নেন ভাঙ্গারহাট স্কুল প্রাঙ্গনে। আর সুইসাইড স্কোয়াড প্রশিক্ষণ নেন জহুরকান্দি স্কুলে। সর্বমোট তিন মাসের প্রশিক্ষণ নেন। এই প্রশিক্ষণে তিনি রাইফেল, পিস্তল, গ্রেনেড ও বিভিন্ন প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র সম্পর্কে প্রশিক্ষণ নেন। তাছাড়া আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবার জন্য ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষন, গোয়েন্দাবৃত্তির কৌশল এবং সুইসাইড স্কোয়াড সম্পর্কেও সব ধরনের প্রশিক্ষণ নেন তিনি।

 

যুদ্ধকৌশলের উপর তিনি পারদর্শিতা লাভ করেন। আরও ৩০০ জন মহিলাসহ মোট ৩৪৫ জন নারী মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতৃত্ব অর্পিত হয় আশালতার ওপর। বিশাল এই মহিলা মুক্তিযোদ্ধা দলের নেতৃত্ব পেয়ে আশালতা বৈদ্য দায়িত্ব পালনে দুঃসাহসিকভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেন। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত গেরিলা অপারেশনে অংশ নিতে থাকেন এবং সাহসিকতার সাথে জয়ী হতে থাকেন। প্রতিটি অপারেশনেই আশালতা দুঃসাহসিকতা, সুনিপুণতা, দক্ষতার মাধ্যমে পাকসেনাদের প্রতিহত করেন। একদিন তার বাহিনীর হাতে বহু পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয় এবং বন্দি হয় ২৫ পাকিস্তানি সেনা। বন্দী ২৫ পাকিস্তানি সেনাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিলেন আশালতা বৈদ্য।

 

তাঁর আর বঙ্গবন্ধুর গ্রাম ছিলো একই। কোটালিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মা-বাবা তাদের নিজের বাড়িতে বন্দি করে রেখেছিলো পাকিস্তানি সেনারা। এই ঘটনা জানতে পেরে আশালতা বৈদ্য নিজেই এক দুর্ধর্ষ গেরিলা অভিযান চালিয়ে বঙ্গবন্ধুর মা-বাবাকে সেখান থেকে উদ্ধার করেন এবং তাঁদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর আরেকটি দুর্ধর্ষ অভিজান ছিলো রামশীল নদী পাড়ে। রাজাকার লঞ্চে করে  কয়েক হাজার পাকিস্তানি বাহিনীকে সাথে নিয়ে আসলে আশালতা বৈদ্য এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে তাদের আক্রমণ করেন। ৩ ঘণ্টা তুমুল যুদ্ধ হয়। এখানেও জয় লাভ করেছিলো আশালতার দল। রাজাকার ও হাজার হাজার পাকিস্তানি বাহিনীকে সেদিন পরাজিত করেছিলো আশালতারা। ছোটোখাটো অনেকগুলো গেরিলা যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তিনি। এ ছাড়াও ২২টি বড় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন তিনি। 

 

যুদ্ধ শেষ হলে তিনি আবার পড়াশুনা শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে তিনি উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন শেষে নারী উন্নয়নের লক্ষে গড়ে তোলেন সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান সূর্যমুখী সংস্থা। সেবামূলক কাজের জন্য ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল পুরষ্কার বাছাই কমিটিতে মনোয়ন পেয়েছিলেন। এছাড়া তিনি শ্রেষ্ঠ মহিলা সমবায়ের প্রেসিডেন্ট স্বর্ণপদক, রোকেয়া পদক, প্রশিকা মুক্তিযোদ্ধা পদকসহ অনেক পুরষ্কার লাভ করেছেন।

 

মুক্তিযুদ্ধের সময় শত্রুর মোকাবেলা করে তিনি দেশপ্রেম ও সাহসিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর কাছ থেকে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষা নেওয়া উচিত। দুঃসাহসী এই নারী কমান্ডারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি।