Skip to content

২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ১৩ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কৃতিত্ব

মুক্তিযুদ্ধ হলো বাঙালি জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমেই আমাদের এই বাংলা স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে ওঠে। এই স্বাধীনতার জন্য আমাদের স্বীকার করতে হয়েছে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার। অনেক রক্তের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি এই স্বাধীনতা। ত্রিশ লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীন দেশ। আর এই স্বাধীনতা সম্ভব হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের কারনে। তাঁরা অপার সাহসের সাথে দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে। জীবন বাজি রেখে লড়েছেন দেশের জন্য। 

 

’৭১ এ ২৫ শে মার্চে গণহত্যার পর থেকে দেশের পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হতে শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণেই সাধারণ বাঙালিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেন। বাংলার মানুষ বুঝতে পেরেছিলো যুদ্ধ ছাড়া এখন আর উপায় নেই। তাই তাঁরা নির্বিশেষে হাতে তুল নিয়েছিলো অস্ত্র। পণ নেয় দেশকে স্বাধীন করার। সকল শ্রেণীর, সকল পেশার মানুষ তখন একসাথে যোগ দেয় যুদ্ধে। 

 

যুদ্ধে যোগদানের ক্ষেত্রে কেবল পুরুষরাই নয় নারীরাও প্রমাণ দিয়েছেন সাহসের ও দেশপ্রেমের। দলে দলে নারীরা যোগ দেয় যুদ্ধে। প্রত্যক্ষভাবে ও পরোক্ষভাবে নারীরাও অংশগ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধে। দীর্ঘ নয় মাস সময়ে নারীরা লড়েছেন কখনো সামনে থেকে আবার কখনো বা আড়াল থেকে। কখনো তারা পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছেন সম্মুখে, কখনো বা আশ্রয়, খাদ্য দিয়ে সাহায্য করেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের, কখনো বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছেন, কখনো বা অন্যদের প্রেরণা দিয়েছেন যুদ্ধে যাবার জন্য। আবার এই নয় মাসে অনেক নারী পাকসেনাদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। দুই লক্ষ মা বোন হারায় সম্ভ্রম। 

 

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ নারীরই নাম রয়ে গেছে অজানা। মুক্তিযুদ্ধের সময় কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে পরিচালিত বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রীরা সারাদেশেই তৎপর ছিলেন। তাঁরা বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষদের বিভিন্ন তৎপরতার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত হবার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ ও সংগঠিত করেছেন। মমতাজ বেগম, কাজী রোকেয়া সুলতানা, বেবী মওদুদ, রানী খান, রোকেয়া কবীর, মনিরা আক্তার প্রমুখ নারীরা জনমত গঠনের পাশাপাশি ফিজিক্যাল ফিটনেস, মার্চ পাস্ট, অস্ত্র চালনা, ফাস্ট এইড, ট্রেঞ্চ করা এবং আত্মরক্ষার নানা কৌশলের ব্যাপারে ট্রেনিং নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় শিক্ষা দিতেন।

 

বদরুন্নেসা আহমেদ পুনর্বাসন কার্যকলাপ ও মহিলা সংগঠন মুজিবনগরের সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন একাত্তরে। সাজেদা চৌধুরী তার বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতেন। সেই সঙ্গে সচেতন করতেন কোন কোন বিষয়ে তারা বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রীতিরানী দাস পুরকায়স্থ মুক্তিযুদ্ধে মহিলা মুক্তিফৌজের হাল ধরেছিলেন। এ মহিলা কমিটি মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রেখেছিল। এ কমিটির প্রীতিরানী দাস পুরকায়স্থ ছাড়াও গীতারানী নাথ, নিবেদিতা দাস, সুধারানী কর মঞ্জুদেবী, সুষমা দাস ও রমা রানী দাসের নাম উল্লেখযোগ্য। নাজিয়া ওসমান চৌধুরী কুষ্টিয়া রণাঙ্গনে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। সেলিনা বানু সশরীরে উপস্থিত হয়ে যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখা এবং শরণার্থীদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগাতে তৎপর ছিলেন। 

 

এছাড়াও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে নারীরা অনুপ্রেরণা দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধাদের। গান, কবিতার মাধ্যম তারা সাহস জুগিয়েছেন যোদ্ধাদের। অনেক মা, স্ত্রী, বোন জীবন যেতে পারে জেনেও বাধা দেননি তাদের পরিবারের সদস্যদের যুদ্ধে যেতে। বরং দিয়েছেন অনুপ্রেরণা। তাঁদের মধ্যে জাহানারা ইমাম, সুফিয়া কামাল উল্লেখযোগ্য। 

 

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ কেবল নয় মাসের ঘটনা নয়। প্রকৃতপক্ষে ২৪ বছরের শোষণ, নির্যাতনের শেষ উত্তর ছিলো এই যুদ্ধ। পাকিস্তানি শাসনের পরাধীনতা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিলো এই যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত জয় হয় বাঙালিদের। বিজয় লাভ করে মুক্তিযোদ্ধারা। পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্ত হয় দেশ। আমরা পাই স্বাধীন বাংলা। মুক্তিযুদ্ধে নারীদের এই অংশগ্রহণ না থাকলে হয়তো আমরা এই স্বাধীনতা অর্জন করতে পারতামনা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো যে সকল নারী মুক্তিযোদ্ধারা এই স্বীকৃতি পাননি। খেতাবে ভূষিত হয়েছেন মাত্র দুইজন। ডাঃ সেতারা বেগম ও তারামন বিবিকে ‘বীরপ্রতীক’ খেতাব দেয়া হয়েছে। 

 

মুক্তিযোদ্ধাদের এই ঋণ আমরা কখনোই শোধ করতে পারবোনা। তাঁদের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাই। তাঁদের দেয়া এই স্বাধীন দেশকে আরো এগিয়ে নিয়ে যেতে আমরা সর্বক্ষণিক চেষ্টা করবো।