Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

একজন ‘রানী হামিদ’

দাবা! বুদ্ধির লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে কিস্তিমাত করেই দেখা মেলে কাঙ্ক্ষিত বিজয়ের। আর কিস্তিমাতে বিজয় ছিনিয়ে আনতে যার জুড়ি নেই তিনি হলেন বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দাবা সাম্রাজ্যের রানী 'রানী হামিদ'। সত্তুরোর্ধ্ব এই জীবন্ত কিংবদন্তি'র জন্মই যেন হয়েছে  সাদা- কালোর লড়াইয়ে সাম্রাজ্য জিতে নিতে। তিনি বাংলাদেশের প্রথম মহিলা আন্তর্জাতিক দাবা মাস্টার। ত্রিশ বছরের বর্ণিল ক্রীড়া জীবনে অলিম্পিয়াড, কমনওয়েলথ ও বিশ্ব গিনিজ বুকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাঁর নাম।

সিলেটের সৈয়দ পরিবারে ১৯৪৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এই কিংবদন্তি জন্মগ্রহণ করেন। চায়ের দেশে জন্ম গ্রহণ করলেও তাঁর শৈশব কেটেছে বহু জেলায় ঘুরে ঘুরে বাবার চাকরির সুবাদে। বাবা সৈয়দ মমতাজ আলী ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। মূলত বাবার খেলাধুলার পারদর্শিতা এবং বাড়ির খেলাধুলার পরিবেশে রানী হামিদ ছেলেবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি উৎসাহী ও আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং মা কামরুন্নেছা খাতুনও এতে বিরূপ ভাব প্রকাশ করেননি। 

চার ভাই ও চার বোনের মাঝে তৃতীয় ছিলেন 'সৈয়দা জসিমুন্নেসা খাতুন'।  তাঁর ডাক নাম ছিলো রানী, যে নামেই আজ তাকে দুনিয়া শ্রদ্ধাভরে সম্বোধন করে। তাঁর বাবা রোজ সন্ধ্যায় বন্ধুদের সাথে দাবা খেলতেন, সেই থেকেই প্রথম পরিচয় দাবার সাথে। বাবার কাছেই দাবা খেলার হাতে খড়ি, শৈশবেই এ খেলা তাঁর মন জয় করে নেয়। যদিও প্রতিযোগিতামূলক দাবা খেলায় তিনি অংশগ্রহণ করেছেন শৈশব কৈশোর ছাড়িয়ে তিন দশক পরে। ৫২ এর ভাষা আন্দোলনের উত্তাল সময়ে চট্টগ্রামের নন্দনকানন গার্লস হাইস্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শুরু হয়। এর দু বছর পরেই বদলে যায় তার বিদ্যালয়ের ঠিকানা, এবারে কুমিল্লা ফয়জুন্নেসা গার্লস হাই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন এবং পরবর্তীতে রাজশাহীর আরো একটি বিদ্যালয় ঘুরে সিলেট বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন।

এরই মাঝে মাধ্যমিকের গণ্ডি না পেরুতেই মাত্র পনের বছর বয়সে তৎকালীন নৌ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল হামিদের সঙ্গে বিয়ে হয় তাঁর। যদিও এই পরিণয় তাঁর জীবনে আশীর্বাদ হয়েই এসেছিলো। মোহাম্মদ আবদুল হামিদ ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর একজন খ্যাতনামা সাঁতারু এবং বাংলাদেশ হ্যান্ডবল ফেডারেশনের সভাপতি। ক্রীড়াঙ্গনে স্বামীর এই পদচারণও তাঁর ক্রীড়া জীবনের সূচনায় সহায়ক ছিলো। বিয়ের পর তিনি নিছক সাংসারিক চাল ডালের হিসেবে হারিয়ে যাননি, ইডেন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ডিগ্রী সম্পন্ন করেছেন এবং স্বামীর অনুপ্রেরণায় প্রতিযোগিতামূলক দাবায় ও অংশগ্রহণ করেন। ভালোবেসে স্বামীর নাম জুড়ে নিয়ে হয়ে ওঠেন  'সৈয়দ জসিমুন্নেসা খাতুন' থেকে 'রানী হামিদ'।

প্রথম বার প্রতিযোগিতামূলক খেলায় অংশগ্রহণ করেন ১৯৭৬ সালে যখন তিনি তিরিশে পা রেখেছেন, কোল জুড়ে চার সন্তান। প্রথমবারেই নবদিগন্ত সংসদের এস এ মহসিন স্মৃতি দাবা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নশিপ অর্জনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর বর্ণিল দাবাড়ু জীবন। এ সাফল্য তাকে অনুপ্রেরণা এবং উৎসাহ যোগায়। কঠোর অনুশীলনে নিজেকে প্রস্তুত করে তোলেন তিনি। এক হাতে সামলেছেন সংসার সেই সাথে ঘোড়ার আড়াই চালটাও আঙুলের ডগায় তুলে নিতে ভুলে যাননি।  

পরবর্তীতে নবদিগন্ত সংসদ দাবা ফেডারেশনের উদ্যোগে নারীদের জন্য আয়োজিত প্রতিযোগিতায় পর পর তিনবার ১৯৭৭সাল , ১৯৭৮ সাল ও ১৯৭৯ সালে রানী হামিদ চ্যাম্পিয়ন হন। এর পর আর তিনি পেছনে ফিরে তাকাননি, একের পর এক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন এবং অর্জিত কৃতিত্ব ছড়িয়েছেন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে। ১৯৮১ সালে প্রথমবার তিনি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ করেন। 

এরপর তিনি অংশগ্রহণ করেন চেজ অলিম্পিয়াডে এবং ১৯৮৪ সাল, ১৯৮৬ সাল এবং ১৯৯২ সালে পর পর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হন। ব্রিটিশ মহিলা দাবা প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন ৩ বার। জাতীয় মহিলা দলে চ্যাম্পিয়ন হন ১৮ বার। ১৯৮৪ সালে আন্তর্জাতিক 'ফিদে' খেতাব অর্জন করেন এবং ১৯৮৫ সালে তিনি ফিদে আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার খেতাব পান।

২০১৫ সালে কমনওয়েলথ দাবা চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৫  তে অর্জন করেন স্বর্ণ পদক। তিনি বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে শুধু মহিলা দলই নয়, জাতীয় দলের হয়ে অংশ নিয়েছেন যে সম্মান বিশ্বের খুব কম মহিলা দাবাড়ু- ই রয়েছে। তাঁর বর্ণিল ক্রীড়া জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি লিখেছেন বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক দাবা খেলার ওপর বই 'মজার খেলা দাবা'  এবং আরো একটি বই তিনি উপহার দিয়েছেন 'দাবা খেলার আইন কানুন'। তিনি শুধু একজন সফল দাবাড়ু-ই নন, একজন সফল মা ও। তাঁর দুই পুত্র বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের এক এক জন উজ্জ্বল নক্ষত্র। 

রানী হামিদ বর্তমান প্রজন্মকে আহ্বান জানিয়েছেন দেশকে ভালো কিছু উপহার দিতে, মেয়েদের আহ্বান জানিয়েছেন সকল বাঁধা শেকল পেরিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে সফলতা অর্জন করতে।
সকল প্রতিবন্ধকতা  নেতিবাচকতাকে পেছনে ফেলে এই ’অনন্যা’ বিশ্ব দরবারে উড়িয়েছেন জয়ের পতাকা, উজ্জ্বল করেছেন স্বদেশের নাম। একজন 'রানী হামিদ'  হয়ে উঠেছেন সকলের অনুপ্রেরণার গল্প।