Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

বাড়িই শিশুর প্রথম আর প্রধান শিক্ষালয়

জন্মের পর একটি শিশু বাড়িতে তার পরিবারের সাথে বেড়ে ওঠে। বলতে গেলে পরিবারের মাধ্যমে সে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। শিশুর সামাজিকীকরণে পরিবারই প্রাথমিক ভূমিকা পালন করে। শিশুর সকল শিক্ষার হাতেখড়ি তার বাড়িতেই হয়। বাড়ি শিশুর প্রথম আর প্রধান শিক্ষালয় এবং পরিবারের সদস্যরা হলেন শিশুর প্রথম ও প্রধান শিক্ষাগুরু। তাই শিক্ষাগুরুকে তার শিষ্যকে সঠিকভাবে শিক্ষা দিতে হবে। পারিবারিক শিক্ষাই একটি শিশুর ভবিষ্যৎ মানসিক গঠনে প্রভাব রাখে। তাই শিশুর সামাজিক গঠনে বাড়ির সদস্যদের বিশেষ নজর দিতে হবে।

 

বাড়ির সদস্যদের কাছ থেকে শিশু যে শিক্ষা পায় তা তাকে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে সাহায্য করে। আর পরিবারের ভঙ্গুর শিক্ষা শিশুর পরবর্তী জীবনে বিভিন্ন বাধাবিপত্তির সৃষ্টি করে। সুতরাং শিশুর বিকাশে বাড়ি থেকে সঠিক শিক্ষাটা আসা অত্যন্ত জরুরি। শিশুকে সঠিকভাবে সামাজিক গড়ে তুলতে পারলেই তার সঠিক বিকাশ সম্ভব। এছাড়া পরিবারেই মানবিক গুণাবলির বীজ বপন হয়ে থাকে। তাই শিশুর মানবিক গুণাবলি গঠনেও পরিবার বিশেষ করে মা-বাবার অনেক অবদান রয়েছে। পারিবারিক নিয়ম, শৃঙ্খলা, ভালোবাসা, সহযোগিতা, সহানুভূতি, অনুপ্রেরণার মাধ্যমেই একজন শিশু সমাজে প্রত্যাশিত আচরণ করতে শেখে। 

 

বাড়ির সকল সদস্যরা সমাজ ও সামাজিক অভ্যাসকে শিশুর কাছে পরিচিত করে তোলে। আমাদের আচরণ, অভ্যাস, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি পারিবারিক শিক্ষারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার দিন থেকে শুরু করে স্কুলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন পর্যন্ত শিশুর যে বিকাশ হয়, তা জীবনের অন্য যেকোনো পর্যায়ের থেকে বেশি। এই সময়ে শিশু যদি তার বাড়ি থেকে ইতিবাচক শিক্ষা না পায় তাহলে তার বিকাশ সঠিকভাবে ঘটবেনা। ভবিষ্যতে তাকে যেমন নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে ঠিক তেমনি সে নিজেও অন্যের সমস্যার কারণ হতে পারে। সমাজে যেকোনো অপরাধ পারিবারিক সঠিক শিক্ষার অভাবেই সংঘটিত হয়।

 

সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর-তরুণ ও বিভিন্ন বয়সের মানুষেরা নিষ্ঠুর হয়ে উঠছে তার জন্য পরিবারই বেশি দায়ী। বর্তমানে ধর্ষণ, হত্যা, নারী নির্যাতনের মতো অপরাধ যেন দেশকে পেয়ে বসেছে। কিন্তু এসবের মূল কারণ দেখতে দেখতে গেলে পরিবারকেই খুঁজে পাওয়া যাবে। পারিবারিক সুসম্পর্কের অভাব, নারীর প্রতি অবজ্ঞার মানসিকতা, মূল্যবোধের অভাব এসব কারণ অপরাধ প্রবণতা দিন দিন বৃদ্ধি করছে। পারিবারিক ভাবেই যদি তাকে শিশু অবস্থায় সঠিক শিক্ষা দেয়া হতো তাহলে হয়তো আজ সে অপরাধী হিসেবে তৈরি হতোনা। কোনও শিশু যদি ছোটো থেকেই দেখে আসে নারী হওয়ার কারণে বাড়িতে তার মাকে কেউ সম্মান করছেনা, অবজ্ঞা করছে তাহলে সেই শিশুও বড় হয়ে নারীকে সম্মান করতে পারবেনা।

 

 আবার সে যদি দেখে তার মা স্বামীর দ্বারা শারীরিকভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে তাহলে তার মাঝেও এই মানসিকতা তৈরি হবে। আবার কোনও ছেলে শিশু যদি দেখে বাড়িতে তার বোনকে তার চেয়ে কম পরিচর্যায় করা হচ্ছে, তার মতো পূর্ণ স্বাধীনতা দেয় হচ্ছেনা তাহলে সেও এটাই ধরে নিবে মেয়েরা হয়তো প্রকৃতিগত ভাবেই পরাধীন। ভবিষ্যতে কোনও নারীর প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি সেভাবেই গঠন হবে। সুতরাং শিশুর সঠিক মানসিকতা গঠনে বাড়ির পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। বাড়ির পরিবেশ যদি সহায়ক না হয় তাহলে শিশুর ভবিষ্যতে অপরাধ-প্রবণ হওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। ধর্ষণ, হত্যা, নারী নির্যাতনের মতো বর্তমানে সাড়া জাগানো অপরাধগুলো প্রতিরোধে পরিবারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। 

 

পারিবারিক দৃঢ় সম্পর্ক শিশুর জীবনে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এটি তার বিকাশেও বড় ভূমিকা রাখে।  শিশুরা হয় অনুকরণপ্রিয়। বাড়ির বড়দের কাছে কারা যা দেখবে তাই শিখবে। অনেক সময় সম্পর্কের ভাঙ্গন শিশুর মনে গভীর প্রভাব রাখে। আমাদের দেশের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী বাবা-মার ডিভোর্সের কারণে একটি শিশুকে সামাজিক হেনস্তার সম্মুখীন হতে হয়। এতে করে তার মনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। মানসিকভাবে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে সে। 

 

আবার যেসব পরিবারে ঝগড়া-ঝাটি, হানাহানি, বিদ্বেষ এসব বেশি থাকে সেসব পরিবারের শিশুদের বিকাশ সঠিকভাবে হয় না। আর এইসব পরিবারের শিশুদের সামাজিক মূল্যবোধের মত তাৎপর্যপূর্ণ গুণাবলিও গড়ে ওঠে না। আর এরাই সমাজে বিশৃঙ্খলা ও হানাহানির সৃষ্টি করে। তাই, আমাদের মূল্যবোধ গড়ে ওঠার পেছনেও আমাদের বাবা-মার ভূমিকা রয়েছে। আরেকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে তা হলো ধর্মীয় শিক্ষা। ধর্মীয় শিক্ষা সকল অপরাধ ও খারাপ কাজ থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দেয়। বাড়ির সদস্যদের মধ্যে নৈতিকতা ও আদবকায়দার চর্চা না থাকলে শিশুটিও এই গুণগুলোতে অভ্যস্ত হতে পারবেনা। তাই বাড়িতে থেকে শৈশবেই শিশুকে এসব আদবকায়দার শিক্ষা দিতে হবে। আবার আদর ও শাসনের ভারসাম্য অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতি আদর শিশুকে নষ্ট করে দিতে পারে। আবার শাসনের বাড়াবাড়িতে শিশু বখে যেতে পারে। সুতরাং শিশুর মানবিক গঠনে বাড়ির সদস্যদের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে হবে।

 

একজন মানুষের জীবনে বাড়ি বা পরিবার হলো সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়। আর সেই বিদ্যালয়ের দক্ষ এবং একনিষ্ঠ শিক্ষক আমাদের বাবা-মা। তাদের সঠিক নির্দেশনাতেই একটি শিশু সমাজে বসবাস করার যোগ্য সঠিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। বড়ি সবচেয়ে ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান হলেও জাতি গঠনে এটি সুদূরপ্রসারী অবদান রাখে। সুতরাং বাড়ির সকল সদস্যদের একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে শিশুকে সঠিক শিক্ষা দিতে হবে।
 

 

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ