Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ফিন্নি ফুপু

 

 

ফিন্নি ফুপু আমার বাবার চাচতো বোন। দাদারা দু’ভাই। আগে একান্নবর্তী ছিল। দাদারা মারা গেলে দুইপরিবার পৃথক হয়ে যায়। মূল বাড়িটাতে বড়দাদার ছেলেরা থাকে। বড়দাদা যদিও রেলওয়ের বড়বাবু ছিলেন তবুও আমার দাদির ধারণা আমার ভুলোভালা দাদাকে ওরা ঠকিয়েছে। জমাজমির ভাগ সঠিক হয়নি। তাই দাদির ভয়ে ওবাড়িতে আমাদের লুকিয়ে চুরিয়ে যাওয়া লাগত।

‘ওরে পাপ! পাপ! কেউ না দেখলেও আল্লা দেখছে। আরও কত আল্লা দেখায় বেঁচে থাকলে দেখব’ – দাদি ফিন্নি ফুপুর ওইদিনের ঘটনা শুনে মন্তব্য করল।

 

আমার বাবারা তিন ভাই দুই বোন। বড় দাদার চার ছেলে আর এক মেয়ে। মেয়েটা ছোট। ফিন্নি। দুধের ফিরনির মত গায়ের রঙ নিয়ে জন্মেছিল বলে নাম রাখা হয়েছিল ফিরনি। ফিরনি থেকেই ফিন্নি। আমার নিজের দুই ফুপু বাবাদের বড়। দুধের ফিরনি না হলেও তারা নলেন গুড়ের ফিরনি তো বটেই। দূর গাঁয়ের অবস্থাপন্ন কৃষক পরিবারে তাদের বিয়ে হয়েছে অনেক আগেই। বাবা স্কুলমাস্টার, মেজ চাচা কলেজের লাইব্রেরিয়ান। ছোট চাচা বিলু পাগল। মানে অটিস্টিক। দাদি যেখানেই যায় দাদির আঁচল ধরে সে পেছন পেছন যায়। দাদির ধারণা এই ছেলে পেটে এলে তার ওবাড়ির জা গোপনে তার চুল কেটে নিয়ে তুকতাক করেছিল।  

‘ওপরাআলা সব দেখে। না হলে বিয়ের এগার মাসের মাথায় ফিন্নি বিধবা হয়? বিধবা তো গ্রামে আরও কতজন আছে, কজন পাগল হয়েছে? কজন গু মুত ঘাটছে?’ দাদি হা করে মুখের চিবানো পানের ওপর দু’আঙ্গুলের ডগায় একফোটা দোক্তা ধরে আলতো করে ছেড়ে দেয়। মুহূর্তে ঠোঁট লাল টুকটুকে হলে দাদিকে একজন খুব সুখী মানুষ মনে হয়। দাদিকে ঘিরে পাড়ার কৌতুহলী বউঝিরা।

‘ফিন্নির মত সুন্দরী এ গ্রামে দুটো নেই। তারই কিনা এই হাল হলো?’

‘শুধু সুন্দরী হলেই হয় না লো, কপাল লাগে, কপাল। আমার মেয়েরা দেখ গিয়ে রাণির হালে আছে। তখন এত করে বললাম আমার বড়বেটার সাথে ফিন্নির বিয়েটা দাও। না, তারা রেলের বাবু চায়। কী হলো? রেলের বাবু রেলেই কাটা পড়লো। শেষে মেয়েটাও পাগল হলো। অভিশাপ! অভিশাপ!’

‘ও দাদি, তা তোমার পাগলটার সাথে এবার ফিন্নির নিকে দিয়ে দাও না কেন?’

‘হ্যাঁ, এক পাগল নিয়েই বাঁচি না, আরেক পাগলের হাগামুতা সাফ করি আরকি। ও কথা কেউ মুখে আনবি না।‘

‘তা ফিন্নি তো আর আল্লার তিরিশ দিন পাগল থাকে না। পুন্নিমা আমাবশ্যায়…’

‘যা, বাড়ি যা সব। তোদের এত মায়া হলে নিজেদের ভাতারের সাথে নিকে পড়িয়ে দে গে’।

বড়দাদার বাড়ি বলে ওবাড়িকে আমরা বড়বাড়ি বলতাম। দাদির ভয়ে আমরা সোজা রাস্তা দিয়ে না ঢুকে কুমোরপাড়ার ভেতরের সরু গলি দিয়ে বড়বাড়িতে ঢুকতাম। আমাদের দু’বাড়ির চাচাতো বোনদের যত ভাব সব ফিন্নি ফুপুর সাথে। ওবাড়ির চাচিদের চেহারা আর আচরণ অনুযায়ী একেকজনের একেক নাম। বড় চাচি বারমাস অসুস্থ থাকতো বলে মুখখানায় অরুচি অরুচি ভাব। নাম অরুচি চাচি। আরেকজন একবার ইঁদারায় পড়ে গিয়েছিল বা নিজেই রাগের মাথায় কিছু অকাম করতে নেমেছিল বলে তার নাম ইন্দিরা চাচি। মেজচাচির মাথাভরা বুরুশের মত কোকড়া চুল তাই কোকড়া চাচি। কোকড়া চাচি ফিন্নি ফুপুর কোন দোষ ধরতে নারাজ। ঐদিন আমরা গিয়ে দেখি শাদা ধবধবে থান পরা ফিন্নি ফুপুকে বা হাতে জড়িয়ে ধরে ডান হাত দিয়ে ভাত মাখিয়ে আদর করে খাইয়ে দিচ্ছে কোকড়া চাচি। আমাদের দেখলে যে উৎফুল্ল হয়ে ওঠে তার আজ কেমন উদভ্রান্ত, ক্লান্ত, অসহায় ভঙ্গী। মনে হচ্ছিল খেতে খেতেই ঘুমে ঢলে পড়ব ফিন্নি ফুপু।  

 

বড়বাড়ির চাচারা তাদের একমাত্র ছোট বোনকে সন্তানের মতই আদর করতো। কত ডাক্তার, কত কবিরাজ দেখনো হলো। হয়তো দেখা গেল এক-দেড়মাস স্বাভাবিক আচরণ তারপর হঠাৎ একদিন ফিন্নি ফুপু সবার সামনে কাপড় চোপড় খুলতে শুরু করে দিল। মুখে বিড়বিড় করে কী বলে কেউ বুঝতে পারে না। কোকড়া চাচি রোগের ধরন খানিকটা বুঝে নিয়ে পাগলামীর দু’তিনদিন ফুপুকে শুকনো খাবার দিত যাতে ঘরের মধ্যে বেশি পায়খানা করে গায়ে-মাথায় না মাখে। এ অসুখকে কেউ  হিস্টিরিয়া, কেউ জিনের আছর, কেউ বান মারা বলে আখ্যায়িত করলো। একবার এক কবিরাজকে দিয়ে ‘জলসার’ করানো হয়েছিল। আমরা জলসার কী জিনিস তা দেখার জন্য স্কুল পালিয়ে বড়বাড়ির ঢেঁকিঘরের পেছনে পেয়ারা গাছে উঠে বসে ছিলাম। দেখলাম লালসালু মাথায় পেঁচানো গলায় হরেক রঙের পাথরের মালা পরা আদুল গায়ের কবিরাজ থলে থেকে কী সব গাছের শুকনো শেকড় বের করছে। চাচিরা গোল বৃত্তের বাইরে বসা আর একটা উল্টে রাখা বড় পেতলের ঘড়ার ওপর ফিন্নি ফুপুকে বসানো। অন্য একটি ছোট পেতলের ঘড়ার মধ্যে শেকড়গুলো ডুবিয়ে তুলে কবিরাজ ফুপুর মাথায় সেই ঘড়ার পানি ঢালছে আর আওড়াচ্ছে – 

 

‘হু আল্লা নুরী, হু শব্দ করি

হু হু শব্দে যে জন নড়ে

বড় গুনাহ হবে আল্লার দরবারে

হক্ক, লা ই লাহা ইল্লাল্লাহ

 

এটার নাম জলসার। শীতের পড়ন্ত দুপুরে ফিন্নি ফুপু তিরতির করে কাঁপছিল। কবিরাজ বললো- ‘কাঁপুনির মাজেজা হলো তেনারা দেহ ছাড়ছেন’। মানে জিনেরা কেটে পড়ছে।   

 

তারপর মাস দুয়েক ফিন্নি ফুপু ভাল ছিল। ভাল থাকলে আমরা ফুপুকে সাথে নিয়ে সপ্তাহে একদিন আমাদের নদীর ঘাটে গোসল করতে যেতাম। আমাদের গ্রামের নিয়ম ছিল মেয়েদের জন্য আলাদা করা ঘাটে কেবল গাঁয়ের মেয়েরা গোসল করতে পারবে কিন্তু গাঁয়ের বউরা যেতে পারবে না। বউরা বাড়ির মধ্যে তোলা পানিতে গোসল সারবে। আমাদের নদীর ওপর দিয়ে রেলওয়ে ব্রিজ। আমরা গোসলে নামলে দু’ঘন্টার আগে উঠতাম না। ফিন্নি ফুপু ছিল তুখোড় সাঁতারে। স্বাভাবিক অবস্থায় ফুপুর সব ঠিকঠাক। কেবল ব্রিজের ওপর দিয়ে রেলগাড়ি যাওয়ার সময় সে মাথায় ঘোমটা টেনে মুখ ঘুরিয়ে পানির ভেতর দাঁড়িয়ে থাকতো। বলতাম-

‘কী হলো ফিন্নি ফুপু, দাঁড়িয়ে গেলে যে, সাঁতার শেখাবে না?’

‘চুপ! রেলগাড়িতে তোদের ফুপা আছে না? রেলের গার্ড সাহেব! নদীতে গোসল করতে দেখলে কী ভাববে?’

যতবার ট্রেন যেত ততবার সেই একই ভঙ্গী, একই কথা। পরে আমরা আর ও নিয়ে মাথা ঘামাতাম না। 

 

জলসারের আড়াই মাস পর ফুপুর বাড়াবাড়ি রকমের শরীর খারাপ হলো। বড়বাড়ির বড়চাচা আর দেরি না করে ফুপুকে কোলকাতায় ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেলেন। আমরা লুকিয়ে ফুপুর জন্য কাঁদলাম। দাদি বলতে লাগলো – ‘ওরে এ হচ্ছে ঘোর পাপ! পাপের বেড়ি মেয়েটার ঘাড়েই ঝুলছে। আমার কথা রাখলে আজ এতগুলো জীবন এভাবে নষ্ট হয়?’ এতগুলো জীবন কার কার? গল্পের বইয়ের পোকা আমার মেজ বোন ফিসফিস করে বললো- এক ফিন্নি ফুপু, দুই রেলের ফুপা, তিন আব্বা, চার মা। কেন, মা কেন? বারে, মার বুঝি কষ্ট হয় না? এ কথা শুনে আমার আরও কান্না পায়। আমার মায়ের জন্য। আমার অতি সাধারণ আটপৌরে মা’টার জন্য। দাদিটা এত নিষ্ঠুর কেন?

 

কোলকাতার ডাক্তার দেখিয়ে রাজ্যের অসুধ পথ্যি নিয়ে বড়চাচা ফিন্নি ফুপুকে সাথে করে ফিরে এলো। ফুপু আমাদের সবার জন্যে কুমকুম বক্স এনেছিল একটা করে। কোলকাতা থেকে ফিরেই বড়চাচা ফিন্নি ফুপুর জন্য পাত্র দেখতে বললেন আত্মীয় স্বজনদের। আমাদের চেয়ে বয়সে বড় ওবাড়ির কাজিনদের কানাঘুষায় জানতে পারলাম ডাক্তার নাকি বলেছে এ রোগের কারণ অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা। মাসিক হওয়ার আগে এমনটি হয়ে থাকে। বিয়ে দিলেই ভাল হয়ে যাবে। ইন্দিরা চাচির ভায়েরা এসে দিনের পর দিন ওবাড়িতে পড়ে থাকতো। ওদেরই একজন আমাদের সমবয়সী কয়েকজনকে অবদমিত যৌনাকাঙ্ক্ষা বুঝানোর চেষ্টা করেছিল। আমরা দে দ্দৌড়!   

 

ফিন্নি ফুপুর শরীর ভালই চলছিল। দেখাশুনা করে এক জমাজমিওয়ালা ধনী বিপত্নীকের সাথে কথাবার্তা চূড়ান্ত করলো ওবাড়ির চাচারা। আমরা কালেভদ্রে লুকিয়ে চুরিয়ে বড়বাড়িতে গেলেও ওবাড়ির বড়রা কেউ আমাদের বাড়ি আসত না। কারণ দাদি খোঁটা দিয়ে কথা বলতে ছাড়ত না। সামনে সপ্তাহে ফিন্নি ফুপুর বিয়ে। আমরা ফুপুকে নিয়ে শেষবারের মত নদীর ঘাটে গেলাম। লাল রঙের ব্রিজের ওপর দিয়ে তিনটা রেলগাড়ি এলো গেল। ফিন্নি ফুপু নির্বিকার। ঘোমটাহীন মা দূর্গার মত চুল নদীর উত্তরী বাতাসে গুচ্ছ গুচ্ছ সাপের মত দুলতে লাগলো। নির্বাক প্রতিমার চোখে কেমন ভাষাহীন অভিব্যক্তি।  

‘ও ফিন্নি ফুপু সাঁতার কাটো, ডুব দাও। গোসল সারো। দাড়িয়ে আছ কেন? বেলা তো পড়ে এলো’ – বলে আমরা তাকে পেছনে রেখে সাঁতরে এগিয়ে গেলাম। নদীর ওপাড়ের বালিয়াড়ি ধরে মাথায় সোলার হ্যাট পরা আমার বাবা স্কুল শেষে বাইসাইকেলে ফিরছিল। আমার বাবা ছাড়া ওরকম হ্যাট আর কেউ পরে না। আমরা তিন বোন তারস্বরে ডাকছি – আব্বা-আ-আ, আব্বা-আ-আ। বাবা একবার হাত নেড়ে আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে গেল। আমরা সাঁতরে ফিরে এসে দেখি ফিন্নি ফুপু নেই। বিসর্জনের প্রতিমার মত তার ঢেউতোলা চুল পানির ঢেউয়ে ভাসছে। পানির ওপর ফেনা ফেনা বুদবুদ।

 

সবাই বলতে লাগলো ‘পানির ভেতরে ফিন্নির সেই অসুখ উঠেছিল। পানিতেই দম শেষ’। ফিন্নি ফুপুর জন্য আহাজারি করে কেউ কাঁদছিল না। উঠোনভরা মানুষ। মেঘলা দিন। উঠোনের একপাশে শীতল পাটিতে লম্বালম্বি জ্যোৎস্না। কেবল আমরা দু’বাড়ির বোনেরা ফিন্নি ফুপুর ঘর বন্ধ করে ফুপুর শাদা শাড়িতে মুখ গুঁজে গুমরে গুমরে কাঁদলাম। আমার দাদিও ফিন্নি ফুপুর শেষযাত্রায় অনেকদিন পর ওবাড়ি গিয়েছিল। দাদি খুব কাঁদছিল কিন্তু সে ফিন্নি ফুপুর মৃত্যু নিয়ে সবার মন্তব্যে বিশ্বাস করেছে বলে আমার মনে হয়নি।