Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ম্যারাডোনা: এক কিংবদন্তির বিদায়

 

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ জয়ী এই তারকা মাঠে তার ফুটবলের জাদু দেখিয়েছেন অসংখ্য বার। পায়ে আঘাতের পর আঘাত করেও প্রতিপক্ষ আটকাতে পারেনি ফুটবলের এই মহানায়ককে। অপ্রতিরোধ্য গতিতে ছুটে গিয়ে ছয় জন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা দেখান এই ফুটবল জাদুকর। ফুটবল ১১ জনের খেলা। অথচ ম্যারাডোনা দেখিয়েছেন কীভাবে একক নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ জয় করা যায়।

 

ম্যারাডোনার জন্ম ১৯৬০ সালে আর্জেন্টিনার বুয়েনেস আইরেসের লানুসে। দরিদ্র পরিবারে বেশ কষ্টেই কেটেছে তার শৈশব। পড়াশোনা নয়, ফুটবলের প্রতিই ছিল তার নেশা। সারাক্ষণ বল নিয়ে পড়ে থাকতেন। ১০ বছর বয়সে এস্ত্রেয়া রোজার হয়ে খেলেন। এরপর আর্জেন্টিনার সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৭৭ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে মাঠে নামেন। তখন তার বয়স ১৬ বছর ১২০ দিন। ১৯৭৮ সালে বয়সে কম হওয়ার কারণে বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়েন। তবে হাল ছেড়ে দেননি এ ফরোয়ার্ড। সে চেষ্টাতেই  ১৯৭৯ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত যুব বিশ্বকাপে জীবনের প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন তিনি। অধিনায়ক হিসেবে শিরোপাও জয় করেন। ২১ বছর বয়সে দলের সঙ্গে ইউরোপে পাড়ি জমান স্পেনে বিশ্বকাপ খেলার জন্য। ব্রাজিলের কাছে ৩-১ গোলে হেরে আর্জেন্টিনা বিদায় নেয়।

 

১৯৮২ সালে বোকা জুনিয়র্সকে লিগ চ্যাম্পিয়ন করেন ম্যারাডোনা। এরপর চলে যান বার্সেলোনায়। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকে অবাক করে ১৯৮৪ সালে ৪.৬৮ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে ইতালীয় ক্লাব লাপোলিতে যোগ দেন দিয়াগো। ১৯৮৭ ও ১৯৯০ সালে নাপোলির হয়ে সিরি আ’ জিতেছেন তিনি। জিতেছেন উয়েফা কাপও। দেশের জার্সিতে রেকর্ড ১৬ ম্যাচে বিশ্বকাপে নেতৃত্ব দিয়েছেন ম্যারাডোনা। সবমিলিয়ে বিশ্ব আসরে খেলেছেন ২১ ম্যাচ। আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের হয়ে মাত্র ১৫ বছরে বয়সে ১৯৭৬ সালে অভিষেক তার। এক বছর পরে আলবেসেলেস্তেদের জার্সি গায়ে চাপান তিনি। ১৯৭৮ বিশ্বকাপে তাকে দলে নেওয়া হয়নি বেশি ছোট বলে!

 

১৯৮২ সালের বিশ্বকাপটি ছিল ম্যারাডোনার প্রথম বিশ্বকাপ। এই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা তেমন কোনো নৈপুন্য দেখাতে পারেন নি এবং আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় পর্ব থেকে বাদ নেয়। ১৯৮২ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ২টি গোল করেছিলেন এবং পাশাপাশি ব্রাজিলের সাথে শেষ খেলায় লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। এই বিশ্বকাপের ব্যর্থতার গ্লানিকে মুছে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে ১৯৮৬ বিশ্বকাপ খেলতে আসে আর্জেন্টিনা। এবার আর খালি হাতে নয়, ফিরেছে বিশ্বকাপ জয় করে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের পুরোটাই ছিল ম্যারাডোনার একক আধিপত্য। নিজে করেন ৫টি গোল। এই বিশ্বকাপটি ম্যারাডোনাকে অনন্য উচ্চতায় তুলে ধরে। কেননা এই বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্যা সেঞ্চুরি’ এই গোল দুটি করেন। ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ গোলের ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনা। এই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতে নেয়।

 

১৯৯০ এর বিশ্বকাপে ইনজুরি ম্যারাডোনার শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। গোড়ালির ইনজুরি কারণে এই বিশ্বকাপে নিজেকে ঠিকভাবে মেলে ধরতে পারেননি ম্যারাডোনা। কোনো রকমে পার হন প্রথম পর্ব। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই প্রতিপক্ষ দলের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়ে আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালে ইয়োগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ১২০ মিনিটেও কোনো গোলের মুখ দেখেনি। টাইব্রেকারে ম্যারাডোনার দুর্বল ঠেকিয়ে দিলেও আর্জেন্টিনা ৩-২ গোলে ম্যাচটি জিতে। এবার সেমিফাইনাল, প্রতিপক্ষ ইতালি। এই ম্যাচটিও ১২০ মিনিট পর্যন্ত গড়ায়। ফলাফল ১-১, টাইব্রেকারে ইতালিকে হারিয়ে ফাইনালে পৌঁছে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু বিতর্কিত পেনাল্টিতে পশ্চিম জার্মানির কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা।

 

১৯৯১ সালে ইতালিতে ড্রাগ টেস্টে কোকেইনের জন্য ধরা পড়ায় ১৫ মাসের জন্য ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ হন ম্যারাডোনা। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ইফিড্রিন টেস্টে ইতিবাচক ফলাফলের জন্য তাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে তিনি তার কোকেইন নেশা ত্যাগ করেন। ম্যানেজার হিসেবে খুব কম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও ২০০৮ সালের নভেম্বরে তাকে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় তাকে। ২০১০ বিশ্বকাপের পর চুক্তি শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আঠারো মাস এই দায়িত্বে ছিলেন। এরপর ২০১১ সালে আরব আমিরাতের আল ওয়াসেল ফুটবল দলের কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ম্যারাডোনা। মৃত্যুর আগে তিনি ছিলেন স্বদেশী ক্লাব জিমন্যাসিয়ার কোচ। 

 

ইংল্যান্ডের বিপক্ষে হাত দিয়ে গোল করে বলেছেন, ‘এটা ঈশ্বরের হাত।’ কদিন আগে ম্যারাডোনা মজা করে বলেছিলেন—তিনি ডান হাতে আরেকটি গোল করতে চান। তার আগেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন। বেশ কিছু দিন ধরে অসুস্থ ছিলেন ৬০ বছর বয়সী আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি ফুটবলারের। তার সবচেয়ে প্রিয় শহর বুয়েন্স আইরেসের একটি হাসপাতালে ভর্তিও হয়েছিলেন। মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বেঁধে ছিল। তা অপসারণ করাও হয়েছিল। ফুটবল দুনিয়া প্রার্থনা করেছিল যেন ম্যারাডোনা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। বাসায় ফিরেও ছিলেন তিনি। এই তো মাত্র ২০ দিন আগের ঘটনা। কিন্তু কে জানত মানুষটির আয়ু আছে আর মাত্র কটা দিন, সবার ভালোবাসা মায়া ত্যাগ করে চলে যাবেন।

 

ম্যারাডোনা বলেওছিলেন কখনো সময় পেলে বাংলাদেশে আসবেন। কিন্তু তার আর বাংলাদেশে আসা হলো না। বাংলাদেশের মানুষ ম্যারাডোনাকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ ফুটবল থেকে যখন ‘ষড়যন্ত্র করে’ ম্যারাডোনাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন ম্যারাডোনার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষও কেঁদেছে। ক্ষোভে-দুঃখে রাস্তায় বেরিয়ে গিয়েছিল ফুটবল-পাগল মানুষগুলো। প্রিয় ফুটবলারের সেই কান্নার কথা আজও ভোলেনি বাংলাদেশের ফুটবল-প্রেমীরা।

 

ম্যারাডোনা হয়তো কোনো দিন জানবেনও না তার কত কোটি ভক্ত আছে বাংলাদেশে। তার জন্য কত ভালোবাসা জমে আছে বাংলাদেশিদের মনে। ভক্তদের অকুণ্ঠ ভালোবাসার মধ্যে আজীবন বেঁচে থাকবেন ফুটবলের এই মহানায়ক দিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা।

 

৬০ বছর বয়সী এই ব্যক্তিত্বের মৃত্যুতে সারা বিশ্বে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ম্যারাডোনার ভক্তরাসহ সারা বিশ্বের তারকারা তাঁর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে আবেগঘন স্ট্যাটাস দিচ্ছে। নিজের ফেসবুক পেইজে ম্যারাডোনাকে নিয়ে বিশাল একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছেন আর্জেন্টিনাভক্ত টাইগার অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। লিখেছেন, এমন কয়েকজন খেলোয়াড় থাকে যাদের জনপ্রিয়তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যায়। যারা সব প্রজন্মের কাছে কিংবদন্তী হয়ে উঠেন। দিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা এমনি একজন খেলোয়াড় ছিলেন। খেলার মাঠে তার অবিশ্বাস্য প্রতিভা আর ফুটবলের প্রতি ভালোবাসার কথা না বললেই না। খেলার মাঠে তিনি সবসময়ই পরিচয় দিয়েছেন বুদ্ধিমত্তার। তাঁর মতো কিংবদন্তী খেলোয়াড় ছিলো বলেই, ফুটবল আমাদের এত আনন্দ দেয়। বিদায়, দিয়েগো।

 

ম্যারাডোনার মৃত্যুতে শোকে কাতর পাকিস্তানের সাবেক তারকা ক্রিকেটার শোয়েব আখতার টুইট বার্তায় লিখেছেন, কিংবদন্তি ম্যারাডোনা মারা যাওয়ার খবর শুনে খুবই খারাপ লাগছে। ম্যারাডোনা ছিলেন সকল ক্রীড়াবিদদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। জনপ্রিয় তারকা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ম্যারাডোনার সঙ্গে তোলা একটি ছবি টুইটারে পোস্ট করে শোক প্রকাশ করেছেন।

 

এদিকে ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে আর্জেন্টিনা। পাশাপাশি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজ টুইটারে এক বার্তায় ম্যারাডোনাকে উদ্দেশ্যে লিখেছেন, 'আপনি আমাদের বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। আপনি আমাদের অনেক আনন্দিত করেছেন। আপনি সর্বকালের সেরা ছিলেন। আমরা আপনাকে মিস করবো।'