Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

কিংবদন্তী সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক কিংবদন্তী অভিনেতা হলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য কেবল ভারতেই নয় দুই বাংলার মানুষের মনে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। অপু, ফেলুদা চরিত্রে অসামান্য কীর্তির জন্য তিনি চির অমর হয়ে থাকবেন। ৮৫ বছরের মধ্যে ছয় দশকের অধিক তাঁর সময় কেটেছে অভিনয়ের পর্দায়। সেই সাদাকালো পর্দা থেকে শুরু করে রঙিন পর্দা পর্যন্ত একটুও কমেনি তার জনপ্রিয়তা, বরং আরো বেড়েই চলেছে। তিনশ’র বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি সিনেমা জগতে অকল্পনীয় অবদান রেখেছেন। অসাধারণ অভিনয় দিয়ে মন জয় করেছেন দর্শকের। তার মৃত্যুতে চলচ্চিত্রের এক সোনালী যুগের সমাপ্তি ঘটলো। কেবল অভিনয় নয় আবৃত্তিতেও অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন তিনি। আবৃত্তির মাধ্যমেও জয় করেছেন হাজারো দর্শকের মন। কবিতা ও নাটকও লিখেছেন তিনি। রূপালি পর্দা থেকে রঙিন পর্দা পর্যন্ত তার অভিনয় দর্শকদের মন জয় করে এসেছে। তাঁর প্রয়াণে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।


জীবনী: ১৯৩৫ সালে ভারতে নদীয়ার কৃষ্ণনগরে জন্ম হয় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের। তার পরিবারের আদি নিবাস ছিলো বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহের কাছে কয়া গ্রামে।  সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়েরর পিতামহের সময়ে তাদের পরিবার নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে আসেন এবং সেখানেই বসবাস শুরু করেন। তাঁর পিতা ছিলেন হাইকোর্টের উকিল ম  অভিনেতা। কৃষ্ণনগর সেন্ট জনস বিদ্যালয়ে প ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন সৌমিত্র। এরপর তার পিতার চাকরি বদলের জন্য তার বিদ্যালয় বদল হয়। কৃষ্ণনগরে থাকা অবস্থায়ই তিনি অভিনয়ে প্রবেশ করেন। কৃষ্ণনগরের থিয়েটার ছিলো খুবই প্রসিদ্ধ। সেখানে থাকার সময় তিনি বিভিন্ন দলের সাথে নিয়মিত অভিনয় করতেন। এখান থেকেই তার অভিনয়ের শুরু। কিছুকাল পর তারা কলকাতার পার্শবর্তী হাওড়া জেলায় চলে আসেন। এরপর হাওড়া জেলা স্কুল থেকে বিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করেন। এরপর ভর্তি হন সিটি কলেজে। সেখান থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকতা এবং মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ আর্টস এ দু’বছর পড়াশোনা করেন।


কৃষ্ণনগরে অভিনয়ের কাজ শুরু করলেও থিয়েটারে কাজ শুরু করেন কলকাতায় এসে। সিটি কলেজে পড়ার সময় তার সাথে যোগাযোগ হয় নাট্যব্যক্তিত্ব অহীন্দ্র চৌধুরী এবং শিশির কুমার ভাদুড়ির সাথে। তাদের হাত ধরেই সৌমিত্রের থিয়েটার জগতে প্রবেশ। এরপর থেকে অভিনয়কে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গড়ে নেন তিনি। শিশির কুমার ভাদুড়ির অভিনয় সৌমিত্রকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। তার কর্মজীবন শুর হয় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ এর ঘোষক হিসেবে। পাশাপাশি থিয়েটারে অভিনয় এবং ছবিতে অডিশন দিচ্ছিলেন। মে  তিনি ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করতেন। বহু নাটকে তিনি অভিনয় করেছেন। এরপর তিনি নিজের থিয়েটার গ্রæপের সূচনা করেন এবং সেই গ্রæপের জন্যে বহু নাটক রচনা ও পরিচালনা করেন। চলচ্চিত্রের জন্য তিনি অডিশন দিতে থাকেন। ১৯৫৭ সালে পরিচালক কার্তিক বসুর ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ ছবিতে অডিশন দিলেও জায়গা পাননা। তার বদলে ঐ চলচ্চিত্রে অভিনয়টি পেয়েছিলেন অসীমকুমার। কিন্তু তিনি হার মানেননি। তিনি আবারও চলচ্চিত্রের জন্য অডিশন দিতে থাকেন। এছাড়াও তিনি অসংখ্য সফল নাটক পরিচালনা করে প্রশংসিত হয়েছেন।

১৯৫৯ সালে তার চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ ঘটে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে। তাঁর প্রথম কাজ ছিলো বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় নির্মিত চলচ্চিত্র ‘অপুর সংসার’। এই চলচ্চিত্রটি এখনো অধিকাংশ দর্শকের পছন্দের তালিকার প্রথমদিকে রয়েছে। জানা যায়, ‘অপরাজিত’ ছবির অডিশনে সৌমিত্রকে নিতে রাজী হন নি পরিচালক সত্যজিৎ রায়। কারণ ওই চলচ্চিত্রের ‘অপু’ চরিত্রের বয়স হিসেবে সৌমিত্র তখন বেশ কিছুটা লম্বা ছিলেন। কিন্তু তিনি সৌমিত্রের চেহারা ভোলেন নি বরং স্মরণে রেখে দিয়েছিলেন। এরপর যখন ‘অপুর সংসার’ সিনেমা শুরু করেন তিনি তখন সৌমিত্রকে ডেকে নেন মূল চরিত্রে অভিনযরে জন্যে। এরপর সত্যজিৎ রায়ের প্রায় বেশীর ভাগ ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। এরপর ধীরে ধীরে সত্যজিৎ রায়ের ২৭ টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১৪ টিতে অভিনয় করেন সৌমিত্র। তিনি সত্যজিৎ রায় নির্মিত বিভিন্ন ছবিতে বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তাঁর অভিনীত কিছু কিছু চরিত্র দেখে ধারণা করা হয় যে, সৌমিত্রকে মাথায় রেখেই গল্প বা চিত্রনাট্যগুলো লেখা  য়েছিলো এবং তাঁ সেই চরিত্র দেয়া হয়েছিলো। ফেলুদা এরকমই একটি চরিত্র। সৌমিত্রকে দেখেই তিনি এই ফেলুদা চরিত্র নির্মান করেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের চেহারা দেখে সত্যজিৎ রায় সৌমিত্রকে “তরুণ বয়সের রবীন্দ্রনাথ” বলেছিলেন। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলির ভিতরে সব থেকে জনপ্রিয় হল ফেলুদা। তিনি সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘সোনার কেল্লা’ এবং ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতে ফেলুদার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। প্রথমে সত্যজিতের সৌমিত্রের চেয়ে ভালো কাউকে নেয়ার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু তাঁর অভিনীত ফেলুদা সিরিজের প্রথম ছবি ‘সোনার কেল্লা’ মুক্তি পাওয়ার পর সত্যজিৎ রায় বুঝতে পারেন যে তাঁর চেয়ে ভালো আর কেউ ফেলুদার চরিত্র এতো সুন্দর করে ফুটিয়ে উঠাতে পারতোনা। এছাড়াও সত্যজিৎ রায়ের সাথে তিনি হিরক রাজার দেশে, ঘরে বাইরে, চারুলতা, অরণ্যের দিনরাত্রি, অশনি সঙ্কেত, দেবী, অভিযাত্রী, কাপুরুষ আরো অনেক চলচ্চিত্রে ভীষণ সাফল্য অর্জন করে। সত্যজিৎ রায়ের দ্বিতীয় শেষ চলচিত্র ‘শাখা প্রশাখা’ তে তিনি অভিনয় করেন। অনেকের মনে করেন, সৌমিত্র ছিলেন সত্যজিতের মানসপুত্র। সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় একটি বই লিখেছিলেন। বইটির নাম ‘মানিকদার সঙ্গে’। বইটির ইংরেজি অনুবাদটির নাম "দা মাস্টার অ্যান্ড আই"।


সত্যজিৎ রায় ছাড়াও বাংলার প্রায় সব বিখ্যাত ও দক্ষ পরিচালকের সাথে তিনি কাজ করেছেন। সেই সাদাকালো পর্দা থেকে রঙিন পর্দার অনেক পরিচালকদের সাথেই তিনি কাজ করেছেন। মৃণাল সেন, তপন সিনহা, তরুণ মজুমদার, গৌতম ঘোষ, ঋতুপর্ণ ঘোষ, অপর্ণা সেন, কৌশিক গাঙ্গুলী, অতনু ঘোষ, সৃজিত মুখার্জীর সাথে তিনি অভিনয় করেছেন এবং প্রশংসিত হয়েছেন। সাত পাকে বাঁধা, হাটে বাজারে, পরিণীতা, অপরিচিতা, মাল্যদান, স্ত্রী, যদি জানতেম, উত্তরণসহ আরো অনেক সিনেমা করেছেন সাফল্যের সাথে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রাক্তন, বেলাশেষে, পোস্ত, হেমলক সোসাইটি, শেষ চিঠি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। প্রাক্তন সিনেমায় তার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের ‘হঠাৎ দেখা’ কবিতাটি দর্শকদের মন জয় করে ফেলেছে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় শুধু যে আর্ট হাউজ সিনেমা করেছেন তা নয়, তিনি বা·বদল, বসন্ত বিলাপের মত রোমান্টিক এবং কমেডি ছবিতেও অভিনয় করেছেন। তাঁর ‘জীবনে কি পাবো না’ এখনও অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়াও কোণি চরিত্রে, মাষ্টারদা চরিত্রে এবং আতঙ্ক ছবিতে মাষ্টারমশাই চরিত্রের তাঁর অভিনয় ছিলো অসাধারণ। বাস্তবচিত এবং সাধারণ মানুষের চরিত্রে অভিনয় করতেই তিনি বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। তাই যখন সত্যজিত রায় তার নায়ক সিনেমার জন্য সেখানে মূল চরিত্রে সৌমিত্রর পরিবর্তে উত্তম কুমারকে পছন্দ করেছিলেন।


৮৫ বছরের জীবনে তিনি অর্জন করেছেন অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা। অধিকাংশই তাঁর অভিনয়ের জন্য। তিনি ফ্রান্সের সর্বোচ্চ সম্মান 'লেজিয়ঁ দ্য নর’ এবং ‘কম্যান্দর দ্য লার্দ্র দে আর্ত্ এ দে লের্ত্র' পেয়েছেন। সত্তরের দশকে তিনি পদ্মশ্রী পান কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তী কালে তিনি পদ্মভূষণ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৮ সালে পান সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। দু’ বার চলচ্চিত্রে জাতীয় পুরস্কার পান, ২০০১ ও ২০০৮ সালে। ১৯৯১ সালে অন্তর্ধান চলচ্চিত্রের জন্য বিশেষ জুরি বিভাগে তিনি প্রথম জাতীয় পুরস্কার পান। ৯ বছর পরে ‘দেখা’ চলচ্চিত্রের জন্য একই বিভাগে পুরস্কার পান। ২০০৬ সালে পদক্ষেপ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হন তিনি। ২০১২ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার লাভ করেছেন। ২০০৪ সালে পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত হন তিনি। এরপর ২০১২ সালে সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৭ সালে তিনি বঙ্গভূষণ পুরস্কার পান। কিন্তু তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।


সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার (মার্ক্সবাদী) সমর্থক ছিলেন এবং ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি সরকারের সমালোচক ছিলেন। তাঁর বিভিন্ন লেখার মাধ্যমে তা ফুটে ওঠে। ধর্মের নামে গোরামি রাজনীতির বিপক্ষে ছিলেন তিনি। দুর্গাপুজার সময় হাসপাতালে থাকা অবস্থায় সিপিএম এর মুখপত্রের শারদ সংখ্যায় তাঁর শেষ লেখা প্রকাশিত হয়। 

বর্তমান করোনা মহামারীর সময়ে অক্টোবর মাসের প্রথমে বাড়িতে থাকা অবস্থায় তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। পরে করোনার নমুনা পরীক্ষা করা হলে ৫ অক্টোবর তাঁর কোভিড-১৯ পজিটিভ রিপোর্ট আসে। এর পর ৬ অক্টোবর তাকে বেলভিউ নার্সিং হোমে ভর্তি করানো হয়। এরপর প্রায় দশদিন চিকিৎসার পর তার করোনার নেগেটিভ রিপোর্ট আসে। সাথে শারীরিক অবস্থারও কিছুটা হয়। কিন্তু অন্যান্য শারীরিক জটিলতা থাকায় তাঁর অবস্থার আরো অবনতি হতে শুরু করে। পুরোনো ক্যান্সার ফিরে আসে, সাথে শ্বাসতন্ত্রের সমস্যাও ছিলো তাঁর। চিকিৎসা চলা অবস্থায় ২৪ অক্টোবর রাতে তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে। অবশেষে লাইফ সাপোর্টে যেতে হয় তাঁকে। অবশেষে রবিবার, ১৫ই নভেম্বর তারিখে ভারতীয় সময় দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে (বাংলাদেশ সময় ১২ টা ৪৫ মিনিট) পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যামৃত্যুবরণ করেন। মাল্টিঅর্গান ফেলিওর ও ব্রেনডেথ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। ৪০ দিন ধরে বেলভিউ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন তিনি। এর মাধ্যমেই এক কিংবদন্তী আমাদের ছেড়ে ইহলোক ত্যাগ করে চলে যান। তার মৃত্যুতে পুরো বাংলায় শোকের ছায়া নেমে পড়ে।


সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু চলচ্চিত্র জগতে রেখে গেছেন অসামান্য অবদান যার জন্য তিনি চিরদিন অমর হয়ে থাকবেন। তাঁর সকল সিনেমার মাধ্যমে, কবিতার মাধ্যমে, আবৃত্তির মাধ্যমে, নাটকের মাধ্যমে সবসময় তিনি আমাদের মাঝে থাকবেন। তিনি আমাদের মধ্যেই আছেন এবং থাকবেন।