Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

একজন নারী ক্রিকেট অধিনায়ক: জাহানারা আলম

জাতীয় নারী ক্রিকেট দলে নির্বাচনের সময় যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, ক্রিকেট খেলবে নাকি? সে উত্তর দিয়েছিলো, আমি খেলতে পারবো তো? আমার মনে হয়না পারবো! তার উত্তরে কোচ বলেছিলেন, হ্যাঁ তুমি পারবে।… সত্যিই সে পেরেছিলো। কেবল ক্রিকেট খেলতে না, নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়কও হয়েছিলেন তিনি। তিনি হলেন বাংলাদেশ জাতীয় নারী ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক জাহানারা আলম।
দীর্ঘ ১২ বছর ধরে বাংলাদেশের জাতীয় দলের জার্সিতে খেলছেন জাহানারা। এরমধ্যে অধিনায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। ১৯৯৩ সালের ১ এপ্রিল খুলনা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন এই নারী। খুলনা জেলাতেই তার বেড়ে ওঠা। ছেলেবেলা থেকেই খেলার প্রতি আগ্রহ ছিলো তার। শৈশবে স্কুলে পড়ালেখার সময় থেকেই খেলাধুলার শুরু তার। তবে তার খেলাধুলার শুরু ক্রিকেট দিয়ে হয়নি। প্রথম অবস্থায় তিনি হ্যান্ডবল, ভলিবল দিয়েই খেলাধুলা শুরু করেন। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত তিনি এগুলোই খেলেছেন। অষ্টম শ্রেণীতে ক্রিকেট খেলায় অভিষেক জাহানারার। এর আগে তিনি ক্রিকেট তো খেলেননি, ক্রিকেটের নিয়মকানুনও সব ঠিক মতো জানতেননা। তবে খেলাধুলার সাথে জড়িত ছিলেন। এরমধ্যেই নারী ক্রিকেট দল গড়ার জন্য বিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) দেশের বিভিন্ন স্কুলে খোঁজ চালাচ্ছে নবীন ক্রিকেটারের। সেসময় জাহানারা ক্রিকেট না খেললেও অন্যান্য খেলাধুলায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন এবং শারীরিক ফিটনেসও ভালো ছিলো তার। তাই ক্রিকেট না খেললেও স্কুলের শিক্ষকরা তাকে ক্রিকেটে নিয়ে আসেন। এইসময় বিসিবির নজরে আসেন জাহানারা। খুব দ্রুতই নজর কাড়তে সমর্থ হন নির্বাচকদের।


এরপর থেকে তার ক্রিকেট অনুশীলন চলতে থাকে। ক্রিকেটে তার দক্ষতা প্রকাশ করতে থাকেন। সময়টা ২০১৮ সাল। সামনে জাহানারার এসএসসি পরীক্ষা। এই কয়দিন পরীক্ষার জন্য ভালো প্রস্তুতি নিতে হবে তার। ঠিক এমন সময়েই আবার বাংলাদেশ নারী দল শ্রীলঙ্কায় সফরে যাবে। ডাক পেলো জাহানারা। একদিকে সামনে এসএসি পরীক্ষা আর অন্যদিকে তার স্বপ্ন ক্রিকেট খেলা। একটায় গেলে আরেকটা পড়ে যাবে বাদ। অনেক দ্বিধা- দ্বন্দ্বের  পর সে তার বাবাকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করার সিদ্ধান্ত নেন। একটু ভয়ে ভয়েই তিনি তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেন এই ব্যাপারে। উত্তরে তার বাবা যা বলেছিলেন তা হয়তো দেশের অভিভাবকদের প্রচলিত সিদ্ধান্তকে পুরোই উল্টে দিলো। সেদিন তিনি জাহানারাকে বলেছিলেন, পরীক্ষা পরেও দিতে পারবে। জাতীয় দলে খেলার সুযোগ আসলে অবশ্যই খেলতে যাবে। ব্যাপারটা সত্যিই অসাধারণ না? আমাদের দেশে অভিভাবকরা সাধারণত পড়ালেখার কোনো ছাড় দিতে চাননা তা যতই ভালো সুযোগ আসুকনা কেন। তারপর আবার মেয়েদের খেলার ব্যাপারে তো তা একেবারেই বিরল। কিন্তু জাহানারার পরিবার নারী হওয়ার কারণে তাকে কখনোই পিছিয়ে পড়তে দেননি। তার স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাওয়ায় তাকে সাহায্য করেছেন তারা। পরিবারের সাপোর্টে জাহানারা পরীক্ষা বাদ দিয়ে শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়েছিলো যা তার স্বপ্নকে আরো এক ধাপ কাছে নিয়ে এসেছিলো।
পরিবার থেকে কখনো বাঁধা পাননি জাহানারা। কিন্তু প্রতিবেশীদের কাছ থেকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে তাকে। মেয়ে হয়ে ক্রিকেট খেলার জন্য অনেক অভিযোগও করেছে তার পরিবারের কাছে। কিন্তু তার পরিবার তাদের এসব কথায় কান না দিয়ে তাদের মেয়েকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বাংলাদেশে নারী ক্রিকেট দল গঠনের শুরুর দিক থেকে ক্রিকেট খেলছেন। তিনি যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করেন তখনো নারী ক্রিকেট তেমন প্রচলিত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। ফলে খুলনায় থাকা অবস্থায় তাকে ছেলেদের সাথে ক্রিকেট অনুশীলন করতে হতো। এজন্য তাকে অনেক সময় বিপাকে পড়তে হতো। কিন্তু তবুও তিনি হার মানেননি। এখন পর্যন্ত তিনি থামেননি। জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য পুরস্কার এনে দিয়েছেন দেশের ঝুড়িতে। 
কেবল ক্রিকেট মাঠেই নয় অভিনয়েও নাম লিখিয়েছেন এই নারী ক্রিকেটার। ২০১৬ সালে ‘লাইফ ইজ বিউটিফুল’ নামক একটি নাটকে অভিনয় করেছেন জাহানারা আলম। এছাড়াও দুইটি সিনামায় অভিনয় করার প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ক্রিকেট অনুশীলনে তা সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ক্রিকেট ছাড়া আর অন্য কোনো কিছুকে পেশা হিসেবে মেনে নিতে চাননা এই নারী টাইগার। 
কেবল মাঠে আর পর্দায় নয় বাস্তব জীবনেও একজন ভালো ও দানশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন জাহানারা। দেশে করোনা মহামারী প্রাদুর্ভাবের সময় তিনি অসহায়দের পাশে ছিলেন। সেই সময় তিনি অনেক ত্রাণ দিয়ে সাহায্য করেছেন অসহায়দের। আসলেই তিনি বর্তমান সমাজের নারীদের কাছে এক আদর্শ হয়ে উঠেছেন। প্রত্যেক নারীর উচিত তার জীবন থেকে শিক্ষা নেয়া। দেশ ও জাতির কল্যাণে নিজেকে এগিয়ে নিযে যাওয়া।