Skip to content

৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ইতি খাতুন যেন এক অনুপ্রেরণার নাম

২০১৬ সাল। ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্রী ইতি। আজ তার বিয়ে। হঠাৎ করেই বিয়েটা। ইতি এ ব্যাপারে বেশি কিছু জানেনা। অনুশীলন শেষে বাড়িতে এসে দেখে বাড়িতে অনেক লোকজন। পাত্রপক্ষ বসে আছে বাড়ির বারান্দায়। শাড়ি পরে পাত্রপক্ষের সামনে নিয়ে আসা হয় ইতিকে। পাত্রপক্ষের পছন্দ হয় এবং বিয়ে পাকাপাকি করে আজকেই বিয়েটা সেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। বাড়িতে বিয়ের আয়োজনও বেশ পাকা। কিন্তু বিয়েটা আর হয়না। কারণ কনে বিয়ে থেকে পালিয়েছে। তীর-ধনুকের মায়ায় পড়ে ইতি পালিয়ে যায় তার বিয়ে থেকে। সেখান থেকে পালিয়ে সে তার মামার বাড়ি আশ্রয় নেয়। সেদিন বিয়ে থেকে পালিয়ে নিজ স্বপ্ন পূরণের পথে চলেছিলো বলেই বাংলাদেশ এক সেরা আরচারিকে পেয়েছে। ২০১৯ সালে দক্ষিণ এসিয়ান গেমসে প্রথম নারী হিসেবে ইতি খাতুন জিতেছেন তিনটি সোনা। ৩৫ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের কোনো নারী একই গেমসে তিনটি সোনা জিততে পারেননি।


ইতি খাতুনের রেড়ে ওঠা চুয়াডাঙ্গা জেলার বেলগাছি মুসলিম পাড়ায়। তার বাবা ইবাদত আলী একটি রেস্তোরাঁর কর্মচারী ছিলেন। দৈনিক দুইশ টাকার মজুরিতে অভাবেই চলতো তাদের সংসার। তিন সন্তান পরিবারে। ইতি দ্বিতীয় কন্যা। ছোট মেয়ে স্মৃতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে। আর বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই। গ্রামের স্বাভাবিক মেয়েদের মতোই শৈশব কেটেছে ইতির। মুসলিম পাড়ায় ইতির পরিবার থাকে রেলওয়ের খাসজমি ও ইতির বাবার সামান্য জমিতে। দারিদ্রের সাথে জীবন কেটেছে ইতির পরিবারের। পড়ালেখা করানোর সামর্থ্য ছিলোনা ইতির বাবার। তাই পিইসি পরীক্ষার পরেই তার বিয়ের ব্যবস্থা করছিলেন। এতে পরিবারের বোঝা হয়তো একটু কমতো। আর দশটা মেয়ের মতোই তার শৈশব কাটছিলো। কিন্তু ছোট থেকেই তীর-ধনুকের প্রতি টান ছিলো ইতির। তীর ধনুকে অত্যন্ত দক্ষ ছিলো ইতি। এই খেলার জন্য অনেক বকা খেয়েছে তার বাবা মায়ের। কিন্তু তারপরও সে তীর-ধনুক ছাড়তে পারেনি। ছোট থেকেই এই তীর-ধনুককে কেন্দ্র করেই তার সব স্বপ্ন  গড়ে ওঠে। তাই স্বপ্ন পূরণ করতে সে বিয়ে ছেড়ে চলে আসে তার মামার বাড়ি। সেখানে সে ঝিনুক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সেখান থেকেই তার আরচারির যাত্রা শুরু হয়।


ঝিনুক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে অনেকগুলো পুরস্কার পান ইতি। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আরচারি ফেডারেশন পুরো দেশ থেকে আরচারি খেলোয়াড় নির্বাচন শুরু করে। চুয়াডাঙ্গা থেকে আরচারিতে ৪০ জন অংশ নেয় এবং এদের মধ্যে ইতি হয়েছিলেন প্রথম। এরপর উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য ঢাকা থেকে ডাক আসে ইতির। পরিবার থেকে বাধা এলেও তা পেরিয়ে ইতি চলে যান প্রশিক্ষণে। ২০১৮ সালে প্রথম জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন তিনি এবং সেথোনে ব্রোঞ্জ জেতেন। পরের বছর জাতীয় জুনিয়রে রিকার্ভের ব্যক্তিগত ইভেন্টে জিতেছেন রূপা এবং জুনিয়র ক্যাডেট বিভাগে জিতে নেন সোনা। এরপর সুযোগ পান আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার। এরপর আরচারি প্রতিযোগীতায় গিয়েছেন স্পেন, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, চীন। এখন ইতি অলিম্পিকে অংশ নেয়ার স্বপ্ন দেখেন।
প্রতিটি ম্যাচেই ইতিকে লড়াই করতে হয় সেরা হওয়ার জন্য। কেবল মাঠেই নয় জীবনেও সে লড়াই করেছে দারিদ্রতার সাথে, নিজ পরিবারের সাথে। আর সেই লড়াইয়ে সে হয়েছে সফল। আশা করি সামনের সকল লড়াইয়েও ইতি খাতুন সফল হয়ে আসবে এবং বাংলাদেশকে পৃথিবীর কাছে গর্বিত করবে।