Skip to content

১লা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ইয়াসমিনরা মরে গেছে, আমরা বেঁচে আছি তো?

গত ২৪ আগস্ট দেখলাম হাতে গোনা কয়েকটি সংবাদ মাধ্যম ‘ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে দিনাজপুরের সেই ইয়াসমিনের কথা। যাদের স্মৃতি খুব দুর্বল কিংবা ঘটনার চাপে কয়েক বছর পেছনে পর্যন্ত ফিরে তাকাতে পারেন না, তাদের জন্য বলি, ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট কতিপয় পুলিশ সদস্যের ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় কিশোরী ইয়াসমিন। এ ঘটনার প্রতিবাদে দিনাজপুরের মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়লে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। নিহত হয় ৭জন। আহত হয় প্রায় ৩ শতাধিক। সেদিন থেকে সারাদেশে আগস্টের এদিন ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

 

‘ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবস’ বা ‘নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস’ এ বছর তেমন আলোচনার বিষয় নয়। চারিদিকে ডেঙ্গুর খবর। বছরের এই একটি দিন মানুষ যখন ইয়াসমিনের কথা স্মরণ করবে সে-দিনেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরায় হয়েছে জামালপুর ডিসির ‘কা-’। তাঁর অফিসের বিশ্রামের কক্ষে গোপন ক্যামেরায় ধারণকৃত এক নারীর সঙ্গে প্রণয়ের দৃশ্য প্রকাশিত হলে তোলপাড় ফেসবুক, দেশের গণমাধ্যম। বছরের যে দিনটি ইয়াসমিনের জন্য বরাদ্দ ছিল, তাও এক রকমের ভেস্তে গেল।  

 

তনুর ঘটনা থেকে আমরা দেখেছি, দলমত নির্বিশেষে এক গণ-আন্দোলন কিভাবে থামিয়ে দেওয়া হয়। কিংবা সময়ের কারণে মানুষ আপনাআপনি গুটিয়ে নেয় নিজেকে। অপেক্ষা করে আরও একজন ইয়াসমিন কিংবা তনুর। মানুষের সেই অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তখনই সামনে আসে রূপা। আমরা একটা ঘটনা ভুলে যাই, পরবর্তীটার জন্য অপেক্ষা করি, তাই ঘটনার পরম্পরা হয়ে ইয়াসমিন-তনু-রূপাদের আসতে হয়। আমাদের মৌনতার মাঝে হারিয়ে যায় তানহা-পূজা-রিসা-আফসানা কিংবা ইয়াসমিন-তনু-রূপাদের না বলা কথা! শেষ পর্যন্ত আমরা আর মনে রাখি না তাদের নির্মম ইতিহাস। আমাদের মনে করিয়ে দিতে ইতিহাসের চরিত্ররা ফিরে আসে আরও কঠিন দৃষ্টান্ত নিয়ে। এই কদিন আগেই (২ আগস্ট) খুলনার রেলওয়ে থানায় এক তরুণীকে  গণধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ পাঁচ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে। এখানেই শেষ নয়, ফেন্সিডিলসহ একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করা হয় ধর্ষণের শিকার কিশোরীকে। ভিকটিমের বড় বোন অভিযোগ করেন, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে ওসি ভিকটিমের পরিবারকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার কথা বলেন। পরিবার রাজি না হওয়ায় তিনি দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়ে চলে যান। [খবর বাংলা ট্রিবিউন]

 

খুলনার এই ঘটনার সঙ্গে দিনাজপুরের ইয়াসমিন ট্রাজেডির কি কোনো মিল নেই? অথচ এই ঘটনা নিয়ে কোনো আলোচনা হতে দেখলাম না। ইতিহাস হয়ত জানে না, একজন মানুষের কথিত ‘অসামাজিক কাজ’ প্রকাশ্যে আসলে আমরা যতটা আন্দোলিত হই, ততটা আন্দোলিত ধর্ষণের খবরে আর হই না। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিদিন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে সাতজন নারী। এর মধ্যে পাঁচজন শিশু। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) মোট ২৮৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এর মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয় ৩৫ জন। প্রতিবন্ধী শিশু আছে ১৪জন। ধর্ষণ শেষে ১৬জন শিশুকে হত্যা করা হয়। ধর্ষণের পর ১০জন শিশু আত্মহত্যা করে। ছেলেশিশুও আছে এর মধ্যে। ধর্ষণের মামলা করতে গিয়ে প্রায় অর্ধেক নারী ও শিশু থানায় হেনস্তার শিকার হয়। মামলার রেকর্ড গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীদের ধরতে পুলিশের উদাসীনতা কাজ করে।

 

এসব পরিসংখ্যানের দিকে আমাদের আর তাকাতে ইচ্ছা করে না। আমরা জানি প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কয়েকজন করে নারী ধর্ষণের শিকার হয়। সুতরাং এটা আমাদের জন্য আর নতুন খবর না। কিন্তু কোনো কোনো দিন আমাদেরই কারো না কারো কাছে ফোন আসে, আদরের শিশুকন্যার লাশ পাওয়া গেছে পাশের বাড়ি থেকে। রক্তাক্ত। আমাদের কেউ কেউ তখন সেই বিস্মৃত ইতিহাসের জ্বলন্ত চরিত্র হয়ে ওঠে। চিৎকার করে। একা। আমরা সমবেত জনতা ভুলে যাই, আর একজন একজন করে চিৎকার করার জন্য প্রস্তুত হই অজান্তে।

 

ইয়াসমিন ট্র্যাজেডি দিবসের সংবাদ পড়তে পড়তে মনে হলো, ইয়াসমিনরা আসলে মরে না, আমরা প্রতিবাদহীন সমাজ যে মরে গেছি সেটা বোঝানোর জন্য ওদের মরে যেতে হয়। কিন্তু আফসোস, ওরা বারবার মরেও আমাদের বোঝাতে পারে না কিছুই।