Skip to content

২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বন্ধুত্বের কোনো লিঙ্গ নেই

বন্ধুত্ব আসলে মজার একটা সম্পর্ক। অন্য সম্পর্কগুলোর মতো বন্ধুত্বে কোনো বস্তুগত দায়বদ্ধতা বা আইনি অথবা পারিবারিক বাধ্যবাধকতা নেই এখানে। পুরোটাই মনের মিল। সেই মিল যেকোনো কিছু দিয়েই হয়ে পারে। আর সে কারণেই বন্ধুও বিভিন্ন ধরনের হয়।

 

একই ধরনের আগ্রহ বা শখের জায়গা থেকে কিছু বন্ধুত্ব হয়। দুজন খুব ক্রিকেট কিংবা সঙ্গীত অনুরাগী মানুষ বন্ধু হতে পারেন। তাদের আর কোনো বিষয়ে মিল আছে কিনা, বা থাকলেও সেটা জানাটাও এতটা প্রয়োজনীয় কিছু না। এমনকি সেই দুইজন একই লিঙ্গের না হলেও তারা বন্ধু হতে পারেন। আর এখন যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এতো সক্রিয়, এমন সময় বন্ধুত্বের মধ্যে কোনো লিঙ্গভেদ থাকবে, সেটা হতে পারে না। অনেকের সাথে হয়তো কখনো কথা হয় নি কিংবা পূর্ব-পরিচিত নন, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এমন অনেকেই নতুন এক বন্ধুত্বের যাত্রা শুরু করছেন প্রতিদিনই। অনেকের হয়তো কথা বলতে ভালো লাগে। আবার অনেকের ঘুরতে কিংবা খেলা দেখতে যেতে। একজন আরেকজনের ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানেন না। জানার প্রয়োজনও বোধ করেন না। বন্ধুত্বের জন্য তাদের শখ বা মনের মিল থাকাটাই যথেষ্ট।

 

আবার অভিজ্ঞতা অথবা আগ্রহের মিল নেই। কিন্তু কোথায় যেন এক আত্মিক টান আছে। সে কারণেও গভীর বন্ধুত্ব হতে পারে। এ ধরনের বন্ধুত্বে কোনো মিলের দরকার নেই। তার সাথে হয়তোবা ঝগড়া লেগেই থাকবে, কিন্তু এরপরও তারা বন্ধু। খুব সকালে পার্কের বাইরে দাঁড়িয়ে চায়ের কাপ হাতে তর্কে জড়িয়ে পড়া দুই ভদ্রলোকও বন্ধু হয়ে যান সেই টানের কারণেই। জীবনের প্রতিটি ধাপেই আমরা বন্ধু বানাই। কারো সাথে কথা বলি, গল্প করি, ঝগড়া করি, এমনকি অনেক সময় যারা আমাদের পথ দেখায়।

 

আগ্রহের জায়গা থেকে আমাদের দুজনের মধ্যে মিল কিছু আছে বৈকি। তবে আমাদের বন্ধুত্বের ভিত্তি একজন আরেকজনের সঙ্গে অমিলের জায়গাগুলো খুঁজে বের করে সেটা নিয়ে একজন আরেকজনকে খোঁচানো এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভয়ংকর ধরনের তর্ক-ঝগড়া করা। কোনো এক কারণে এতেই বন্ধুত্ব আরও শক্ত হয়ে ওঠে। একজন আরেকজনের প্রতি স্নেহ-মমতা বাড়ে। এ ধরনের বন্ধুত্ব বয়স বা লিঙ্গভেদে হয় না।  

তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের দিকে আমরা সবাই একটু আড়চোখেই তাকাই। এড়িয়ে যেতে চাই তাদের। বন্ধুত্ব তো দূরের কথা, তাদের পাশে দাঁড়ানোটাকেও বিব্রতকর মনে করি। খুব স্বাভাবিকভাবেই, এমন ধারণা আমারও ছিল। একটু এড়িয়ে চলতাম সব সময়। পরবর্তীতে কর্মসূত্রে তাদের একদম কাছ থেকে দেখা। ফেরদৌস নামে একজনের সাথে খুব ভালো বন্ধুত্বও হয়ে যায় এক সময়। তার বাড়িতে যাওয়া, এক সাথে খাওয়া-দাওয়া করা, আড্ডা, গল্প, সবকিছুই আমাদের মতোই। কেনই বা হবে না? তারা তো আমাদেরই একজন।

 

এখনও অনেকেই তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের দেখতে পারেন না। তাই আমার বন্ধু আমার কাছে আর বাকিদের মতো হলেও, সমাজের চোখে সে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। সেই সমাজই আমাদের ছোট থেকে শিক্ষা দেয়, তাদের থেকে দূরে থাকতে। তারা বন্ধু হিসেবে খারাপ? না। তাহলে তারা মানুষ হিসেবে খারাপ? সেটাও না। এখানে সমস্যাটা হচ্ছে আমার বন্ধু কোন লিঙ্গের সেটা নিয়ে। আর কারণ, সমাজ এদের মানুষ বলে স্বীকৃতি দেয় না।

 

ইদানীং গণ-পরিবহনে উঠলেই তাদের কয়েকজনকে দেখা যায় চাঁদা তুলতে। কখনো ভালোভাবে চেয়ে, কখনো কথা শুনিয়ে আবার কখনো ভয় দেখিয়ে টাকা নেন তারা। কে কি ভাবলো, সেটা নিয়ে ভাবে না তারা। যেই সমাজের কাছে তাদের অস্তিত্বই নেই, তাদের সামনে চক্ষু-লজ্জা কিসের তাদের। অনেকের ঘৃণা আর তাচ্ছিল্য নিয়েই বেঁচে থাকে তারা। এরপরও বন্ধু হিসেবে এই সমাজের মানুষকে বেছে নিতেও তারা পিছপা হন না। আর এর উদাহরণ আমি আর আমার বন্ধুর বন্ধুত্ব। এতোকিছুর পরও তাদের দিক থেকে লিঙ্গভেদে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়তে যদি কোনো সমস্যা না হয়, তাহলে আমাদের সমস্যাই বা কেন হবে।

 

বন্ধুত্বের কারণ যা-ই হয়ে থাক না কেন, সেটা তাদের পাশে দাঁড়ানোর শক্তির ওপর প্রভাব ফেলেনি। জীবনের বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন কারণে যারা বন্ধু হয়েছে, সবাই একই সংকল্পে আমাকে সাহায্য করেছে এবং আমি বিশ্বাস করি ভবিষ্যতেও করবে। আরেকটা কথা না বললেই নয়। কিছু সম্পর্ক হয়তো সাধারণ বন্ধুত্বের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। সেই সম্পর্ক অসাধারণ বন্ধুত্বের সম্পর্ক হতে পারে। নিজের জীবনে আমি আমার বাবা-মা-বোনের কাছে যে বন্ধুত্ব পেয়েছি, সেটা আমার জীবনকে অনেক সুন্দর করেছে। আমার পরিবারের কাছে যে বন্ধুসুলভ আচরণ পেয়েছি, তা আমার জীবনকে মধুর করেছে। হয়তো বন্ধুত্বের সংজ্ঞা খোঁজাটাই ভুল। তার চেয়ে আমরা নতুন বন্ধু খুঁজি আর পুরোনো বন্ধুদের কাছে রাখি।