Skip to content

২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৯ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রেমের টানে বিদেশিরা বাংলাদেশে, বিশিষ্টজনরা যেভাবে দেখছেন

বেশ কিছুদিন ধরে গণমাধ্যমে খবর আসছে, বিদেশি যুবকরা বাংলাদেশি তরুণীদের প্রেমে পড়ে এই দেশে ছুটে আসছে। আবার কখনো কখনো বিদেশে তরুণীরাও বাংলাদেশি তরুণদের প্রেমে পড়ে ছুটে আসছে। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ ঝড় উঠেছে।

এসব বিষয়ে কথা হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েই চলেছে৷ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার কারণে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ করাটা সহজ হচ্ছে। আর মানুষের যোগাযোগ সহজ করার অন্যতম প্ল্যাটফর্ম হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বিশেষকরে ফেসবুক। আগেকার দিনে মানুষ চিঠির মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতো কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই মানুষ সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।’

এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘ফেসবুক ব্যবহার করেই মানুষ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে৷ এক্ষেত্রে ধোঁকা খাওয়া মানুষের সংখ্যাও কম না৷ সম্প্রতি আমরা দেখতে পাচ্ছি, একের পর এক ভিনদেশি তরুণ-তরুণী প্রেমের টানে বাংলাদেশে আসছে। কেউ অ্যাডভেঞ্চারের জন্য এলেও বেশিরভাগই আসছে প্রেমঘটিত ব্যাপারে৷ এটাকে সোশ্যাল মিডিয়ার সাইড ইফেক্ট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়৷ আপাতদৃষ্টিতে যদিও এটা ট্রান্সন্যাশনাল রিলেশনশিপ তৈরি করছে, তবে ফলস্বরূপ সুদুরপ্রসারী কোনোকিছু বয়ে আনতে পারবে বলে আমার মনে হয় না৷’

জান্নাতুল ফেরদৌস

জান্নাতুল ফেরদৌস আরও বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা নিউজে যেমন ভিনদেশি তরুণ-তরুণীর প্রেমের টানে দেশে আসার খবর দেখতে পাই, তেমনি এ সম্পর্কগুলোর ফাটলও কমবেশি দেখে থাকি৷ কেননা দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের সম্পর্কগুলো বেশিদিন স্থায়ী হচ্ছে না। দীর্ঘস্থায়ী না হওয়ার কারণে এই সম্পর্কগুলো সমাজে নেগেটিভ প্রভাব ফেলছে। আমি মনে করি, আমাদের তরুণ প্রজন্মের সোশ্যাল মিডিয়াকেন্দ্রিক না হয়ে, ট্রেন্ড ফলো না করে বাস্তবতার নিরিখে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরি করার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন৷’

‘প্রেমের টানে অন্যদেশে ছুটে যাওয়া কথাটার ভেতরেই একটা নাটকীয় ব্যাপার থেকে যায়’ বলে মন্তব্য করলেন কবি-কথাসাহিত্যিক নুসরাত সুলতানা। তিনি বলেন, ‘আসলে প্রেম ভূগোল, ভাষা, বয়স, ধর্ম ইত্যাদি কোনো সীমাবদ্ধতাই মানবে না। সেটা খুব সত্য। কিন্তু এটাও সত্য যে, প্রেমে বিশ্বাস ও প্রতিশ্রুতি অনিবার্য। অতি সম্প্রতি যে ঘটনাগুলো ঘটছে, তাকে অতি প্রযুক্তি এবং বিশ্বায়নের কুপ্রভাব বলা যেতে পারে। কারণ ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ম্যাসেঞ্জারের কথোপকথনের মাধ্যমে মানুষকে কি প্রকৃতপক্ষে চেনা যায়? এটা এক ধরনের ইলিউশন। যার ভোগান্তি যিনি ভিনদেশে ছুটে গেলেন, তারই হয়। আর এর ফলে বিভিন্ন রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়তে পারে।’

নুসরাত সুলতানা আরও বলেন, ‘এরকম সফল বিয়ের উদাহরণও দেখা যায়, যেমন রাজীব গান্ধী ও সোনিয়া গান্ধী। তবে তারা দীর্ঘদিন একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন। একজন অন্যজনকে ভালো করে জানতেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘হঠাৎ করে প্রেমের টানে অন্যদেশে ছুটে গিয়ে জীবন বিপন্ন না করাই সমীচীন বলে প্রতীয়মান হয়।’

নুসরাত সুলতানা

সাহিত্যিক ও উদ্যোক্তা মেহতাজ নূর বলেন, ‘এটা ডিজিটাল যুগ। ফেসবুকের মাধ্যমে একজনের সঙ্গে আরেকজনের বন্ধুত্বের মাধ্যমে প্রেমও হয়ে যায় সহজে। সুতরাং প্রেমের টানে বিদেশের ছেলে-মেয়েরা এদেশে এসে বিয়ে করছে বা থেকে যাচ্ছে এটা অস্বাভাবিক কিছু না বা অবিশ্বাসযোগ্যও না। তারপরেও আপত দৃষ্টিতে বিষয়টা যতটা সহজ, ততটা সহজ নাও হতে পারে। এটার আড়ালে অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলেও থাকতে পারে। সেটা ভবিষ্যৎ বলবে এবং তদন্ত সাপেক্ষও বটে। এসব বিয়েতে আমাদের দেশের খুব একটা সুবিধা আছে বলে আমি মনে করি না।’

মেহতাজ নূর আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে যেটা বলবো, বিদেশের প্রতি আকর্ষণ এদের যেন সহজাত। বিদেশ মানে জীবনযাপন উন্নত, অঢেল আরাম-আয়েশ! সুতরাং বিদেশি ছেলে বা মেয়েকে বিয়ে করতে পারলে সে দেশের নাগরিকত্ব পাওয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। একইসঙ্গে নিশ্চিন্ত ভবিষ্যৎ! আমার মনে হয় বিদেশি ছেলে-মেয়েদের প্রতি আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের আকর্ষণের এটাই প্রধান কারণ। সবশেষে বলবো, সরকার যেন এ বিষয়ে একেবারে উদাসীন না থেকে নজর রাখে।’

মেহতাজ নুর

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএসের এমফিল গবেষক নূর-ই নুসরাত বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির যুগে মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ ব্যাবস্থা অত্যন্ত সহজ হওয়ায় ইদানীং এই প্রবণতা বাড়ছে। বিষয়টাকে আমরা দুদিক থেকে বিবেচনা করতে পারি। প্রথমত, বিদেশিদের আগমন এবং দ্বিতীয়ত, এদেশের মানুষের বিদেশপ্রীতি।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদেশিরা প্রাচীন যুগ থেকেই এই ভূমিতে এসেছে নানা প্রয়োজনে ও উদ্দেশ্য নিয়ে। এখানে বসতি স্থাপন করেছে, বংশবিস্তার ঘটিয়েছে। ফলে বাঙালির মধ্যে সংকরায়ন ঘটেছে।

এই গবেষক আরও বলেন, পূর্বে বাণিজ্যিক কারণে উপনিবেশ স্থাপন করতো তারা। বর্তমানে প্রেমের টানে অনেকে আসছে। একদিকে যেমন সংস্কৃতিতে নতুনত্ব যুক্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সংস্কৃতি, রীতিনীতি, মূল্যবোধ ধ্বংসেরও সম্মুখীন হচ্ছে। তবে বাঙালির এ বিষয়ে অভ্যস্ততা বহুকালের। একদিকে বাঙালির সরলতা, অন্যদিকে কপটতাও বহিরাগতদের আকৃষ্ট হওয়ার একটা কারণ হতে পারে।’

নূর-ই নুসরাত

নূর-ই নুসরাত আরও বলেন, ‘দ্বিতীয়ত, বাঙালিরা অনেকে বিদেশে যাওয়ার ও জীবনযাপনের একটা সহজ পথ হিসেবেও এই পথকে নির্বাচন করেন। অন্যদিকে বিদেশি ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের প্রতি এক ধরনের কৌতুহলও একটা বিশেষ কারণ হতে পারে। যেহেতু আমাদের পূর্ব পুরুষের মধ্যে নানা প্রজাতি ও রক্তস্রোত প্রবহমান, সেকারণে বাঙালি কোনো বিদেশিকে সহজেই বিশ্বাস করে এবং গ্রহণ করে। যুগে যুগে এই সংস্কৃতিতে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশের অধিকার অব্যাহত ছিল। এর ফলে একদিকে যেমন জাতিগত পরিচয়ের সংকরায়ন ঘটছে, তেমনি আত্মপরিচয়েরও সংকট দেখা দিচ্ছে। প্রতারিত হচ্ছেন অনেকে।

ভাষা ও সংস্কৃতি বহমান উল্লেখ করে নুসরাত আরও বলেন, ‘সুতরাং একে দেশ কালের গণ্ডিতে বেঁধে রাখা কঠিন। তবে আধুনিক সময়ে অনিরাপত্তা, অনিশ্চয়তা ও নির্বুদ্ধিতা অনেকের জীবনে সমূহ ক্ষতিসাধন করতে পারে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।’

অনন্যা/এসএএস