Skip to content

৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

অসম বয়সীর বিয়ে, সমস্যা কোথায়?

সামাজিক প্রথা অনুসারে একটা বয়সের পর নারী-পুরুষদের সাংসারিক জীবনে প্রবেশ করতে হয়৷ দুজন প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের বিয়ের মধ্য দিয়ে তারা তাদের সংসার জীবন শুরু করে। প্রাপ্ত বয়স্ক দুজন মানুষ নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারেন। এতে কেউ বাধা দিতে পারেন না। কিন্তু প্রতিটি সমাজের একটা রীতি তৈরি হয়। ঠিক যেমন আমাদের সমাজের রীতিতে বিয়ে মানেই ছেলে ও মেয়ের বয়সের পার্থক্য থাকতে হবে। অবশ্যই ছেলেকে মেয়ের তুলনায় বড় হতে হবে। যদি তা না হয় তাহলে তা অসম বিয়ে হিসেবে গৃহীত হবে।

ছেলে-মেয়ের তুলনায় বড় হলে বিয়ে স্বাভাবিক কিন্তু ছেলের তুলনায় মেয়ে বড় হলে তা স্বাভাবিক নয়। এটি কেন হয়? কেন এই বিয়েকে অসম বিয়ে বলা হয়? অসম বিয়ে নিয়ে একেকজন একেক ধারণা পোষণ করে।

আরটিভিতে কর্মরত ট্রেইনি রিপোর্টার তানজিনা তাসনীম বলেন, ‘আমাদের সমাজের মানসিকতা এমন। আমরা নরমালি এটা দেখেই অভ্যস্ত ছেলে বড় হবে, মেয়ে ছোট। যখন একটা মেয়ে বড় হয় তখন পরিবারের লোকজন ভাবে মেয়েকে বয়সে বড় লাগতেছে, মানাবে না দুজনকে। মেয়েটা ছেলেটাকে কন্ট্রোল করবে। মেন্টালিটি মিলবে না দুজনের। মেয়ে আগে বুড়ো হয়ে যাবে। এটা আমাদের সমাজের একটা বলতে গেলে প্রথা হয়ে গেছে মেয়ে ছোট, ছেলে বড় হতেই হবে। আর কোনো কারণ দেখি না।’

ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের ব্রডকাস্ট অপারেশন্সে কর্মরত সুতপা ভাবনা মজুমদার বলেন, ‘সবার আগে অসম বিয়ে বলে আসলেই কিছু নেই বলেই আমি মনে করি। বিয়ে হলো দুটো মানুষের একসঙ্গে একটা জীবন কাটানোর প্রতিশ্রুতি। কে কাকে প্রতিশ্রুতি দেবে, কেন দেবে একমাত্র সেই বোঝে। সমাজে আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি তো, তাই সংখ্যা গরিষ্ঠ যেটাকে ঠিক বলে ভাবে সেটাই নিয়ম হয়ে যায়, যুগযুগ ধরে জীনগতভাবে আমরা ওই ভাব বহন করে চলি।’

গ্রাফিক্স ডিজাইনার নাদিয়া হাসিবা বলেন, ‘অসম বিয়ে বিষয়টি তার কাছে কিছু দিক থেকে ইতিবাচক আবার কিছু দিক থেকে নেতিবাচক। তিনি ইতিবাচক দিক সম্পর্কে বলেন, যা আমরা দেখে আসছি এবং আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি বিয়ের ক্ষেত্রে যে পুরুষের সাথে নারীর বিয়ে হচ্ছে সেই পুরুষ নারীর থেকে বয়সে বড় হয় প্রায় ৮-১০ বছর। এই বয়সের ব্যবধান নিয়ে একজন নারী-পুরুষ সংসার শুরু করেন। একটা সময় পর দেখা যায় ঐ নারীগুলো বিধবা হয়ে যাচ্ছে। তাদের স্বামী গড় আয়ুর উল্লিখিত বয়সের মধ্যে মারা যাচ্ছেন। ফলে নারীদের তখন থেকে একা থাকতে হচ্ছে। এ কারণে বয়সের পার্থক্যের বিষয়টিকে তিনি নেতিবাচক হিসেবে দেখছেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী লাবণী আক্তার বলেন, ‘যারা গ্রামে বড় হয়েছেন তাদের জন্য সামাজিক একটা রীতিই হয়েছিল মেয়ের বিয়ে মেয়ের বয়সে বড় ছেলের সাথে দিতে হবে। পূর্বে থেকে এই নিয়ম চালু হয়ে আসায় এটাকেই সবাই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিয়েছেন। এ কারণে বয়সের ব্যবধান মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। এছাড়া, একটি কারণ হলো আগে সংসারের আয়ের উৎস শুধু ছেলেরাই হবে, মেয়েরা ঘরের কাজেই নিজেকে বদ্ধ রাখবে এ কারণে মেয়ের বিয়ে তার থেকে বড় কারো সাথেই দিতে হবে নয়তো সংসারের দায়িত্ব কিভাবে নিবে। কিন্তু বর্তমানে সময় ও যুগ দুটোই পরিবর্তন হয়েছে। এখন মেয়েরাও ছেলেদের মতো বাইরের কাজ করে। তাই একটা সময় পরে সবার মনোভাবের পরিবর্তন আসে। ঠিক যেমন এখন এসেছে। এখন অনেকেই বয়স কোন ফ্যাক্ট বলে মনে করেন না। যে যেভাবে খুশি থাকে তাকে সেভাবেই খুশি থাকতে দেওয়া উচিত।’

হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সুমনা আক্তার বলেন, ‘অসম বিয়ে বলতে আমরা যা বুঝি মেয়ে বড় ছেলে ছোট। আমাদের দেশে দশ বছরের ছোট কনেকে বিয়ে করা স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো নারী তার চেয়ে দশ বছরের ছোট কোনো পুরুষকে বিয়ে করলে সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। বন্ধুরা বলে, দোস্ত তোর বউতো বুড়া।কার বউ দেখতে কেমন, এটা একটা সামাজিক বিষয়। সবার মন যুগিয়ে পাত্রী নির্বাচন করতে হয়। সবাই বয়সের সঙ্গে বিবাহিত জীবন গুলিয়ে ফেলেন। মুরব্বিদের উপদেশ, বেশি বয়সী মেয়েদের যৌবন যায় দ্রুত। কম বয়সী খোঁজো। বয়সী মেয়েকে দেখতে ভালো লাগে না।কে বুঝবে এই সামাজিক প্রেশার কত চাপানো। পশ্চিমে ঘরে ঘরে অসম বিয়ে হয়। এক সময় সবকিছুই পুরাতন হয়। দৈহিক জৌলুশ ম্লান হয়। কিন্তু মানসিক তারুণ্য ও ঐক্যে এই বিয়েগুলো সুখ খুঁজে পায়। পৃথিবীর সব সম-অসম বিয়ের যুগল সুখী হোক। দুই দিনের দুনিয়ায় সুখ দিয়ে কথা। একটাই জীবন। যে যেভাবে ভাবে, সেভাবে কাটায়।’

নীলফামারী সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সিফাত আক্তার বলেন, ‘অসম বয়সীদের বিয়ে নিয়ে কথা বলতে গেলে আসলে বলতে হয় বয়স কখনো ফ্যাক্ট না। তার মতে মেয়ে বড় নাকি ছেলে বড় এটা দেখে বিয়ে দেওয়া ঠিক না, কিন্তু আমরা সমাজের ভয়ে এটা মেনে নেয় না বা মেনে নিতে পারে না। মানুষের এই ভুল ধারণা টা বদলানো উচিত। বড় ছোট বিবেচনা না করে যে যার সাথে সুখে থাকে তাকে তার সাথে থাকতে দেওয়া উচিত। ‘

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা বলেন, ‘একজন মানুষ যখন কাউকে সত্যিকারের ভালোবাসে, তখন সে চেহারা, গায়ের রঙ, জাত, এমনকি বয়সের ব্যাপারটাও গ্রাহ্য করে না! এ জন্যেই কুরূপা নারীর জোটে রূপবান বর, হয় দুটি আলাদা ধর্মের মানুষের বিয়ে, গড়ে ওঠে অসম বয়সের দুটি মানুষের মধ্যে মনের সম্পর্ক। আমাদের সমাজে মেয়েরা তার চেয়ে বয়সে বড় ছেলেকে বিয়ে করবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই বলে কি ব্যতিক্রম হয় না? একজন ছেলে তার চেয়ে বয়সে বড় মেয়ের প্রেমে পড়তেই পারে, তাকে ভালোবাসতে পারে, বিয়েও করতে পারে। কিন্তু এমন অসম বয়সের সম্পর্ক আমাদের সমাজ ও পরিবার সহজে মেনে নিতে চায় না। ফলে তাদের যেতে হয় অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে। শুনতে হয় অসংখ্য কটু কথা, সইতে হয় হাজারো লাঞ্ছনা-গঞ্জনা। বয়সের পার্থক্যের কারণে মাঝে মাঝে সমস্যা দেখা দেয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও। এর থেকে বেরিয়ে আসার উপায় কোথায় পাওয়া যাবে?’

অনন্যা/এআই