Skip to content

২০শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

বাল্যবিবাহ, একটি শৈশবের অপমৃত্যু

ছবিঃ সংগৃহীত

সমাজের কিছু মারাত্মক ব্যাধি আছে। দিনের পর দিন সমাজ আধুনিক থেকে আধুনিকতর হলেও সমাজ থেকে এ ব্যাধিগুলো সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। তার মধ্যে একদম বিস্তৃতভাবে শেকড় গেড়ে বসে আছে ‘বাল্যবিবাহ’ নামক ভয়ংকর এক ব্যাধি। যার কবলে অপমৃত্যু হচ্ছে শৈশবের। এক একটি বাল্যবিবাহের কাছে আত্মসমর্পণ করছে হাজারো স্বপ্ন।

হাজেরার (ছদ্মনাম) কথাই বলি চলুন। রাজধানীর সংসদ ভবনের সামনে চা বিক্রি করে। বয়স বড়জোর ১৬ হবে। এক হাতে চায়ের ফ্লাক্স ও চা তৈরির বাকি সরঞ্জাম। আরেক হাত দিয়ে কোলে নেওয়া এক শিশু। তার কোলের শিশুর বয়স সাত কী আট মাস হবে। বয়সের ভারে না হলেও দায়িত্বের ভারে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই নুয়ে পড়ছে তার শরীর। সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নয়, নিতান্তই কৌতূহলের বশেই তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বিয়ে হয়েছিল কত বছর বয়সে। মুখে একরাশ হতাশা নিয়ে উত্তর দিলো, ১৪ বছর বয়সে।

এরপর শুরু হলো হাজেরার সঙ্গে তার বিয়ে নিয়ে গল্প। বাবা-মায়ের ইচ্ছেতেই বিয়ে করে সে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই কোলজুড়ে আসে ফুটফুটে এক কন্যাসন্তান। মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্বামী, সন্তানের পাশাপাশি সংসারের হালও ধরতে হয়েছে তাকে। স্বামীর সামান্য রোজগারে সংসার খুব একটা চলে না। তাই রোজ ঘরের কাজ সামলে বাচ্চাকে নিয়ে বের হয়ে যান সংসদ ভবনের সামনে চা বিক্রি করার উদ্দেশ্যে। এখানে ঘুরতে আসা মানুষের কাছে চা বিক্রি করে যা উপার্জন হয়, তা দিয়ে কিছুটা হলেও সংসার চলে।

বাল্যবিবাহের কাছে আত্মসমর্পণ করছে হাজারো স্বপ্ন।

শারীরিক বিভিন্ন জটিলতায়ও ভুগছে সে। তবে বাল্যবিবাহের জন্য পরিবারকে দায়ী করতে রাজি নয়। তাকে নিয়ে খবরের কাগজে লিখতে চাই শুনে এড়িয়ে যাওয়া শুরু করে। নিজের ছবি কিংবা নাম ব্যবহারেও রয়েছে আপত্তি। বাল্যবিবাহের কবলে তার শৈশব-কৈশোর সব হারালেও বাল্যবিবাহ যে একটি অপরাধ, এর বিরুদ্ধে রয়েছে আইন, তার কিছুই জানে সে। এমন বহু হাজেরার গল্প আছে দেশজুড়ে। যাদের শৈশব-কৈশোরের হাজারো স্বপ্ন নষ্ট হয়েছে বাল্যবিবাহের কবলে৷

করোনার সময় দেশজুড়ে বাল্যবিবাহ আলোচনায় আসে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসা কয়েকটি তথ্য তুলে ধরছি। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আলীপুর আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রেণিতে মোট ছাত্রী ৪৭০ জনের মধ্যে ৬৭ জনই বাল্যবিবাহের শিকার হয়। তালা উপজেলার শার্শা বাহারুল উলুম মাদ্রাসায় মোট ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ১৬৯ জন৷ এর মধ্যে মোট ছাত্রী ৮৭ জন৷ ছাত্রীদের ৪০ জনের বিয়ে হয়ে যায় করোনার সময়৷ বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনাকালে বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ৬৫টি করে বাল্যবিয়ে হয়েছে৷ সাত মাসে ২১ জেলার ৮৪ উপজেলায় মোট ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিবাহের তথ্য পান তারা৷ যদিও হিসেবের বাইরে আরও বড় একটি সংখ্যা বাকি রয়ে যায়।

গত ৫০ বছরে বাল্যবিবাহের হার কমেছে ৪২ শতাংশ। কিন্তু এ গতিতে বাল্যবিবাহের হার কমলে ২০৫০ সালেও দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ দূর করা যাবে না।

বাল্যবিবাহ হল অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক অথবা অনানুষ্ঠানিক বিবাহ। আইনত বিয়ের বয়স ১৮ বৎসর, বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে। কিন্তু বিশেষ ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি সাপেক্ষে এই বয়সের আগেও বিয়ের অনুমতি দেয়া হয়। যদিও আইন অনুযায়ী বিয়ের বয়স ১৮ বছর, তারপরও কিছু কিছু দেশের নিজস্ব প্রথাকেই আইনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাল্যবিবাহে মেয়ে এবং ছেলে উভয়ের ওপরই প্রভাব পড়ে। তবে আমাদের সমাজে বাল্যবিবাহের কারণে মেয়েরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে বাল্যবিবাহের বেশি শিকার হয় মেয়েরা। বাল্যবিবাহের নেপথ্যে বেশ কিছু কারণ রয়েছে যা মূলত বাল্যবিবাহের জন্য দায়ী। যেমন: দারিদ্র্য , যৌতুক, সামাজিক প্রথা, বাল্যবিবাহ সমর্থনকারী আইন, ধর্মীয় ও সামাজিক চাপ, অঞ্চলভিত্তিক রীতি, অবিবাহিত থাকার শঙ্কা, নিরক্ষরতা ও মেয়েদের উপার্জনে অক্ষম ভাবা।

শিল্প বিপ্লবের আগে, ভারত, চীন ও পূর্ব ইউরোপসহ বিশ্বের অনেক অংশে, নারীদের বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছানোর পরপরই বিয়ের প্রবণতা ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সমাজে মেয়েদের সাধারণত বয়ঃসন্ধির আগেই বিয়ে দেয়া হত। প্রাচীন গ্রিসে কম বয়সে বিয়ে এবং মাতৃত্ব উৎসাহিত করা হত। এমনকি ছেলেদের ও তাদের কৈশোরেই বিয়ের জন্য উৎসাহ দেয়া হত। বাল্যবিবাহ ও কৈশোরে গর্ভধারণ খুবই সাধারণ ঘটনা ছিল। তবে ধীরে ধীরে বাল্যবিবাহের কুফল সাধারণ মানুষের বোধগম্য হওয়া শুরু করে। এর বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা শুরু করেন বিশিষ্টজনেরা। তৈরি হয় নানান আইন। বিভিন্ন দেশ একের পর এক পদক্ষেপ নেয় বাল্যবিবাহ রোধে। তবে সবদিক থেকে অনেকটাই পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ।

ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, ১৯৭০ সাল থেকে ২০২০ পর্যন্ত বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার কমেছে। ১৯৭০ সালে দেশে বাল্যবিবাহের হার ছিল ৯৩ শতাংশ। ২০২০ সালে তা ৫১ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ গত ৫০ বছরে বাল্যবিবাহের হার কমেছে ৪২ শতাংশ। কিন্তু এ গতিতে বাল্যবিবাহের হার কমলে ২০৫০ সালেও দেশ থেকে বাল্যবিবাহ সম্পূর্ণ দূর করা যাবে না।

মেয়েদের ক্ষমতায়ন ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলার জন্য কাজ করতে হবে। তারা যেন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারে, বাল্যবিবাহকে ‘না’ বলতে পারে।

আমাদের দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবার বা অভিভাবক ছেলের পড়ালেখার ব্যাপারে কোনো দ্বিধা পোষণ না করলেও মেয়ের বেলায় ১০ বার ভাবেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শুরুর দিকে ছেলে-মেয়ে উভয়কেই স্কুলে ভর্তি করা হলেও ধীরে ধীরে ঝরে যায় মেয়েরা। স্কুল ছেড়ে তাদের ঠাঁই হয় সংসারে। বাল্য বিবাহের কবলে পরে যে বয়সে নিজের পুতুল খেলার কথা সে বয়সে সন্তানের পুতুল হাতে নিয়ে ঘুরতে হয় কিশোরীদের। অনেককিছু বুঝতে পারে না, তখন মা হতে গেলে সমস্যা তো হবেই।

বাল্যবিবাহের কারণেই মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। যখন অপ্রাপ্ত বয়সে কোনো মেয়ের বিয়ে হয় তার প্রভাব শারীরিক ভাবে যেমন পরে, মানসিক ভাবেও পরে। আমাদের দেশে যৌনশিক্ষা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার সিস্টেম নেই। তাই ১৮ বছর বয়সেই অনেকেরই যৌন স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক কিছু অজানা থাকে। আর সেখানে ১২/১৩ বছর বয়সে যদি কোনো মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হয় সে অনেক কিছু বুঝবে না; এটাই স্বাভাবিক। তার ওপর দেখা যায় বছর না ঘুরতে অনেকে গর্ভধারণ করে ফেলছে। এর ফলে সেই কিশোরীর মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, সেই সঙ্গে মানসিক চাপও বৃদ্ধি পায়। যেই বয়সে তার সহপাঠীদের সঙ্গে খেলা করার কথা, সেই বয়সে সংসার, সন্তানের দায়িত্ব পালন করা মুখের কথা নয়।

বাল্যবিবাহের কারণেই মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।

বাল্যবিবাহ রোধে সরকার বিভিন্ন আইন তৈরি করেছে, বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে তা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে কই। যেমন, শিশুদের জন্য জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯৮-এর কাজই হলো শোনা। এ হেল্পলাইন নম্বরটি টোল ফ্রি। দিনে ২৪ ঘণ্টাই শিশুসহায়ক জাতীয় হেল্পলাইন সেবা কার্যক্রম চলমান থাকে। এ হেল্পলাইনের বিষয়ে ধারণা নেই দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের। শিশুদের তো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। বিভিন্ন আইনের কথা নাই বা বললাম।

বাল্যবিবাহ রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। যেমন, আজকাল স্কুলে ভর্তির দিক দিয়ে আমরা চ্যাম্পিয়ন। আবার কন্যাশিশুর ঝড়ে পড়ার দিক দিয়েও আমরা চ্যাম্পিয়ন। এ সমস্যা দূর করতে মেয়েদের ১৮ বছর বয়সের আগপর্যন্ত বৃত্তি দেওয়া যেতে পারে। তাহলে তা বাল্যবিবাহ রোধের ক্ষেত্রে একটা বাধা হিসেবে কাজ করবে।

এছাড়া, মেয়েদের ক্ষমতায়ন ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলার জন্য কাজ করতে হবে। তারা যেন নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে পারে, বাল্যবিবাহকে ‘না’ বলতে পারে। সমাজে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। যেন সবাই বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে উদ্যোগ গ্রহণ করে।

২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিবাহমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনের লক্ষ্য রয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে এখনই বাল্যবিবাহকে রুখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন হচ্ছে। সবকিছু ধীরে ধীরে ভালোর দিকে এগোচ্ছে। তবে বাল্যবিবাহের লাগাম কেন টেনে ধরা যাচ্ছে না? আর কত শত শৈশবের মৃত্যু ঘটলে, স্বপ্নভঙ্গ হলে লাগাম টানা সম্ভব হবে?

অনন্যা/জেএজে