Skip to content

৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারী: যেন চিরকাল নিঃসঙ্গ অভিমন্যু

প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগের উন্নতিও ঘটছে। তবে, যত যোগাযোগের উন্নতি ঘটছে, ততই প্রগতির গতি থেমে যাচ্ছে। আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার হার যত বাড়ছে, তত অন্ধতা-মূর্খতা কমছে না। বরং উল্টোচিত্র বেশি দেখা যাচ্ছে। আর বাংলাদেশে ধর্মীয় গোড়ামি-উগ্রতা সমাজে জেঁকে বসেছে। এই উগ্রতা-ধর্মান্ধতার সবচেয়ে বড় বলি হতে হচ্ছে নারীকে। তার হাতে শেকল, পায়ে শেকল পরাচ্ছে তারই সাধের পুরুষতন্ত্র। সেই আগুনে ঘি ঢালছে পুরুষতন্ত্রেরই আজ্ঞাবহ এক শ্রেণীর নারী। যারা বুঝে-না বুঝে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই নারী হয়েও অন্য নারীর সর্বনাশ ডেকে আনার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। ফলে নারী আগে যেমন শত্রুবেষ্টিত ছিল, এখনো তেমনই আছে। বলা যায়, আগের চেয়ে সম্প্রতি নারীর শত্রুর সংখ্যা বেড়েছে, কমেছে মিত্র।

নারীর শত্রু যেমন পরিবর্তনশীল, তেমনি মিত্রও। তবে, দীর্ঘমেয়াদি শত্রু বাড়লেও, মিত্র জুটছে স্বল্পমেয়াদি। কখনো মুহূর্তমাত্রের, কখনো কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাসের মিত্র মিলছে। কোনো মিত্রই দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। কারণ মিত্ররাও স্বার্থান্ধ। যত দিন স্বার্থ আছে, ততদিন তারা নারীর মিত্র, স্বার্থ ফুরালেই সম্পর্কচ্ছেদ। সমাজে দুর্যোধন-দুঃশাসনের সংখ্যা বেশি। শ্রীকৃষ্ণেরা সংখ্যালঘু। তাই সমাজে যতই দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের ঘটনা ঘটে, তত কর্ণ, কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্যদের নিষ্ক্রিয় থাকতে দেখা যায়। তারা নারীর অপমানে জ্বলে ওঠে না, বরং দর্শক সারিতে বসে হাততালি দেন। তারা নিজের পদ-পদবি হারানোর ভয়ে দুর্যোধন-দুঃশাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেন না। ফলে সমাজে দ্রৌপদীদের অসহায়ভাবে ডাকতে হয় সেই ‘দীনবন্ধু’ শ্রীকৃষ্ণকেই। কিন্তু সমাজের সংখ্যালঘু শ্রীকৃষ্ণরা এখন অনেক বেশি আত্মমগ্ন। তাই তারা অসহায় নারীকে উদ্ধারে আগ্রহ দেখান না।

দীনবন্ধুরা কেন নিষ্ক্রিয় থাকেন—এমন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে নারীর বাবা-মায়ের পরিবারের দিকে দৃষ্টি দিতে হয়। অধিকাংশ পরিবারে কন্যাসন্তানকে দেখা হয় বোঝা হিসেবে। পরের ঘরের যাত্রী-বউ হিসেবে। ফলে যে যাত্রী বয়ঃপ্রাপ্ত হলেই চলে যাবে পরের ঘরে, তার জন্য পুত্র-সন্তানদের মতো এত মনোযোগ পরিবার দেয় না। এমনকি তার পড়াশোনা, খেলাধুলা, জীবন-যাপনেও যত্নশীল হয় না পরিবারগুলো। যে কন্যাসন্তান একটু বড় হতেই আত্মপরিচয়ে সন্ধানে নামে, তাকে সেখানেই থামিয়ে দেয় পরিবার। বাবা-চাচা, দাদা-ভাই; কেউই তার প্রতিভার বিকাশের পথ সুগম করে দেয় না। উল্টো তাকে ঘরবন্দি করে দাসীতে পরিণত করার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়।

বাবার পরিবারের নিয়ম-কানুনের সঙ্গে স্বামীর বাড়ির পরিবেশে খুব হেরফের হয় না। উভয় পরিবারেই একই চিত্র, একই আচরণ। তাই নারী যেন উত্তপ্ত কড়ায় থেকে এসে আগুনের চুল্লিতেই পড়ে। আর সমাজও সেই সব নিয়মকে সমর্থন করে, নারীর জন্য নির্দিষ্ট গণ্ডি রচনা করে দেয়। 

বাবা-মায়ের সংসারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অপ্রাপ্ত বয়স্ক তো বটে, প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত-বিবাহিত কোনো নারীরই অভিমতের মূল্য নেই। পুত্র-সন্তান নাবালক হলেও তার মতের মূল্য যেন রাজাজ্ঞা। কন্যাসন্তান যত প্রাজ্ঞ ও শিক্ষিতই হোক, তাকে তাচ্ছিল্য করার মধ্যেই পরিবারের বাবা-মা-ভাই-দাদা-চাচাদের যেন সমস্ত কৃতিত্ব লুকিয়ে থাকে। ছোটখাটো অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে কন্যা-সন্তানটির বিয়ের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি হয়। বিয়ে-বিচ্ছেদ-উৎসবে কোথাও কন্যা-সন্তানের অভিমতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। পরিবারের পুরুষরা যেমন তাদের গুরুত্ব দেয় না, তেমনি পুরুষতন্ত্রের সহযোগী বয়স্ক নারীরাও একই রকম আচরণ করেন। এমনকি সম্পত্তিবণ্টনের মতো গুরুতর সিদ্ধান্তেও নারীর অংশগ্রহণ থাকে না। অর্থাৎ কন্যাসন্তান নিজের বিয়েতে যেমন নিজের জোরালোভাবে অভিমত জানাতে পারে না, নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না, তেমনি সম্পত্তি থেকে তাকে বঞ্চিত করলেও তার প্রতিবাদ করতে পারে না। সম্পত্তি থেকে নারীকে বঞ্চিত করার সহজ পথ হলো ভাবালুতার আশ্রয় নেওয়া। ভাইয়েরা বোনদের বোঝায়—সম্পত্তির ভাগ নিয়ে গেলে তখন বাবার বাড়িতে আসা-যাওয়াটা অনধিকারচর্চার মতো হবে। আর ভাগ না নিলে অধিকার নিয়ে আসা-যাওয়া করা যাবে। নারীরা অনিচ্ছাসত্ত্বে হলেও বছরে অন্তত একবার আসার প্রত্যাশায় নিজের হিস্যা ছেড়ে দেয় ভাইদের। এভাবে তারা ছোটবেলা থেকে যেমন পরিবারে অবহেলিত থাকে, তেমনি পরিণত বয়সেও পুরুষতন্ত্রের জটিল জালে আটকা পড়ে পৈতৃক সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়।

বাবা-মায়ের পরিবারের চেয়ে বেশি শোচনীয় জীবন-যাপন করতে হয় স্বামীর সংসারে। সে প্রেম হোক কিংবা সামাজিকভাবে দেখাশোনা করে বিয়ে হোক, উভয়ক্ষেত্রেই নারীর ভাগ্য একই রকম। বাবা-ভাই যেমন পুরুষ, স্বামীও তেমন। পুরুষ হওয়া দোষের নয়, কিন্তু তারা উভয়পক্ষই পুরুষতন্ত্রের ধারক। উভয়পক্ষই নারীস্বাধীনতা-নারীঅধিকারের বিরুদ্ধে। তাই নারীকে পদানত করে রাখার চেষ্টা বাবা-ভাই যেমন করে, তেমনি করে স্বামী-শ্বশুরও। বাদ যান না নারী হওয়া সত্ত্বেও শাশুড়িও। শাশুড়িও পুরুষতন্ত্রের সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। পুত্রবধূর পদে পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন। পুত্রবধূ ঘনকন্নায় কতটা মনোযোগী, কতটা আত্মপ্রকাশে উন্মুখ, কতটা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টায় সাধনা করছে, এইসব কর্মকাণ্ড নজরদারিতে রাখেন শাশুড়ি। ক্ষেত্রবিশেষে ননদও।

বাবার পরিবারের নিয়ম-কানুনের সঙ্গে স্বামীর বাড়ির পরিবেশে খুব হেরফের হয় না। উভয় পরিবারেই একই চিত্র, একই আচরণ। তাই নারী যেন উত্তপ্ত কড়ায় থেকে এসে আগুনের চুল্লিতেই পড়ে। আর সমাজও সেই সব নিয়মকে সমর্থন করে, নারীর জন্য নির্দিষ্ট গণ্ডি রচনা করে দেয়। ওই গণ্ডির বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা নারীর থাকে না। সমাজ নিয়ম তৈরি করে নারীকে সেই শৃঙ্খলা মানতে বাধ্য করে। সমাজের পাশাপাশি আছে রাজনীতিও। কেবল দলীয় রাজনীতি নয়, কৌশলগত রাজনীতিও নারীকে দলিত করতেই যেন প্রস্তুতি নেয়। নারীকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণের দায়িত্বে থাকতে দেওয়া হয় না। দিলেও তাকে নানাভাবে কটাক্ষ করেই পুরুষতন্ত্রের পেটের ভাত হজম করতে হয়।

তখনই নারী দেখে ‘চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন’। তখনই একেক জন জীবনের কুরুক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ-নিরস্ত্র অভিমন্যুতে পরিণত হয়। আর না জেনেই ঢুকে পড়ে কৌরবদের তৈরি চক্রব্যূহে। যেখানে সমস্ত সমরাস্ত্রে সজ্জিত রথী-মহারথীরা।

পুরুষতন্ত্র নারীকে পদানত করে রাখতে চায়, প্রথা-ধর্মের দোহাই দিয়ে। এর কারণ মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধ জীব সমাজের প্রচলিত প্রথাকে সাধারণত অস্বীকার করতে পারে না। লঙ্ঘন করার সাহস পায় না। যারা প্রথা ভাঙতে চায়, তাদের সাধারণত সমাজচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এসব ভয়ে নারী প্রথাকে অস্বীকার করার সাহস পায় না। নারীকে প্রথার দোহাই দিয়েও যখন দমিয়ে রাখা যায় না, তখন পুরুষতন্ত্র তার দিব্যাস্ত্র ‘ধর্মের’ আশ্রয় নেয়। ধর্মগুরুদের তৈরি করার নানা রকমের বিধি-বিধান তখন নারীর ওপর আরোপ করার চেষ্টা চালায়। পুরুষতন্ত্রের অন্য অস্ত্র বা কৌশল ব্যর্থ হলেও ‘ধর্মীয় দিব্যাস্ত্র’ বিফল হওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না। এই ‘দিব্যাস্ত্র’ ঘোরতর বিজ্ঞানমনস্ক নারীকেও ‘তন্ত্রমন্ত্রে’ বশীভূত করে ফেলে। ওই নারীও তখন পুরুষতন্ত্রের আজ্ঞাবহ দাসীতে পর্যবসিত হয়ে পড়ে।

তবে, নারীরা সবচেয়ে বেশি শারীরিক-মানসিক নিপীড়নের শিকার হন কর্মক্ষেত্রে, পথে-ফুটপাতে ও গণপরিবহনে। অধিকাংশ কর্মস্থলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থাকেন পুরুষরা। তারা নানা ছলে নারী সহকর্মীর গায়ে হাত দেওয়া, তাকে অশালীন ইঙ্গিত করাসহ নানাভাবে হেনস্তা করেন। নানা ছলে নারী সহকর্মীদের নিজের কব্জায় আনার চেষ্টা করেন। না পারলে চাকরিচ্যুতির হুমকি দেন। এছাড়া অফিস শুরুর আগে নারীদের অফিসে এনে বসিয়ে রাখা, অফিস আওয়ার শেষেও তাদের নানা উছিলায় আটকে রাখার চেষ্টা পুরুষ কর্মকর্তাদের থাকেই। পুরুষ বসরা সবচেয়ে ঘৃণ্য যে কাজটি করেন, সেটি হলো, বন্ধের দিনও বিশেষ কাজ আছে বলে নারী সহকর্মীদের অফিসে ডেকে আনেন। ওই দিন পুরুষদের কাজই থাকে নারী সহকর্মীদের পারিবারিক-ব্যক্তিগত নানা বিষয়ে প্রশ্ন করে জর্জরিত করা। একপর্যায়ে সহমর্মিতায় ছুঁতোয় নারীর গায়ে হাত রাখা। সেই হাত স্পর্শকাতর জায়গায় অবশ্যই রাখবেন তারা।

এর বাইরে পথে-ফুটপাতেও নারীদের চলাফেরায় নিরাপত্তা নেই। সেখানেও বখাটেরা ওঁৎপেতে থাকেই। সুযোগ পেলেই গায়ে হাত দেওয়া থেকে শুরু করে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা চালায় বখাটে-সুযোগসন্ধানীরা। এরপর আছে গণপরিবহন। সেখানে হেল্পারের হাত এড়িয়ে গাড়িতে ওঠা বা নামা কোনোটাই সম্ভব নয়। এছাড়া গাড়ির ভেতরে যে নারী নিরাপদে বসবে, তারও জো নেই। অর্থাৎ নারীর শরীরে হেল্পার থেকে শুরু করে সহযাত্রী সবারই হাত দেওয়া চাই। না হলে তাদের হাত নিশপিশ করেই। এভাবে নারীর জন্য সর্বত্রই নিপীড়নের চক্রব্যূহ রচনা করে রেখেছে পুরুষতন্ত্র। এই পুরুষতন্ত্র নারীকে নিজের ইচ্ছামতো ব্যবহার করবে, ভোগ করবে। না পারলে নিপীড়ন চালাবে। এটাই যেন নিয়তি। এর বিরুদ্ধে কথা বললে কৃষ্ণদেরও কলঙ্কের তিলক পরিয়ে দেয় পুরুষতন্ত্র। আর এসব কারণেই কৃষ্ণরা এখন নিষ্ক্রিয়। এগিয়ে আসে না দ্রৌপদীদের উদ্ধারে।

সচেতন নারীরা অনেক সময় এইসব পুরুষতন্ত্রের জাল থেকে রক্ষা পেতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান-সংঘের আশ্রয় নেয়। কিন্তু সেখানেও পুরুষতন্ত্রের ভূত ঘাপটি মেরে থাকে। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানও নারীর জন্য সহায়ক হয় না, বরং তার জীবনকে বিপর্যস্ত করে দেওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখনই নারী দেখে ‘চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন’। তখনই একেক জন জীবনের কুরুক্ষেত্রে নিঃসঙ্গ-নিরস্ত্র অভিমন্যুতে পরিণত হয়। আর না জেনেই ঢুকে পড়ে কৌরবদের তৈরি চক্রব্যূহে। যেখানে সমস্ত সমরাস্ত্রে সজ্জিত রথী-মহারথীরা। নারী একা নিরস্ত্র, নিঃসঙ্গ অভিমন্যুর মতো নিজের জীবনকে ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে ধাবিত করে। যে দুই একজন ওই চক্রব্যুহে না ঢুকে বাইরে থাকতে পারেন, তাদের দুই-একজন নিজের জীবনকে নিজের মতো করে সাজাতে পারেন।

অনন্যা/এআই

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ