Skip to content

২০শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

স্ত্রীর চাকরিতে স্বামীর আপত্তি, বেতনে লোভ!

বড়ই তাজ্জব ব্যাপার হলেও আধুনিক যুগে এসেও নারীকে করায়ত্ত করার জন্য পুরুষের ফাঁদের শেষ নেই। নারী মানেই যেন পুরুষের গলগ্রহ। বিশেষ করে, স্বামীর কাছে। ব্যতিক্রম হয়তো আছে কিন্তু তার সংখ্যা ন্যূনতম।

একশ্রেণির পুরুষ আছেন যারা নারীকে গৃহবন্দি রেখেই তার জীবন নির্বাহ করতে বাধ্য করে। আবার আরেক শ্রেণি স্ত্রীকে বাইরে কাজের সুযোগ দিতে চায়, তার নিজের স্বার্থে! স্ত্রী চাকরি করবে কিন্তু উপার্জিত অর্থ আসবে স্বামীর হাতে। আবার কেউ কেউ আছে, যারা আয়কৃত অর্থ যেন নিজের অ্যাকাউন্টে সরাসরি ট্রান্সফার হয়, সে ব্যবস্থাও করেন। তবে পুরুষের হাত থেকে নারীর কি রক্ষা নেই কখনোই! স্ত্রীর চাকরিতে বাধা দেওয়ার সব তদবির করেও যখন ফল হয় না তখন অনেকেই অনুমতি দিয়ে থাকে। কিন্তু বাধা দিলেও টাকাটা কিন্তু স্বামীরই প্রাপ্তি ঘটে কারণ তিনি স্ত্রীকে অনুমতি দিয়েছেন তাইতো চাকরিটা করেছেন তিনি! পুরুষের এমন কপটতাপূর্ণ কথার কাছে নারীরা জিম্মি হয়ে পড়েন।

একজন নারী ও একজন পুরুষ মিলে দাম্পত্য সম্পর্কে গঠন করে। কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে যতটা স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করার সুযোগ থাকে, নারীরা ততটা পারে না। প্রকৃতিগতভাবে নারীরা ঘরমুখো। কারণ শৈশব থেকে সেভাবেই গড়ে তোলা হয়। কিন্তু নারীরা পুরুষের সমকক্ষ। একজন পুরুষ ও একজন পুরুষের দৈহিক কিছু ভিন্নতা ছাড়া বুদ্ধিবৃত্তিক জায়গায় কোনো পার্থক্য নেই। তবে আচরণগত পার্থক্য বিদ্যমান।

নারীরা পিতৃগৃহ ত্যাগ করে স্বামীর হাত ধরে একটি অপরিচিত পরিবারে প্রবেশ করে। পরিবারের একমাত্র বিশ্বাসী ও ভরসা তখন নারীটি ওই পুরুষটিকেই করে। কিন্তু সেখানেও আসে বাধার দেওয়াল। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিয়ের পরে ও আগে উভয় জীবনযাপনের মাঝে আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে যায়। এই ফারাক সৃষ্টিতে বেশিরভাগক্ষেত্রে চাপিয়ে দিয়ে বা ভালোবেসে নারীকে তার স্বাভাবজাত জীবন থেকে সরিয়ে আনা হয়। কারণ ওই নারীকে আবেগে কাতর করে বিশ্বাস করতে বাধ্য করানো হয়, ‘পতিই সতীর গতি’। নারীরা এই জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হতে তার জীবনের কোনো সিদ্ধান্ত নিজে গ্রহণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। একদিকে পারিবারিকভাবে গড়ে ওঠে ঘরমুখী হয়ে, অন্যদিকে স্বামীর পরিবারেও একই হাল। ফলে নারীরা পুরুষের আধিপত্য স্বীকারকেই স্বাভাবিক ও বাস্তব বলে বিশ্বাস করে।

পুরুষের এই আধিপত্যের জের ধরে অনেক পুরুষ নারীকে বাইরে চাকরি করতে দিতে নারাজি থাকেন। আবার অনেক পুরুষ আছেন যারা স্ত্রীর সুন্দর ক্যারিয়ার সবকিছু দেখে বিয়ে করার পর সেই চাকরিতেই ইস্তফা দেওয়ায়। নারীরা যদি নিজের মর্জিমতো চাকরি করতে ইচ্ছুক হয়, তবে সেখানে চলে সাংসারিক নিপীড়ন৷ এগুলো সবই পারিপার্শ্বিক ঘটনার উদাহরণ। কিন্তু সবচেয়ে যেটা বেশি ভয়াবহ ও অরাজক পরিস্থিতি, সেটা হলো নারীর উপার্জিত অর্থে নারীরই অধিকার থাকে না। কিছু পরিবার আছে, যেখানে মনে করা হয়, ঘরে বউ আসেনি, একজন টাকার মেশিন এসেছে। মাস শেষে যার কাছ থেকে অর্থ পাওয়া যাবে।

এখনকার বেশিরভাগ পরিবার তাই চাকরিজীবী নারীকে প্রাধান্য দিচ্ছেন বটে! সেখানে তাদের সঙ্গে কিছু মনস্তাত্ত্বিক দিকের সংযোগ ঘটে বিশেষভাবে। পরিবারে স্বামী-স্ত্রী উপার্জন করবে। একে-অন্যের অধিকার গ্রহণ করবে। এতে কোনো সমস্যা তৈরি করা কারোই উচিত নয়। তবে অধিকারবোধের মাত্রা থাকা সমীচীন। আবার অধিকার যদি স্বেচ্ছাচারিতায় রূপ নেয়, তবে তা মঙ্গলজনক নয়।

বর্তমানে বেশিরভাগ পুরুষই স্ত্রীর উপার্জিত টাকাকে নিজের বলে দাবি করে স্ত্রীকে ওই টাকা ছুঁতে পর্যন্ত দেয় না। কানো কোনো পরিবারের তো এই ধারণাও দেখা যায়, ছেলের সংসারে যতটুকু সময় দেওয়া উচিত, সেটা না দিয়ে টাকা উপার্জনের জন্য চাকরি করছে, তবে এই টাকা তো স্বামীরই প্রাপ্য! স্বামীর ক্ষেত্রে এই ধারণা আরও ভয়াবহ!

বিয়ে করে পুরুষেরা স্ত্রীর ওপর জুলুম চালায়, তার নীতি-রীতির বাইরে যাওয়া যাবে না। কিন্তু পুরুষটি ঠিকই স্ত্রীর মত-পথ অনুযায়ী চলে না। কারণ একটাই; পুরুষ সবই পারে! এমন ধারণা আবহমানকালের। স্বামী তাই বিয়ের পরেই নিজের রাজত্বে স্ত্রীকে আবদ্ধ করে। সেই আবদ্ধের মধ্যে স্ত্রী চাকরি করবে কী, করবে না; সেটাও তিনিই নির্ধারণ ও নির্বাচন করেন। আর বেশিরভাগ নারীর বাবা-মা-ই জামাতার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। তাদের মতানুসারে চলতে তাই একজন নারী বাধ্য হয়ে পড়ে।

অথচ কে না জানে, দুজনের সম্মতি সর্বদাই ভালো ফল দেয়। কিন্তু জোরজবরদস্তিতে বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কিন্তু নারীরা যখন পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা দিয়ে কাজ করে, সেখানে পুরুষ সঙ্গী, সহকর্মী কেউই তাকে সাপোর্ট করে না। স্ত্রীর উপার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করে স্বামী। নারীদের নিজের মা-বাবা, যারা ২০/২৫ বছর ধরে গড়ে তুলেছে, তাদের দেখভালের দায়িত্বটাও নারীর কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। স্বামীর কর্তৃত্ব যতটা চলে স্ত্রীর ওপর, ততটাই কর্তৃত্ব দেখা যায় শ্বশুর বাড়ির বাকি সদস্যরাও। তারা বউয়ের টাকাকে নিজেদের হক ভেবে বসে। শুধু ভাবনায় সীমাবদ্ধ নয় বরং দাবিও করে! নারী সেখানে অনেকক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। কারণ সাংসারিক অশান্তির ভয়! পরিবার ভেঙে যাওয়ার ভয়।

অথচ পুরুষ সমাজের উচিত ছিল নারীকে সম্মান করা। কোনো মানুষই চায় না, কেউ তার ওপর কর্তৃত্ব করুক। তাহলে নারীর ইচ্ছার ওপর, গতিবিধির ওপর এমনকি তার উপার্জিত অর্থের ওপর পুরুষের কেন হস্তক্ষেপ! নারীর উপার্জিত টাকা তার ইচ্ছে অনুযায়ী কেন সে ব্যবহার করতে পারবে না?

আধুনিক যুগে আমরা বসবাস করছি কিন্তু বোধের শুভোদয় ঘটেনি আমাদের। আশা করি, মানুষ তার মূল্যবোধ ও যুক্তির চর্চা করে সঠিক পথে চলতে শিখবে একদিন। শুভকাজে একে অন্যকে অনুপ্রাণিতও করবে। যেদিন পুরুষেরা ঘরে-বাইরে নারীর যোগ্য মর্যদা-সম্মান দেবে, সেদিন জাতি তার প্রকৃত স্বরূপ খুঁজে পাবে।

এখন প্রশ্ন উঠছে, স্ত্রীর চাকরিতে স্বামী কেন সহযোগিতা না করে বাধা দেন? নারী-পুরুষ উভয়ে মিলেই তো সংসারের ভিত্তি। সেই ভিত্তিতে স্ত্রীর চাকরিতে বাধা দেওয়া কী স্বার্থে, কোনো হীন-উদ্দেশ্যে, সেই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়েও বলা যায়, শ্রদ্ধাবোধ না থেকে শুধু লোভ-লালসা কেন! স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীর কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। পুরুষের পক্ষ থেকে সহোযোগিতার হাতই যেন নারীর শক্তি হয়ে ওঠে। স্বামীরা স্ত্রীদের উপার্জনের প্রতি সম্মান রাখবেন। স্ত্রীর টাকার প্রতি লোভ না করা। বরং সম্মিলিত ও শ্রদ্ধাভারে জীবনযাপন করতে হবে।

অনন্যা/এসটিএম