Skip to content

২০শে আগস্ট, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শনিবার | ৫ই ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মেঘনাদবধকাব্যের নারীগণ: মাইকেলের স্বাতন্ত্র্য

উনিশ শতকে মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)-এর আগমন বাংলা সাহিত্য ধারায় নবজাগরণ সৃষ্টি করেছে। মধ্যযুগীয় চিন্তা-চেতনার নিবৃত্তি ঘটিয়ে মানুষ এ যুগে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের প্রকাশ করতে শুরু করে। তাই উনিশ শতক বাংলা সাহিত্যে মহালগ্ন সৃষ্টিকারী।

মধ্যযুগে বা তৎপূর্বকালে নারী ছিল শুধু ভোগের সামগ্রী কিন্তু আধুনিক যুগের চেতনায় এ ধারণা অনেকটা শিথিল। নারীরা তার নিজ মন-মর্জিকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেছে। ভালো-মন্দের বিভেদ বুঝে জীবন পরিচালনার ভার নিজ হাতে তুলে নিয়েছে। আধুনিক যুগের চেতনাকেই মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার কাব্যে রূপ দিয়েছেন। ‘মেঘনাদবধকাব্য’র নারীরা কেবল ভোগের সামগ্রী নন। সদরে-অন্দরে তাদের সমান বিচরণ। রামায়ণের কাহিনী থেকে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’-এর কাহিনী অত্যল্প গৃহীত হলেও চরিত্র নির্মাণের ক্ষেত্রে লেখকের সৃজনী প্রতিভার সাক্ষাৎ মেলে।

‘মেঘনাদবধকাব্য’র প্রধান নারী চরিত্র সীতা। চরিত্রটি নির্মাণকৌশলে লেখক নিজস্ব রুচিকে প্রাধন্য দিয়েছেন। কবি যেহেতু আধুনিক চেতনাসম্পন্ন মানুষ, তাই কাব্যে সীতাকে প্রাণচঞ্চল করে তুলেছেন। সীতার চরিত্রে কবি ঐশ্বর্য ও রাজকীয়তার ঊর্ধ্বে উঠে প্রকৃতির মতো লালিত্যে গড়ে তুলেছেন। কালিদাসের শকুন্তলার মতো সীতাও হয়ে উঠেছে বনদেবী, চঞ্চলা, প্রকৃতিকন্যা। মধুসূদনের সীতা সহজ-সরল। শত্রু-মিত্রের বিভেদ সে বোঝে না। তাই চারপাশের সমাজ চেতনাও তাকে ভাবায়নি। সরল মনের অধিকারী হলেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার দীপ্ত কণ্ঠ উচ্চকিত।

সীতাকে রাবণ হরণ করে। শত সমস্যাসংকুল হয়েও নিজের সতীত্ব রক্ষা করে সে। তারপরও সমাজ-সংসার এমনকি স্বামী রামও তাকে ত্যাগ করেছেন। সেই বেদনাও সে নীরবে সহ্য করেছে। সীতার নীরবতা কখনো কখনো তেজস্বীও হয়ে উঠেছে। সরমা যখন রাবণের বিরুদ্ধে সীতার অলঙ্কার হরণের অভিযোগ তোলে, তখন সীতা তার প্রতিবাদ করেছে। দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চকিত হয়েছে:

বৃথা গঞ্জ দশাননে তুমি, বিধুমুখি!
আপনি খুলিয়া আমি ফেলাইনু দূরে
আভারণ, যবে পাপী আমারে ধরিল
বনশ্রমে।

সীতা চরিত্রে একটি অতিরিক্ত প্রাণময়তা সৃষ্টি করেছেন মধুসূদন। বাল্মীকিকে সীতার শুদ্ধ স্বভাবের কথা জানালেও লোকাপ্রবাদের কারণে সীতাকে ত্যাগ করেন রাম। সীতা তার নিজের সতীত্ব প্রমাণে বসুমতীকে বিদীর্ণ হয়ে আশ্রয় চায়। শপথকালে ভূতল থেকে নাগবাহিত এক আশ্চর্য রথে বসুমতী উত্থিত হয়ে সীতাকে উভয় বাহুতে ধারণ করে। এরপর রসাতলে প্রবেশ করে। সব অকল্যাণের জন্য সীতা নিজেকে দায়ী করেছে। কবি সীতা চরিত্র নির্মাণে নিজস্ব দর্শনে সজ্জিত করেছেন।

সীতা চরিত্রটি সহজ-সরলরূপে গৃহীত হয়েছ বলে চিত্রাঙ্গদা চরিত্রের মতো হাহাকার সৃষ্টি করেনি। চিত্রাঙ্গদা রাবণ পত্নী। বীরবাহুর মাতা। বীরবাহুর নিহত হওয়ার সংবাদে রাম-লক্ষ্মণের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করেছে। সেইসঙ্গে সীতার হরণে রাবণের প্রতিও ক্ষোভ মিটিয়েছে। রাবণের অনেক পত্নী কিন্তু চিত্রাঙ্গদা স্বামীর ভালোবাসার সর্বোচ্চ পায়নি বিধায় সন্তানকে বুকে ধারণ করে নিজের সর্বস্ব খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু সীতা হরণ ও যুদ্ধে বীরবাহুর নিহত হওয়ার সংবাদ তাকে মায়ের হাহাকারের সঙ্গে পতির না পওয়া সরব আকার নিয়েছে। চিত্রঙ্গদা লঙ্কাপুরীর কল্যাণকামী। সে নিঃসঙ্গ জনারণ্যে থেকেও। সরমাকে সীতা সঙ্গিনী হিসেবে পেয়েছে কিন্তু চিত্রাঙ্গদার লঙ্কাপুরীতে তেমন কেউ নেই। সন্তানের মৃত্যু তাই কষ্টের সঙ্গে ক্ষোভের পরিস্ফূটন:

একটি রতন মোরে দিয়াছিল বিধি
কৃপাময়; দীন আমি থুয়েছিনু তারে
রক্ষাহেতু তব কাছে, রক্ষকূল-মণি
তরুর কোটরে রাখে শাবকে যেমতি পাখী।

বাল্মীকির রামায়ণে চিত্রাঙ্গদা চরিত্রটির উপস্থিতি নেই। কৃত্তিবাসী রামায়ণে তার নামোল্লেখ হয়েছে মাত্র। কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্ত চরিত্রটি সৃষ্টিতে অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। একমাত্র পুত্রকে হারিয়ে মায়ের বেদনা হয়ে উঠেছে চিরন্তন। ‘দীন আমি, হীন আমি’ সন্তানকে হারানোর অন্তর্গত বেদানারই নিঃসরণ। যেখানে দাম্পত্য যতটা আসে, তারও বেশি সন্তানকে হারানো বেদনাই মুখ্য হয়ে ওঠে।

চিত্রাঙ্গদা চরিত্রের সঙ্গে আরও একটি সাদৃশ্যপূর্ণ চরিত্র মন্দোদরী। সেও রাবণ পত্নী। ইন্দ্রজিৎ মেঘনাদের মাতা। তবে চিত্রাঙ্গদা ও মন্দোদরীর শোক বিহ্বল হওয়ার মধ্যে স্পষ্ট কিছু পার্থক্য দেখা যায়। চিত্রাঙ্গদা পুত্র বীরবাহুকে হারিয়ে সরব হয়ে উঠেছে কিন্তু মন্দোদরী সেখনে নীরবে অশ্রুপাত করেছে। মায়ের হাহাকারকে মন্দোদরী সুপ্ত রেখে প্রমীলাকে সান্ত্বনা দিয়েছে। স্বামীর প্রতি তার ক্ষোভ দেখা দেয়নি কারণ রাবণ মন্দোদরীর প্রেমে বিগলিত থেকেছে। মেঘনাদকে হারিয়ে পুত্রশোক তাকে পাগলপ্রায় করে তুলেছে। মন্দোদরী লঙ্কার রাজ্যের প্রধান হয়ে উঠেছিল তাই হয়তো রাবণের প্রতি তার ক্ষোভ দেখা দেয়নি। তার প্রধান পরিচয় ফুটে উঠেছে মাতৃত্বে। মন্দোদরী মাতৃত্বের মহিমায় উজ্জ্বল ও রাজকীয় গাম্ভীর্যে ক্লাসিক মহিমায় ভাস্বর। সূর্পণখার প্রতি তার বিরূপ মনোভাবের মূলেও পুত্রস্নেহ-

মায়াবী মানবী রাম! কেমনে, বাছনি,
বিদাইব তোরে আমি আবার যুঝিতে
তার সঙ্গে? হায় বিধি, কেন না মরিল
কুলক্ষণা সূর্পণখা মায়ের উদরে।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত আধুনিক নারীর জীবনের রূপে মেঘনাদবধ কাব্যেও নারীর মুক্ত স্বরূপ তুলে ধরেছেন। মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলা। কাব্যটির মুখ্য চরিত্র। প্রমীলার মূল পরিচয় ফুটে উঠেছে স্বামীর প্রতি প্রেমে। সেই প্রেম হয়ে উঠেছে ঐশ্বরিক। হৃদয়কে সর্বাপেক্ষা উচ্চ আসনে বসানো আধুনিক মানুষের বৈশিষ্ট্য। সেই বৈশিষ্ট্য প্রমীলাতেও উপস্থিত। প্রেমেই প্রমীলার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে। মেঘনাদ ও প্রমীলার প্রেম সহজ-সরল। দেহ-প্রাণ এক। সরল দাম্পত্য প্রেমের মাঝে কবি মধুসূদন দুবার প্রমীলার মনকে উচটন করেছেন। মেঘনাদের যুদ্ধ যাত্রা এবং সবিশেষ নিহত হওয়ার সংবাদে। প্রমীলার বীরত্বগাথা বর্ণনায় ফুটে ওঠে তার চারিত্রিক দৃঢ়তা, সৌন্দর্য ও বুদ্ধিদীপ্ত স্বীকারোক্তি। প্রমীলা বলে,

দানবনন্দিনী আমি, রক্ষঃ-কুল-বধূ
রাবণ শ্বশুর মম, মেঘনাদ স্বামী,
আমি কি ডরাই, সখি, ভিখারী রাঘবে ?

প্রমীলা হৃদয়গত ভালোবাসার কারণে স্বামীর জন্য বিরহ- বিচ্ছেদে তার প্রাণ কেঁদে উঠেছে। কবি প্রমীলার হৃদয়ের বেদনাকে তুলে ধরে নারীর চিরন্তন প্রেমময়ী রূপকে দেখিয়েছেন। যে প্রেম নারীর মূল শক্তি। তাইতো প্রমীলাও স্বামীর বিচ্ছেদে সহমরণ- যাত্রী হতে চেয়েছে। কিন্তু মন্দোদরীর প্রীতির বন্ধনকে অস্বীকার করতে পারেনি বিধায় শ্বাশুড়ির কাছেই অবস্থান করেছে। প্রমীলার হৃদয়গত চিরন্তন বিচ্ছেদ তাকে যতটা হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছে ঠিক ততটাই মধুসূদনের কবিত্ব সত্ত্বাকে জাগরিত করেছে।

মেঘনাদবধকাব্যের আরও একটি বিশেষ চরিত্র রাক্ষস রাজ রাবণের ভগিনি সূর্পনখা। এই চরিত্রবলেই রামায়ণের কাহিনি গতি পেয়েছে। কিন্তু কাহিনীর গতি বৃদ্ধি হলেও রাম- লক্ষ্মণের প্রতি প্রণায়াবেগ এবং প্রত্যাখানে সীতাহরণে উদ্বুদ্ধকরণ চরিত্রটি কুলসিত করেছে। সূর্পনখার প্রতি তাই পাঠক হৃদয়ে কিছুটা করুণা জন্ম নিলেও সীতা বিসর্জন এবং লঙ্কাপুরী ধংস্বে তাকে দোষী না করে পারা যায় না। রাবণের পুত্রবিরহে হাহাকার সূর্পনখাকে তুলে ধরেছে এভাবে-

…হায়, সূর্পণখা
কি কুক্ষণে দেখেছিলি, তুই অভাগী
কাল পঞ্চবটীবনে কালকূটে ভরা
এ ভূজগে ? কি কুক্ষণে ( তোর দুঃখে দুঃখী)
পাবক- শিখা -রূপিণী জানকীরে আমি
আনিনু এ হৈম গেহে ?

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্যে নারীর হৃদয়কে তিনি বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। তাইতো সীতা, চিত্রাঙ্গদা, মন্দোদরী, প্রমীলা, সূর্পনখা, সরমার চরিত্র ভিন্ন আঙ্গিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। প্রত্যেকেই বিভিন্নভাবে বঞ্চিত। কেউ ভাগ্য দ্বারা, কেউবা কর্ম দ্বারা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মাইকেল মধুসূদনের কবিত্ব শক্তির প্রতি শুধু শ্রদ্ধা জ্ঞাপনই একমাত্র নয় বরং মাইকেল মধুসূদন দত্তকে সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করায় শোভা পায়। যে আসন তিনি বহুদিন আগেই অলঙ্কৃত করেছেন। আজও চির উজ্জ্বল তারাকার মতো প্রোজ্জ্বলিত করে তুলছেন পাঠক মননকে।