Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

মহাকাব্যের নারীগণ: সুভদ্রা, নীরবতাই যার ব্রত

শ্রীকৃষ্ণের পিতা বাসুদেবের ঔরসে ও তার স্ত্রী রোহিণীর গর্ভে সুভদ্রার জন্ম। সুতরাং সুভদ্রা বলরামের সহোদরা ও শ্রীকৃষ্ণের বৈমাত্রেয় ভগিনী। সুভদ্রার আরও একটি বিশেষ পরিচয়, তিনি মহাভারতের অন্যতম ধনুর্বিদ অর্জুনের দ্বিতীয় স্ত্রী। অর্জুন ব্রহ্মচর্য অবলম্বন করে বার বছর বনবাসে ছিল, ওই সময় শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে সুভদ্রা বৈরুত পর্বতে যাত্রা করে। সেখানে অর্জুনের সংবর্ধনার জন্য এক মহোৎসবের আয়োজন করা হয়, আর সেখানেই সুভদ্রার রূপে মুগ্ধ হয় অর্জুন।

এরপর সুভদ্রার উপস্থিতি মহাভারতে অনেকটা শিথিল হয়ে যায়। পঞ্চপাণ্ডবের জতুগৃহে দগ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার সংবাদ যখন হস্তিনাপুরসহ পুরো রাজ্যে রাষ্ট্র হয়ে যায়, তখন আবারও ছদ্মবেশ গ্রহণ করে কুন্তীসহ পঞ্চপাণ্ডব। কাকতালীয়ভাবে দ্রুপদ রাজার রাজ্যে তাদের আগমন ঘটে এবং স্ত্রী রূপে দ্রৌপদীকে স্বয়ংবরে জিতে ফেরে অর্জুন। ফলে স্বাভাবিকভাবেই অর্জুনের বাগদত্তাকে তারই গ্রহণ করার কথা থাকলেও মা কুন্তীর ভুলে পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদীকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

মহাভারতের কাহিনী কোথাও থেমে যায়নি। তবু সুদীর্ঘ যাত্রাপথে একটিবারও সুভদ্রার সাক্ষাৎ মেলে না৷ ইন্দ্রপ্রস্থে পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে দ্রৌপদীর যাত্রা ছিল চোখে পড়ার মতো কিন্তু সেখানেও অর্জুনের কল্পলোকে সুভদ্রার প্রতি নিবিষ্ট ভালোলাগা পাঠকের চোখে পড়ে না। ইন্দ্রপ্রস্থ পঞ্চপাণ্ডবের দ্রৌপদীর সঙ্গে কাল যাপনের নির্দিষ্ট বিধান ছিল। শকুনি ও তক্ষক নাগের কুটচালে অর্জুনকে বাধ্য হতে হয় বিধান ভাঙার। এই বিধানভঙ্গের কারণে অর্জুনকে বারো বছর ছদ্মবেশ গ্রহণ করতে হয়। ছদ্মবেশ শেষে কৃষ্ণের পরামর্শ মতে দ্বারকা মন্দির যাত্রা শেষে ছদ্মবেশ পরিপূর্ণ হয়। দুর্যোধন ও শকুনির কূটনৈতিক স্বার্থসিদ্ধর জন্য বলরামের কাছে সুভদ্রার পাণিপ্রার্থী হয় দুর্যোধন। কাহিনীর দীর্ঘ বিরতির পর এখানে প্রথম সুভদ্রার উপস্থিতি পাঠকের সামনে আবারও উঠে আসে। অর্জুনের মনোভাব জানতে পেরে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে এই বিষয়ে সাহায্য করতে সম্মত হয়। শ্রীকৃষ্ণ বলেন, ক্ষত্রিয়দের স্বয়ংবর বিবাহই শ্রেষ্ঠ কিন্তু সুভদ্রা কার গলায় বরমাল্য দেবে তার কোনো স্থিরতা নেই। এজন্য ক্ষত্রিয়রা বলপূর্বক নারীদের হরণ করে বিবাহ করতো। আর শ্রীকৃষ্ণও সুভদ্রাকে হরণ করার পক্ষে যুক্তি দেন। ফলে সুভদ্রাকে অর্জুন হরণ করে। এতে কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম।

শ্রীকৃষ্ণের কথা মতো রৈবতকে পূজার পর সুভদ্রা যখন দ্বারকায় ফিরছিল, তখন অর্জুন তাকে হরণ করলে যাদবরা অপমানবোধ করে। দুর্যোধনের উপস্থিতি আরও পরিবেশ জটিল করে তোলে। বলরাম ক্রুদ্ধ হয়ে অর্জুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করা স্থির করলে কৃষ্ণ এই হরণকে ক্ষত্রিয় ধর্মোচিত বলে উল্লেখ করেন। কাহিনীর এ পর্যায়ে সত্যভামার উদ্যোগে মহাসমারোহে দ্বারকায় সুভদ্রার সঙ্গে অর্জুনের বিয়ে হয়। পঞ্চপাণ্ডব দ্রৌপদীকে প্রতিজ্ঞা করে ইন্দ্রপস্থের একক রাণী সে। ফলে সুভদ্রাকে ইন্দপ্রস্থে আনা সম্ভব না হলেও বলরামের জোরাজুরিতে তাকে ইন্দ্রপ্রস্থে নিয়ে আসতে বাধ্য হয় অর্জুন। এর মধ্যে দিয়ে সুভদ্রার কিছুটা উপস্থিতি পাঠক লক্ষ করে। কৃষ্ণের নানারকম লীলার ফলে পঞ্চপাণ্ডব বারবার সংঘর্ষ এড়াতে সক্ষম হয়। কিন্তু সুভদ্রার উপস্থিতি যতটা গ্রহণযোগ্য ছিল, ততটা সুভদ্রাকে আলোকিত করা হয়নি।

একদিকে সুভদ্রা কৃষ্ণের ভগিনী অন্যদিকে সে অর্জুনের স্ত্রী। মহাভারতের শক্তিশালী চরিত্র এবং সর্বত্র বিচরণ তার থাকার কথা হলেও প্রথম থেকে শেষাবধি চরিত্রটি বারবার হারিয়ে গেছে। ইন্দ্রপ্রস্থের শোভা ও অপমানের বদলা নিতে দুর্যোধনের ক্রোধ বেড়ে যায়। ফলে চাতুরি দিয়ে পাশা খেলায় হারায় পঞ্চপাণ্ডবকে। এবং আবারও ছদ্মবেশ গ্রহণ করে পঞ্চপাণ্ডব, দ্রৌপদী। এসময় সুভদ্রা থেকে যায় দ্বারকা! দ্রৌপদী ও পঞ্চপাণ্ডবের পাঁচ ছেলে এবং অর্জুন ও সুভদ্রার ছেলে অভিমন্যুকে মাতৃস্নেহে গড়ে তোলে। কিন্তু এখানে সুভদ্রা থেকে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে। সুভদ্রার গতিকে বারবার পাঠক থেকে আড়ালে রাখা হয়েছে। যেই সুভদ্রা পঞ্চপাণ্ডকে নেপথ্যে সাহায্য করেছে সেই সুভদ্রাকে তার যোগ্যতা অনুযায়ী মহাকাব্যে উপস্থাপন করা হয়নি। সুভদ্রার জেরে যদুবংশ কখনোই পঞ্চপাণ্ডবদের বিরুদ্ধপক্ষে যায়নি বরং কৃষ্ণ অবতাররূপে, সারথীরূপে অর্জুন তথা পঞ্চপাণ্ডবকে পথ দেখিয়েছে। কিন্তু সেই সুভদ্রাকে পাঠক মহল আজ স্মরণই করে না! দ্রৌপদীর তেজস্বীতায়, বিচরণে সুভদ্রা থেকে গেছে অন্তরালে। লুকিয়ে বা নেপথ্যে থাকায় যেন তার অপরিসীম ক্ষমতায় পরিণত হয়েছে। চরিত্রটির বিস্তৃতি থাক বা না থাক, এই অন্তরাল একসময় তাকেই সর্বময় ক্ষমতায় অভিষিক্ত করেছে। মহাপ্রস্থানের সময় যুধিষ্ঠির সুভদ্রার পৌত্র পরীক্ষিৎকে রাজ্যাভিষিক্ত করে সুভদ্রাকে ধর্মরক্ষা ও সব পালনের দায়িত্ব দিয়ে যায়। এত অবদান অস্বীকার করার মতো নাহলেও সুভদ্রা থেকে গেছে মহাকাব্য তথা মানব মনের অন্তরালে।

এতসব বিশ্লেষণ করলে এটাই দাঁড়ায় যে সুভদ্রা কেবলই অর্জুনের স্ত্রী, নিছক গৃহিণী। সন্তান লালন পালন ছাড়া রাজকার্যেও তার ভূমিকা নেই বললেই চলে। দ্রৌপদী এবং পঞ্চ পাণ্ডব যখন বনবাস থেকে ফিরে আসে তখন ছয় পুত্রের সঙ্গে সাক্ষাৎকালেও সুভদ্রার মমতা, মাতৃময়তা, প্রেমময়তা, ধৈর্য সম্পর্কে কোথাও কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন মহিমান্বিত করে তোলেনি চরিত্রটিকে। বনবাসের এত বৎসর যাবৎ স্বামীর মঙ্গলকামনায় যে নারী নিজের সর্বস্ব দিয়ে গেছে তাকে কতটুকু আলোর মুখ দেখিয়েছেন লেখক! বরং রাজকন্যা হয়েও যেন গৃহপরিচালনার সব দায় তার ওপর রেখেছেন দ্বৈপায়ন। সন্তান লালন-পালন এবং স্বামীর পথ চেয়ে সব দায় একা কাঁধে যে নারী সেকি দ্রৌপদীর চেয়ে কম আলোকিত হওয়ার কথা! বরং রুপদ কন্যা পঞ্চপাণ্ডবের প্রীতিভাজন সবসময়। তাকে রক্ষার সব দায় এবং তাকে উচ্চাসনে বসিয়ে পূজা করার মতো সবই চলেছে মহাভারতে।

এক্ষেত্রে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন তার সৃষ্ট চরিত্র সুভদ্রার প্রতি সুবিচার করেননি। এছাড়া, চরিত্রটি যতটা গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল, ততটা পায়নি। সুভদ্রা চরিত্রকে ফিকে করে কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন সব ঔজ্জ্বল্য ঢেলে দিয়েছেন দ্রৌপদী সৃষ্টিতে। পঞ্চপাণ্ডবের ওপর আধিপত্য থেকে শুরু করে রূপ-লাবণ্যে দ্রৌপদীকে এতটাই মহিমান্বিত করেছেন যে, সুভদ্রা চরিত্রটিতে মনোযোগ দেওয়ার সময়ই যেন লেখকের হয়নি। তিনি দ্রৌপদী চরিত্রটিকে এতটাই মহিমান্বিত করার পক্ষে নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন, যে তাতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র সুভদ্রার প্রতি অবিচার হচ্ছে, সেই চেতনাটুকুও লোপ পেয়েছিল তার। ফলে সুভদ্রার আধিপত্য থাকা আবশ্যক হলেও সবার অন্তরালেই প্রদীপের সলতে হয়ে জ্বলেছে!

এভাবেই স্রষ্টার নিছক খেয়ালের বশে সৃষ্টিও তার গুরুত্ব হারিয়েছে। দুই সৃষ্টি মাঝখানে স্রষ্টার যখন বিশেষ কোনো চরিত্রের দিকে পক্ষপাত থাক, তখন অবহেলিত চরিত্রটির জন্য কেবল পাঠকের করুণই বরাদ্দ থাকে। স্রষ্ট যে চরিত্রটিকে গৌণ করে তুলতে চান, পাঠক সেই চরিত্রটির প্রেমে পড়ে হয়তো বারবার। এভাবে কৃষ্ণদ্বৈপায়নের অবহেলার শিকার সুভদ্রা আধুনিককালের পাঠকের হৃদয়ে মহাভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে উঠেছে। বিশেষত অভিমন্যুর বীরত্বগাথা যতবার উচ্চারিত হবে, ততবার সুভদ্রার নাম আসবে। এখানেই তার বিশেষত্ব।