Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীর সঙ্গে কথোপকথনের শিষ্টাচার

আচরণে যে জাতি যত বেশি সভ্য সে জাতি তত বেশি উন্নত। মানুষ ও পশুর মধ্যে তফাত মূলত আচরণে। অর্থাৎ মানুষ সভ্য, আর কথা বলে সব কিছু ব্যক্ত করতে পারে। পশু পারে না। মানুষ ভালো-মন্দের বিভেদ বুঝতে পারে। কিন্তু মানুষের বলার ক্ষমতা আছে বলেই সে যা খুশি বলতে পারে না। বরং কোথায় কী বলতে হবে, সেটুকু বোধ থাকাও জরুরি। সেই হেতু শিষ্টাচার যে মানবজাতির সর্বশ্রেষ্ঠ গুণ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শিষ্টাচার হলো মনের সৌন্দর্যের উপস্থাপন। মার্জিত প্রকাশ।

ভদ্র-নম্র-শালীন-পরিশীলিত প্রকাশের মাধ্যমে অসাধ্যকেও সাধন করা সম্ভব। তাই প্রত্যেক ব্যক্তিকে শিষ্টাচার সম্পর্কে জ্ঞান রাখা আবশ্যক। আর নারীর সঙ্গে কথা বলার সময় শিষ্টাচার কেমন হবে অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত। তবে নারী পরিচিতি, অপরিচিত বা সহকর্মী যা-ই হোক, তার সঙ্গে কথা বলার সময় অবশ্যই সময় ভেবে বলা উচিত। যেই ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছেন, তার সঙ্গে সম্পর্ক অনুযায়ী ঠিক ততটুকুই বলতে পারেন। তার বেশি একবিন্দুও নয়। যদি তাও বলেন তবে, তাতে বক্তার শিষ্টাচার লঙ্ঘিত হবে। তাই নারীকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে।

নারীদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যা থাকতে পারে। মানসিক বা শারীরিক। কিন্তু যদি বোকার মতো না বুঝে কেউ শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে, তবে তার শিক্ষা ও রুচিই প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই নারী তিনি যেই হোন না কেন, তাকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন করা থেকে এড়িয়ে চলা প্রত্যেকটি শিষ্টাচার ও বোধসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য। নারীদের জীবনযাপন যে সহজ নয়, সেটি বাংলাদেশর নানা প্রেক্ষাপট দেখলে বোঝা যায়।

একজন নারী বিভিন্ন কারণে বিষণ্ণ থাকতে পারেন, কেউ অসুস্থ হতে পারেন, সে বিষয়েও কথা বলার সময় ভেবেচিন্তে ভাব বিনিময় করা উচিত। তা যেন অন্যপক্ষের বিব্রত হওয়ার পরিবেশ তৈরি না করে।

নারীরা এখন ঘর-বাইরে সমান তালে সামলে চলেন। তাই নারীর ব্যস্ততার শেষ নেই। নারীদের এই কর্মময় জীবনকে সহযোগিতা দিয়ে সবাই সুন্দর করে তুলতে পারি। কিন্তু নারীর এই ব্যস্ততার কারণ ও ধরন যদি পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করে পরিচিত-অপরিচিত প্রত্যেকের কাছে ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে একজন নারীর জন্য সেটি নির্যাতনের সামিল হয়ে যায়।

নারীর জীবনকে আরও পরিমার্জিত করে তুলতে তার ব্যস্ততম জীবনের সবটা নিজের একান্ত আপনজন বাদে সবার সঙ্গে শেয়ার করা বা বলার কোনোই অর্থ বহন করে না। কেউ বলতেও চায় না। কিন্তু একশ্রেণীর মানুষ আছে, যারা অবিবেচকের মতো নারীর অসুস্থতা বা নারীর ব্যস্ততম জীবন নিয়ে নানা রকম জটিল ইঙ্গিত বা প্রশ্ন করতে দ্বিধা করে না। ফলে নারীরা বিব্রত হন এবং অস্বস্তিতে পড়েন। তাই নারী সহকর্মী, অফিসের নারী স্টাফ সবার সঙ্গে কথা বলার সময় পুরুষদের নিজের বিবেক ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করা জরুরি।

নারীদের অবস্থান জায়গা বিশেষে ভিন্ন। নারী এককভাবে একটি পরিবারের অধীন নয়, বরং তাকে কয়েকটি পরিবারের দেখভাল করার বিষয় মাথায় রেখে দিনাতিপাত করতে হয়। একজন নারীকে নিজের সংসার সামলানোর পাশাপাশি, বাবার বাড়ি, শ্বশুরবাড়ির উভয়দিকের খোঁজ রাখতে হয়। এছাড়া বর্তমান বেশিরভাগ নারী কর্মজীবী৷ সেইসঙ্গে নারীদের রয়েছে ব্যক্তিগত জীবনও। ফলে একজন নারীর সঙ্গে কথা বলতে বা যেকোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করার সময় স্পর্শকাতর কিছু বিষয় মাথায় রাখা উচিত। নারীদের সঙ্গে শিষ্টাচার মেনে কথা বলার শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে।

পূর্বেই বলেছি কর্মময় নারী বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারণে ব্যস্ত থাকতে পারে। তাই সহকর্মী যদি নারী হন, তবে তার সঙ্গে শিষ্টাচার মেনে তাকে প্রশ্ন করা উচিত। একজন পুরুষ সহকর্মী একজন নারী সহকর্মীকে ফোন করার ক্ষেত্রে অবশ্যই সময়টাকে গুরুত্ব দেবেন। এই শিষ্টার যে শুধু পুরুষ সহকর্মীর জন্য, তা নয়; বরং প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই প্রযোজ্য। তিনি কাকে কী বলছেন, কেন বলছেন, কখন বলছেন, এসব বিষয়ে নারীকে প্রশ্ন করে বিব্রত করা অনুচিত!

কোথায় বেড়াতে গেলো কোথায় যাবে, এ বিষয়ে নারীকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে বিপরীত পক্ষের সম্পর্ককে অবশ্যই গুরুত্ব দিতে হবে। যদি নারী ও পুরুষের মধ্যে কথোপকথন হয়, তবে সেখানে নারীকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে পুরুষদের সববিষয়ে উৎসুক না থাকাই শ্রেয়। কারণ নারীর জীবন ও পুরুষের জীবনের মধ্যে অনেক প্রভেদ। যুগের পরিবর্তন হলেও কিছু সংস্কার কিছু প্রশ্নের সম্মুখীন নারীরা কখনোই হতে চান না।

দাম্পত্য সম্পর্ক কেমন? এই প্রশ্নটি প্রায় ক্ষেত্রে একজন নারীকে শুনতে হয়। এক্ষেত্রে অবশ্যই শিষ্টাচারসম্পন্ন ব্যক্তি তা কখনোই এই বিষয়ে প্রশ্ন করবেন না। মানুষ প্রত্যেকেই আলাদা। তার জীবনযাপন ভিন্ন। পরিস্থিতিও ভিন্ন। তাই অযথা নারীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করে তাকে বিব্রত করা থেকে বিরত থাকা পুরুষ-নারী উভয়েরই উচিত। নারীরা যেহেতু কোমল মনের অধিকারী, সেহেতু তারা অনেকক্ষেত্রে সবকিছু স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারে না। তাই নারীর জন্য একটু সহনশীলতা, সম্প্রীতি বাড়ানো উচিত। তাকে নিজের মতো থাকতে দেওয়া উচিত। অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন করে জীবনকে অতিষ্ঠ না করে তোলার ক্ষেত্রে সুদৃষ্টি দেওয়া উচিত।

নারী-পুরুষ বিভিন্ন সম্পর্কে থাকতে পারে। দাম্পত্য, প্রেম যেকোনো সম্পর্কে যাপন করতে পারে। তবে নারীকে এ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্ন করে তাকে বিব্রত না করে বরং নারীদের জন্য সুন্দর পরিবেশ সৃষ্টি করা উচিত। তাই নারীর সঙ্গে চলতে, কথা বলতে নিজের শিষ্টাচারের লঙ্ঘন না করাই শ্রেয়।

পারিবারিক অবস্থা, বৈবাহিক অবস্থা সম্পর্কে নারীকে প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকা প্রত্যেক বিবেক, মনুষ্যত্বসম্পন্ন ব্যক্তির গুরু দায়িত্ব। এগুলোই উত্তম শিক্ষা। নারীর সম্পর্কে জানার আগ্রহ থাকলেও সব আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে কথোপকথনকালে তাকে অযথা প্রশ্ন না করা উচিত। আরও একটি বিষয় প্রত্যেকের বোঝা উচিত, কেউ যদি তার ব্যক্তিক সম্পর্ককে অন্যের কাছে প্রকাশ না করে, তবে তার সেই বিষয়কে সেভাবেই রাখা উচিত। তাহলে নারী বা পুরুষ উভয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারবে।

নারীর পেশাগত অবস্থান ও বেতন কত, এ বিষয়েও প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকা উচিত। এটি যে শুধু নারীর ক্ষেত্রে তা নয়, বরং শিষ্টাচারের শিক্ষা থাকলে কোনো ব্যক্তিই অন্যের বেতন, চাকরির অবস্থা বা কোনো কিছুর ফল সম্পর্কে জানতে চাইতে পারে না। অন্যপক্ষ কোন বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং কোনটাকে এড়িয়ে যেতে চায় বা তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না, এটা সবার বোঝা উচিত। তবেই একজন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়া সম্ভব।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। কিন্তু বর্তমান মানুষের দিকে লক্ষ করলে আসলে এই বিষয়টা অনেকটা হাস্যকরই মনে হয়। কারণ মানুষের মধ্যে বিবেকবোধ, নীতি-নৈতিকতা, মনুষ্যত্ব, রুচি, জ্ঞান, প্রজ্ঞার এত অভাব যে, কিভাবে কোথায় কী আচরণ করতে হবে, সেটাও অনেকের মাথায় থাকে না। ফলে শিষ্টাচারের স্খলন জীবনযাত্রাকে অনেকটা প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে। এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি এড়াতে চাইলে নারীকে প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে কী করা উচিত, কতটা করা উচিত, সে সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। তবেই জাতিও উন্নত, সভ্যরূপে বিশ্বে স্থান করে নিতে পারবে।

অনন্যা/এসএএস