Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শুভদ্রা: আড়ালে থেকে যাওয়া পৌরাণিক নারী

মহাভারতের দ্রৌপদী কিংবা রামায়ণের সীতার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। রামায়ণ কিংবা মহাভারতের মূল আবেদন মহাকাব্যগুলোর মানবিক নায়ক ও চরিত্রগুলো। এই দুই মহাকাব্যের কোনো চরিত্রই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়।

বলা চলে, আমাদের পূর্বপুরুষেরা তা এড়িয়ে গেছেন। করোনার সময়ে মহাভারত, রামায়ণ বা অন্যান্য লোকসংস্কৃতির প্রতি আমাদের আগ্রহ আস্তে আস্তে বাড়তে শুরু করায় আমরা বুঝতে পারছি মহাভারতে নারীর প্রতি অবহেলা যেন ভয়ঙ্করভাবে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে।

সেই চরিত্রের তালিকায় সুভদ্রা একজন। যদিও খুব সাদাচোখে তা বোঝা সম্ভব না। সুভদ্রার গল্পটুকু অবশ্য খুবই ছোট। তবে তার গুরুত্বটুকুকে কোনোমতেই উপেক্ষা করার মতো নয়। মূলত দেবী দুর্গার অবতার হিসেবেই তার জন্ম। রাজা কংসকে বধ করার জন্যেই তিনি জন্ম নিয়েছিলেন।

তবে সুভদ্রার জন্ম আরও অনেক পরে হওয়ায় তার বয়স বেশ কম ছিল। কংসকে হত্যার পর সুভদ্রা রাজকীয় পরিবেশেই বড় হচ্ছিলেন। অর্জুনকে একবার এক বছরের জন্যে দ্বারকায় বনবাসে থাকতে হয়। সেখানে কৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রাদের সঙ্গে তার থাকা হয়।

বাসুদেব ছিলেন অর্জুনের মা কুন্তীর ভাই সম্পর্কীয়। সে হিসেবে তারা মামাতো ভাই-বোন। দ্বারকায় থাকার সময়েই অর্জুন আর সুভদ্রার মধ্যে প্রেম গড়ে ওঠে। অর্জুন বিয়ের প্রস্তাব দিলে সুভদ্রা তা গ্রহণ করেন। কিন্তু এই বিয়ে পরিবারের অনেকেই মেনে নেবে না।

অর্জুনের চতুর্থ স্ত্রী হিসেবে সুভদ্রাকে কোনোভাবেই মানায় না। এখানে অনেক সমস্যা আছে। দ্রৌপদী নিজে পাণ্ডবদের ওপর কিছুটা হলেও কর্তৃত্ব ধরে রাখতেন। এতে অর্জুনের এই বিয়ে দ্রৌপদীকে রুষ্ট করতে পারে।

কদিন পর সুভদ্রার স্বয়ম্বর। সেখানে দুর্যোধনের সঙ্গে সুভদ্রার বিয়ে হয়ে যাওয়ার একটা শঙ্কা কৃষ্ণের ছিল। এসব কিছু বিবেচনায় কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন, সুভদ্রাকে অপহরণ করতে। কোনো ক্ষত্রিয়ের জন্যে এমন কাজ নীতিশাস্ত্রবিরুদ্ধ। কিন্তু ভগবানের অবতার যেহেতু বলেছেন, সেহেতু সমস্যা দেখা যাচ্ছে না কোনো।

অর্জুন ও সুভদ্রার বিয়ের ঘটনাটুকু যতটা রোমাঞ্চকর তার পরবর্তী ইতিহাসটা অতটাও রোমাঞ্চকর নয়। সুভদ্রাকে দ্রৌপদী মেনে নিয়েছিলেন। সেটা সম্ভবত বাসুদেবের বোন হওয়ার জন্যেই।

অর্জুন আর সুভদ্রার অভিমন্যু নামে এক সন্তান হয়। এর বেশ কয়েকদিন পরই পাণ্ডব আর কুরুদের পাশা খেলা। সেখান থেকেই তারা ১৩ বছরের নির্বাসনে যায়। সুভদ্রা আর অভিমন্যুকে এই নির্বাসনযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। যে সুভদ্রাকে হরণের জন্যে এত আয়োজন, সেই সুভদ্রাকেই এখন নিয়ে যাওয়া হবে না। সুভদ্রাকেও নির্বাসনে যেতে হবে, তবে সেটা দ্বারকায়।

সুভদ্রার সারাজীবনেই তাকে যেন অবহেলা করা হয়েছে। তার কাজ ছিল সন্তানের দেখভাল করা। যে কাজটি দ্রৌপদীর করার কথা ছিল। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সুভদ্রা ছেলে অভিমন্যুকে হারান। দ্রৌপদীও তার সব সন্তানকে হারান। তবে অভিমন্যুর বিরাট প্রদেশের রাজা উত্তরার সঙ্গে বিয়ে হয়। সেই অভিমন্যুর সন্তান পরীক্ষিৎ ছিল পাণ্ডবদের একমাত্র উত্তরসূরি।

যাহোক, পাণ্ডবরা দ্রৌপদীকে সঙ্গে করে হিমালয়ে চলে যান। রেখে যান সুভদ্রাও। যার কাজ তখন নিজ নাতিকে শিক্ষাদান। অথচ সুভদ্রা আর অর্জুনের পরিণয়টুকু নতুন কিছুর খোঁজ দিচ্ছিল। সেখানে সুভদ্রার এমন পরিণতি যেন একটি চরিত্রকে অবহেলারই নামান্তর। শুধু অর্জুনের সাময়িক কামনা মেটানোর জন্যেই কি তবে এত কিছু? না কি পাণ্ডবদের বংশরক্ষার একটা উপায় হিসেবেই ছিলেন সুভদ্রা?

অনন্যা/এআই