Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

পরিচয়-সংকট বনাম আত্মবিশ্বাস

‘ভদ্র ঘরের মেয়েরা এটা করে না, সেটা করে না। ভালো মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে মেশে না। মেয়ে মানুষের কী দরকার বাইরের কাজ করার? বিয়ে করে তারপর ঘুরতে যেও।’ এ ধরনের কথা শুনতে শুনতে কানের পোকাও মরে গেছে মেয়েদের। কিন্তু এই সব বাণী কি মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে? মেয়েদের আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াতে পারে? না কি এই সব বাণী নারী-স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বা নতুন কোনো বিষয়ে ফলপ্রসূ কোনো ভূমিকা রাখতে পেরেছে?

ছোটোবেলায় কন্যা সন্তানকে শিক্ষা দেখা হয় কিভাবে ঘর গুছিয়ে রাখতে হয়, কিভাবে রান্না করতে হয়, সংসারের প্রতি দায়িত্বশীল কিভাবে হতে হয়। কিন্তু একই পরিবারে একটা পুত্র সন্তানকে তার খাওয়ার পরের এঁটো বাসনটাও কিভাবে ধুতে হয়, তাও শেখানো হয় না।

কিন্তু পুত্র সন্তানের রয়েছে বাইরে ঘুরাঘুরি করার স্বাধীনতা, বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার মতো সুযোগ এবং সমাজের নানা রকমের সুবিধা নিয়ে জীবন যাপন করার সুযোগ।

তাই পুরুষদের কমিউনিকেশন স্কিল হয় নারীদের তুলনায় জোরালো। আত্মবিশ্বাসও থাকে ভালো। কারণ, একজন পুরুষ বিভিন্ন খাতে কাজ করে নিজেকে দক্ষ করে নেয়। সঙ্গে আছে কাজ করার অভিজ্ঞতাও। কিন্তু নারীদের কাজের ক্ষেত্রগুলোয় অনেক ধরাবাঁধা নিয়ম।

তাই নারীদের সুযোগটা থাকে কম। তাদের পরিচয় নিয়ে সংকটে পড়তে হয় বারবারই। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও অনেক নারী অপটু। এর অন্যতম কারণ, নারীদের পর্যাপ্ত পরিমাণ আউটগোয়িং না হওয়া। মানুষের সঙ্গে স্বাধীনভাবে না মেশা। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কোনো কাজ করতে গেলেও সেটা নিয়ে পরিবার ও সমাজের বাধা তার উদ্যম নষ্ট হয়।

এছাড়া, নারী পুরুষের পেশা তো নির্ধারণ করেই দেওয়া আছে সমাজে। টেকনিক্যাল কাজের সেক্টর হচ্ছে পুরুষের । আর নারীদের কাজ হচ্ছে হিসাব রাখা, ডেস্ক জব আর ডাক্তারি। আর ছেলেদের সব সময় চ্যালেঞ্জিং সব কাজ করার দায়িত্ব।

এই কারণে যা হয়, প্রতিটি মানুষের আলাদা সত্তা নষ্ট হয়ে যায়। নিজের সত্তা , নিজের প্যাশনের জায়গা যদি কেউ প্র্যাক্টিস করার সময় না থাকে, তাহলে সে মানুষকে মুমূর্ষই বলা যায়।

আমরা এই যাপিত জীবনের চাপে একটা মুমূর্ষ রোগিতেই পরিণত হচ্ছি। সমাজ ও পরিবারের নিষেধাজ্ঞা, পরিবারের মান সম্মানকে বহাল রাখার দায়িত্ব তো নারীরাই নিয়ে রেখেছে বলে মনে হয়। মেয়ে ডাক্তার না হলে লোকে কী বলবে, মেয়ের যদি অনেক ছেলেবন্ধু হয় লোকে কী বলবে? মেয়ে যদি মেয়েদের মতো মূর্ত-প্রতীক না হয় লোকে কী বলবে ইত্যাদি।

এইসব দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের ভালো লাগা মন্দ লাগাকে কূয়ার জলে ফেলে দিতে বাধ্য হয় নারীরা। একটা সময় অচলায়তন হয়ে নিজেকে আর খুঁজে পায় না। আর মস্তিস্কের অচলায়তন হলে প্রথমে আসে পরিচয় সংকট। সেই ভারে সিদ্ধাহীনতাও।

নারীরা নিজেকে আত্মবিশ্বাসী হিসেবে গড়ে না তুললে অন্যরা তো সুযোগ নেবেই। তখন নারী আর সামনে এগিয়ে যেতে পারবে না । নারীকে শিক্ষা-দীক্ষায় শিক্ষিত-দীক্ষিত হতে হবে। নিজের কণ্ঠ আরও জোরালো করতে হবে, নিজের অধিকারের জন্য। নাহলে আত্মবিশ্বাসহীন জীবন যাপন আস্তে আস্তে তাকে গ্রাস করে ফেলবে।