Skip to content

২৮শে জুন, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৪ই আষাঢ়, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীর জন্য কর্মক্ষেত্রও এক যুদ্ধক্ষেত্র!

নারীর প্রতি বৈষম্য সমাজের সর্বত্রই দেখা যায়। মূলত জন্ম থেকেই নারী বৈষম্যের শিকার। ধীরে ধীরে তা যেন আরও প্রকট আকার ধারণ করে। এইযে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে, সেই অনুযায়ী তার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। নারীর প্রতি বৈষম্য কমেনি। কর্মক্ষেত্রে বেশিরভাগ নারীদের টিকে থাকতে হচ্ছে যুদ্ধ করে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সমান মেধা, ডিগ্রি ও কর্মক্ষেত্রে সমান অবদান রাখার পরও নারীরা কেন পিছিয়ে। এর প্রধান কারণ, আনুষ্ঠানিক খাত কিংবা অনানুষ্ঠানিক খাত সবক্ষেত্রেই নারীকে হয়রানির ও বৈষম্যের শিকার হতে হয়। প্রথমেই চোখ দেওয়া যাক আয়ের বৈষম্যের দিকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আয়বৈষম্য হচ্ছে কর্মদাতার সৃষ্টি। কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি বা নারীর জীবনযাত্রাটা এমন যে, আয় বৈষম্যটা হয়েই যায়।

নারী-পুরুষের এই আয়ের বৈষম্য আনুষ্ঠানিক খাতে অনেকটা কম হলেও অনানুষ্ঠানিক খাতে এই বৈষম্য অনেকটাই প্রকট। কারণ আনুষ্ঠানিক খাতে মোটামুটি প্রতিটি পদের বিপরীতে বেতন নির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে। অন্যদিকে অনানুষ্ঠানিক খাতে-কার কত বেতন হবে, কাকে কত টাকা মজুরি দেওয়া হবে, তা নির্ভর করে কর্মদাতার ওপর। তাই কর্মদাতাও সুযোগ পেয়ে যায় এ খাতে বৈষম্য তৈরি করার।

শ্রম জরিপের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে নারীদের ৯২ শতাংশের কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে। নারী শ্রমিক যারা রাস্তার কাজ করছেন, ইট ভাঙছেন কিংবা রাস্তা-ঘাট নির্মাণের সঙ্গে আছেন সেসব জায়গায় নারী শ্রমিকরা ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত মজুরি কম পেয়ে থাকে।

এছাড়া, কাজের ধরনেও বৈষম্যের শিকার হয় নারীরা। পদোন্নতির দিকে চোখ রাখলে দেখতে পাবেন ওপরের দিকে যতই চোখ পড়বে নারীর সংখ্যা ততই কমতে থাকে। আবার অনেক কর্মক্ষেত্রে ওভারটাইম করার সুযোগ রয়েছে কিন্তু ওভারটাইমে কাজের ক্ষেত্রে নারীর তুলনায় পুরুষই এগিয়ে। কারণ নারীকে কাজ শেষে সামলাতে হয় ঘরের দায়িত্ব। এজন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওভারটাইমের সুযোগও দেওয়া হয় না নারীদের।

আরেকদিকে রয়েছে নিরাপত্তার প্রশ্ন, কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীবান্ধব নয়। প্রায় ক্ষেত্রেই কাজের জায়গায় নারীদের অনেক ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় এবং সন্ধ্যার পরে নারীদের বাইরে থাকা যেন আমাদের সমাজে মহা-অপরাধ, আর একটা নির্দিষ্ট সময় পরে নারীদের পড়তে হয় বিভিন্ন অসুবিধায়। এই কারণে অনেক ধরনের কাজের সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত হন।

আরও একটি বড় প্রশ্ন আসে অফিসের ভেতরের নিরাপত্তা নিয়েও। রাস্তাঘাটে বখাটে ছেলেদের থেকে শুরু করে রিকশাচালক, বাসের হেল্পার সবার কাছ থেকে হয়রানির শিকার হওয়ার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত, বহু ডিগ্রিধারী কলিগ বা বসের কাছেও হয়রানির শিকার হয় নারীরা। এ হয়রানির জন্য অনেক নারী তার কর্মক্ষেত্র থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়।

আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে নারীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ব্যবহার করেন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। এক্ষেত্রে হাতে গোনা কয়েকজন নারীকে ব্যবহার করেন তারা, যেসব নারীরা লোভের বশবর্তী হয়ে তাদের ফাঁদে পা দেন, তাদের বিভিন্নভাবে সহায়তা দিলেও বাকি নারীদের অবহেলার চোখে দেখা হয় কর্মস্থলে। দেওয়া হয় না পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। এভাবে নারীদের মধ্যে এক ধরনের মনোভাব তৈরি করা হয় যে, বসের মন জুগিয়ে চললে তার সুযোগ-সুবিধা হবে দ্বিগুণ।

একটি জরিপে দেখা গিয়েছে ৮৪ দশমিক ৭ শতাংশ নারীশ্রমিক পোশাক কারখানায় মৌখিক নির্যাতন শিকার হন। ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ মানসিক নির্যাতনের, ২০ শতাংশ শারীরিক নির্যাতনের এবং ১২ দশমিক ৭ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হন।

উম্মে শারমিন নীলা (ছদ্মনাম) একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। বর্তমান চাকরির বয়স কেবল তিন মাস। এর আগে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন সাত মাস। প্রথম ২-৩ মাস সব ঠিকঠাক চললেও, ধীরে ধীরে বসের কুনজরে পড়ে যান তিনি। এরপর অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু প্রস্তাব আসে। সম্মতি না দেওয়ায় চাকরিচ্যুত করার হুমকি। শেষমেশ চাকরি আর টিকিয়ে রাখতে পারেননি নীলা।

এমন বহু নারী রয়েছেন যারা কর্মক্ষেত্রে এমন নানান ধরনের হয়রানির শিকার হন। অনেকে চাকরি হারানোর ভয়ে সবটা মেনে নেন, অনেকে প্রতিবাদ করতে গিয়ে রোষানলে পড়ে যান।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে ১৯৭৪ সালে কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল ৪ শতাংশ। ১৯৮০ সালের দিকে এই হার বেড়ে দ্বিগুণ হয়। আর ২০১৬-১৭ সালে এই হার দেখানো হয়েছে ৩৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

কর্মক্ষেত্রে পুরুষের অবদানের পাশাপাশি নারীর অবদানও নেহাত কম নয়৷ দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সর্বত্র নারীর অংশগ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে। আর নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত হওয়ার কারণ তাদের প্রতি হওয়া বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা। যেসব নারীরা এসব কিছুর তোয়াক্কা না করে টিকে থাকার লড়াই চালাচ্ছেন তাদের কাছে কর্মক্ষেত্র যুদ্ধক্ষেত্রের মতো।

অনন্যা/এআই