বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনবুধবার, ৫ আগস্ট, ২০২৬
ভ্রমণ

জ্ঞান আর ঐতিহ্যের মিলনস্থল রাজশাহী কলেজ

WhatsApp Image 2025-07-19 at 4.53.33 PM

রাজশাহীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত রাজশাহী কলেজ কেবল একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে এ কলেজ শিক্ষার আলো ছড়িয়ে চলেছে। রাজশাহী কলেজের ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এতটাই আকর্ষণীয় যে এটি আজ শুধু শিক্ষার্থীদের নয়, ভ্রমণপিপাসু ও ইতিহাসপ্রেমীদের কাছেও এক দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠেছে।

প্রতিষ্ঠা ও ঐতিহাসিক পথচলা

১৮৭৩ সালে রাজশাহী কলেজের যাত্রা শুরু হয় একটি ছোট আকারের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে। সময়ের পরিক্রমায় এটি এক বিস্তৃত শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ১৯৫৩ সালে কলেজটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে আসে এবং পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এক শতকেরও বেশি সময় ধরে রাজশাহী কলেজ দেশের উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে অবদান রেখে চলেছে, গড়েছে অসংখ্য কৃতি শিক্ষার্থী।

লাল দালান ও স্থাপত্যের ঐশ্বর্য

Advertisements

কলেজ প্রাঙ্গণে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে এক বিশাল লাল ইটের ভবন—যা সবাই ‘লাল দালান’ নামে চেনে। এই ভবনটি কলেজের প্রশাসনিক ভবন এবং একইসঙ্গে এর প্রধান স্থাপত্য নিদর্শন। ঔপনিবেশিক আমলের ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই দালানে রয়েছে প্রশস্ত বারান্দা, খিলানযুক্ত জানালা আর উঁচু ছাদ, যা এক রাজকীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে। কলেজ ক্যাম্পাসজুড়ে আরও রয়েছে বিজ্ঞান ভবন, কলা ভবন, গ্রন্থাগার, ছাত্রাবাস, শিক্ষক আবাসন এবং পরীক্ষণ কেন্দ্রসহ প্রায় এক ডজন স্থাপনা, প্রতিটির নকশায় রয়েছে ঐতিহ্যের ছাপ।

প্রকৃতির পরশে শাপলাপুকুর

লাল দালানের ঠিক পিছনে অবস্থিত একটি বিশাল পুকুর, যা রাজশাহী কলেজের অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক উপাদান। বর্ষা ও শরৎকালে এই পুকুরজুড়ে ফুটে থাকে সাদা, গোলাপি ও বেগুনি, শাপলা। এই নয়নাভিরাম দৃশ্য শুধু কলেজ শিক্ষার্থীদের নয়, যে কেউ একবার দেখলে মুগ্ধ না হয়ে পারেন না। মাঝে মাঝে মাছের লাফ, পাখিদের ওড়াউড়ি আর আশপাশের গাছের ছায়া মিলে এক অপূর্ব পরিবেশ সৃষ্টি করে। পুকুরপাড়ে শান বাঁধানো ঘাটে শিক্ষার্থীরা বসে গল্প করে, বই পড়ে বা একাকী সময় কাটায়—যেন শহরের ব্যস্ততার মাঝেও এক শান্ত আশ্রয়।

বৃক্ষরাজি আর ফুলেল পরিবেশ

রাজশাহী কলেজ শুধু শিক্ষা নয়, পরিবেশ সংরক্ষণেও এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পুরো ক্যাম্পাসজুড়ে রয়েছে ১৪০টিরও বেশি জাতের গাছ। কাঞ্চন, লটকন, চম্পা, পারুল, করমচা, হিজল, মহুয়া, অর্জুন, পলাশসহ নানা ধরনের গাছ বছরের বিভিন্ন সময়ে ফুলে-ফলে সুশোভিত হয়। এই গাছগুলোতে পাখির কূজনে মুখর হয়ে ওঠে পুরো চত্বর। মূল ভবনের সামনে অবস্থিত ফুলের বাগানে জিনিয়া, গাঁদা, রুয়েলিয়া, গোলাপ, চন্দ্রমল্লিকা, জবা, রজনীগন্ধা, ডালিয়া ইত্যাদি ফুলের সমারোহ যেন কলেজের সৌন্দর্যে নতুন মাত্রা যোগ করে।

ইতিহাসের সাক্ষ্য বহনকারী স্মৃতিচিহ্ন

কলেজ ক্যাম্পাসে রয়েছে একটি সুদৃশ্য শহীদ মিনার, যা ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর স্থান। তাছাড়া এখানে রয়েছে ১৯৮০’র দশকে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ হওয়া ছাত্রনেতা দুলালের সমাধি। এই স্মৃতিচিহ্নগুলো রাজশাহী কলেজের রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

জ্ঞানভান্ডার—রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগার

শিক্ষার প্রাণ হচ্ছে গ্রন্থাগার, আর রাজশাহী কলেজের গ্রন্থাগার সে জায়গায় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এখানে রয়েছে প্রায় ৭৭,০০০ বই—বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের দুর্লভ সব সংস্করণ, গবেষণামূলক বই, ক্লাসিক, সমকালীন গ্রন্থসহ নানা বিষয়ের সংগ্রহ। এই গ্রন্থাগার শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।

রাজশাহী কলেজ সাধারণত সরকারি অফিস সময়ানুযায়ী খোলা থাকে। দর্শনার্থীরা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কলেজ ক্যাম্পাস ঘুরে দেখতে পারেন। তবে প্রশাসনিক ভবনে প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে সীমিতভাবে করা যায়।

Advertisements