বাংলাদেশের অন্যতম নারী বিষয়ক ম্যাগাজিনসোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬
বিশ্লেষণ

ডায়াবেটিক নাকি ডায়াবেটিস?

Dark Blue Red White Generic News General News Facebook Post (1)

আজকের বাংলাদেশে একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ– “ডায়াবেটিক”। রাস্তাঘাটে, প্রেসক্রিপশনে, কিংবা ডায়াবেটিস রোগীদের মাঝে কথাবার্তায় এটি যেন ঘরে ঘরে পরিচিত।

বাংলাদেশে “ডায়াবেটিক” শব্দটি অতিরিক্ত ব্যবহার এবং ভুলভাবে ব্যবহার করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নাম ইত্যাদি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এই শব্দটি সঠিকভাবে ব্যবহার করছি? “ডায়াবেটিক” নাকি “ডায়াবেটিস”— কোনটি আসলে সঠিক শব্দ, আর কোনটি কোন প্রসঙ্গে ব্যবহার করা উচিত?

ভুল শব্দচয়ন শুধুমাত্র ভাষাগত ভুল নয়, বরং এতে স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার ঘাটতি প্রতিফলিত হয়। একজন রোগী, শিক্ষার্থী কিংবা সাধারণ নাগরিক হিসেবে সঠিক শব্দ ব্যবহারের চর্চা করা জরুরি। চিকিৎসা পরিভাষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভুল ধারণা রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থার দেরি বা বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে।

চলুন জেনে নেয়া যাক সঠিক শব্দের ব্যবহার –

ডায়াবেটিস (diabetes) : রোগটির নাম (Noun/ বিশেষ্য পদ)

প্রথমেই পরিষ্কার করা যাক— “ডায়াবেটিস” (Diabetes) হলো একটি রোগের নাম। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী রোগ যেখানে শরীর ইনসুলিন নামক হরমোনটি ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না, ফলে রক্তে গ্লুকোজ (চিনি) এর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। ইংরেজিতে একে বলা হয় Diabetes Mellitus.

এই শব্দটির ব্যবহার খুবই নির্দিষ্ট: “আমার ডায়াবেটিস হয়েছে”, “তার ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে আছে”, “ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ” — এসব বাক্যই ব্যাকরণগত ও অর্থগত দিক থেকে সঠিক। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, “ডায়াবেটিস” শব্দটি নিজেই একটি রোগের পরিচয় বহন করে, এটি কোনো ব্যক্তি, বস্তু বা গুণের নির্দেশ করে না। ফলে, যারা বলেন “আমার ডায়াবেটিক আছে” বা “আমি ডায়াবেটিক হয়েছি”, তারা মূলত ভুল শব্দ ব্যবহার করছেন—কারণ “ডায়াবেটিক” হলো বিশেষণ, রোগ নয়।

এছাড়া, “ডায়াবেটিস” শব্দটি কখনোই পরিবর্তিত হয়ে অন্য কিছু হয় না—এটির একমাত্র ব্যবহার রোগের নাম হিসেবেই। এটি দিয়ে কখনো মানুষ বোঝানো যায় না, কখনো খাদ্য বোঝানো যায় না। যেমন, আপনি বলতে পারেন “ডায়াবেটিস রোগী” বা “ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি”, কিন্তু শুধুমাত্র “আমি ডায়াবেটিস” বলা একেবারেই ভুল। এই রোগটি দুইটি প্রধান ধরনের হয়—টাইপ ১ এবং টাইপ ২, এবং এ ছাড়াও গর্ভাবস্থায় হওয়া “জেসটেশনাল ডায়াবেটিস” নামে একটি রূপ রয়েছে। প্রত্যেক ধরণের ডায়াবেটিসেরই ভিন্ন চিকিৎসা, উপসর্গ ও জীবনধারা রয়েছে, তবে শব্দটি সবক্ষেত্রেই অপরিবর্তিত থাকে: ডায়াবেটিস।

সুতরাং, ডায়াবেটিস একটি পরিপূর্ণ, স্থির এবং নির্দিষ্ট শব্দ—যেটি কোনো উপসর্গ বা রূপান্তরের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয় না। এটি কখনো “ডায়াবেটিক” নয়, আবার “ডায়াবেটিকস” বা “ডায়াবেটিস্” বলাও ভুল। চিকিৎসা বিজ্ঞানে, সাংবাদিকতায়, স্বাস্থ্য শিক্ষা কিংবা দৈনন্দিন কথোপকথনে এটির সঠিক ব্যবহার জানা অত্যন্ত জরুরি। কারণ, একটি সাধারণ শব্দের ভুল ব্যবহার একজন রোগীর ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি, ভুল চিকিৎসা, কিংবা সচেতনতার অভাব তৈরি করতে পারে। তাই বলা যায়—ডায়াবেটিস মানে রোগ, শুধু রোগ—এর বেশি কিছু নয়।

ডায়াবেটিক (diabetic) : রোগ সম্পর্কিত বিষয় (Adjective/ বিশেষণ)

“ডায়াবেটিক” শব্দটি ইংরেজি “diabetic” থেকে আগত, যা মূলত একটি বিশেষণ (adjective) হিসেবে ব্যবহৃত হয়, অর্থাৎ এটি এমন কোনো কিছু বোঝাতে ব্যবহৃত হয় যা ডায়াবেটিস রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, “ডায়াবেটিক খাবার” বলতে বোঝানো হয় এমন খাদ্য যা ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য উপযোগী—যেমন, চিনি বা কার্বোহাইড্রেট কম, অথবা গ্লাইসেমিক ইনডেক্স কম। আবার “ডায়াবেটিক ওষুধ” বলতে বোঝায়—যে ওষুধগুলো ডায়াবেটিস রোগ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

তবে “ডায়াবেটিক” শব্দটি কখনো কখনো বিশেষ্য (noun) হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, বিশেষ করে যখন তা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন: “He is a diabetic” — অর্থাৎ, “তিনি একজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি”। বাংলায় এর রূপ হয়—“ডায়াবেটিক রোগী”।

কিন্তু ভুলভাবে অনেকেই “ডায়াবেটিক” শব্দটিকেই ডায়াবেটিস রোগ বোঝাতে ব্যবহার করেন। যেমন, “আমার ডায়াবেটিক হয়েছে” বা “ডায়াবেটিক আছে”—এগুলো ব্যাকরণগতভাবে ভুল। কারণ, এখানে রোগ বোঝানো হচ্ছে, অথচ “ডায়াবেটিক” শব্দটি রোগের নাম নয়, এটি রোগ সম্পর্কিত শব্দ। রোগের সঠিক নাম হলো “ডায়াবেটিস”। তাই সঠিক বাক্য হবে: “আমার ডায়াবেটিস হয়েছে” বা “আমি ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত”।

সুতরাং, “ডায়াবেটিক” শব্দটির শুদ্ধ ব্যবহার মূলত রোগের সাথে সম্পর্কিত বৈশিষ্ট্য বোঝাতে এবং রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে বোঝাতে হয়। এটি কখনোই নিজে নিজে কোনো রোগের নাম হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এই বিষয়টি বোঝা এবং শুদ্ধভাবে প্রয়োগ করা আমাদের ভাষা ব্যবহারে যেমন শৃঙ্খলা আনে, তেমনি স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার প্রকাশও ঘটায়।