Skip to content

২রা মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

সম্পর্ক

অভি খুব অমিয় কণ্ঠেই বললো, ‘আমাকেও কি তুমি পুরুষবেশ্যা ভাবো?’ সম্পর্ক এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই যখন কোনো কারণ ছাড়াই অভি বলেছিল, ‘চলো, আমরা ফিরে যাই যার যার গন্তব্যে’ তখন জুঁই একটা কাণ্ড করেছিল, সেই পরিপ্রেক্ষিতেই অভির এই প্রতি-প্রশ্ন।

সে-সময় একটি উপন্যাস পড়ছিল জুঁই। উপন্যাসে ঘটনাক্রমে লেখক কেন্দ্রীয় চরিত্রের মেয়েটির সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্মমতা বর্ণনা করতে গিয়ে ছেলেটাকে পুরুষবেশ্যা বলে অভিহিত করে। ওই পৃষ্ঠার ছবি তুলে জুঁই অভিকে পাঠিয়েছিল। অভির এমন প্রশ্নে বলেছিল, ‘কক্ষনো নয়! তুমি আমার কাছে ঈশ্বরের পরে শ্রেষ্ঠ পবিত্র, ঠিক আঁতুরে শিশু।’

জুঁইয়ের আহাজারি আর অধিকার না ছাড়ার প্রবল জিদেই হয়তো টিকে ছিল ওদের সম্পর্ক। তবে এর ভবিষ্যৎ যে সুখকর হতে পারে না, সে বিষয় জুঁই ভালো করেই জানতো।

দুই

জুঁই একটা কমার্শিয়াল ব্যাংকে জয়েন করেছে ছয় মাস হলো। কৈশোরেই বিয়ের পাঠ চুকে গিয়েছিল তার। ষোলো বছর বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে আবার বছর না পেরোতেই ডিভোর্সির খাতায় নাম লিখিয়েছে। মফস্বলে এমনটা এখনো খুব কলঙ্কের বিষয়। অনিন্দ্য সুন্দরী না হলেও জুঁই দেখতে স্নিগ্ধ, মায়াবী, কিছুটা সম্মোহনী চাহনি, শান্ত আচরণের মেয়ে। এতটা নির্মলা হয়েও ভালোবেসে বিয়ে করা মানুষটার মনে বা সংসারে স্থান জুঁইয়ের হলো না।

এসএসসির রেজাল্ট বেরোনোর আগেই ঢাকায় ফুপুর বাসায় চলে আসে জুঁই । অনেকটা ভালো ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও ভাগ্য তাকে এই চ্যাপটারে অকৃতকার্য বলে ঘোষণা দেয়। জুঁই দ্বিতীয় বার পরীক্ষা দিয়ে খুব ভালো রেজাল্ট করে এবং স্থায়ী-ভাবে ফুপুর বাসায় থাকার সিদ্ধান্ত নেয়।

ঢাকা জুঁইয়ের কাছে একটা বিনোদনের স্বপ্ন ছিল মাত্র। তার আড়ালের তেলেসমাতির সম্মুখীন জুঁইকে তেমন হতে হয়নি। কারণ, আশ্রিতা হিসেবে ফুপুর বাসায় থাকা শুরু করলেও নিজের পরিপাটি ব্যবহার আর যাপনই তাকে ওই পরিবারের মধ্যমণি করে নেয়।

ফুপুই দুই-তিনটা টিউশন ঠিক করে দেয়। পড়াশোনার খরচ চালিয়ে হাতখরচ, এতেই হয়ে যেত জুঁইয়ের। কলেজ, বাসা আর টিউশনের বাইরে কয়েক কোটি মানুষের এই সঙ-সাজা ঢাকার রূপ দেখার সুযোগ বা ইচ্ছে, কোনোটাই জুঁইয়ের ছিল না।

জীবনের শুরুতে যে ক্ষতের সৃষ্টি তার হয়েছিল, তাকে আগলে না রাখলেও ভাঙার ভয়েই হয়তো জুঁই চুড়ি কেনেনি আর কখনো। কলেজ-ভার্সিটিতে একটা বান্ধবীও জুঁইয়ের ছিল না। অবধারিত ভাগ্যের চরম মোড়ের সঙ্গে জুঁইয়ের যোগাযোগ হয়, একা-থাকা শুরু করার পর থেকে। চুল বেঁধে রাখলেই তো আর হাওয়ার গতি রোধ হয় না!

তিন

চাকরিতে জয়েন করেই জুঁই ফুপুর বাসা ছেড়ে নিজে বাসা ভাড়া নেয়। তার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল, জুঁইয়ের বিয়ে করতে না চাওয়ার সিদ্ধান্ত। ওর সমবয়সী বা ছোট যে ফুপাতো বোনরা ছিল, তাদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে, কিন্তু ও বিয়ে করতে মোটেও রাজি নয়। পরিবার, আত্মীয়-স্বজনদের বিয়ে করতে বলার মাত্রাতিরিক্ত চাপের কারণেই বাধ্য হয় জুঁই একা থাকতে। দুই রুমের ছোট্ট একটা ফ্লাটের আয়তন বেশি না হলেও, একা থাকতে হয় বলেই খুব হু হু লাগে জুঁইয়ের।

বইপড়া জুঁইয়ের নেশা। লাস্ট সাত বছর এই বই-ই তার জীবনের একান্ত সঙ্গী। অফিস থেকে বাসায় ফিরে টুকটাক কাজ সেরে বই নিয়ে বসে, তবে বইতে তেমন মনোযোগ সে দিতে পারছে না। গান শুনতেও তেমন ভালো লাগে না। কী এক অজানা কারণেই উদাস-উদাস গন্ধে ভরে থাকে বিছানা, বারান্দা। ফেসবুকে তেমন সময় দেয় না জুঁই, ইনবক্সে তো প্রশ্নই আসে না। ইচ্ছে করেই এড়িয়ে চলে পুরুষ নামগুলো থেকে।

অভির রিকোয়েস্ট কবে-কিভাবে একসেপ্ট করেছিল, সে নিজেও জানে না। তবে অভির আইডিটা বেশ গাম্ভীর্যপূর্ণ বলেই ওর আইডির প্রতি কিছুটা সমীহ জুঁইয়ের ছিল, আর একদিন হঠাৎ ওই আইডি থেকে কুশল জানতে চাওয়ার টেক্সট কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারেনি জুঁই।

এক কথায়, দুই কথায় কিভাবে যেন জমে উঠেছিল কথার পেয়ালা। তিন দিনেই বন্ধুত্ব আর দুই সপ্তাহ পার হতে-না-হতেই অভির প্রেমের প্রস্তাবও এড়াতে পারল না জুঁই। অভির শিশুসুলভ দাম্ভিক ইশারায় আটকে গিয়েছিল নির্দ্বিধায়। খুব বেশি ভালোলাগা জন্ম নিয়েছিল জুঁইয়ের মধ্যে, যা সে নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিল না।

যদিও অভি দেখতে তেমন সুন্দর নয়। অতটা আলাপিও নয়, খুব স্বল্পভাষী জুঁইয়ের সঙ্গেও যে খুব কথা বলে তা-ও নয়। তারপরও জুঁই সারাক্ষণ অভিতেই পড়ে থাকে। একটা নিরিবিলি সম্পর্ক চলছিল ওদের। কোনো কমিটমেন্ট ছাড়াই কথায় কথায়ই চলতে শুরু করে সম্পর্ক। দুজনের অফিস বেশ দূরে না হলেও সম্পর্কের তিন মাস কেটে গেলেও কেউ কারও সঙ্গে দেখা করেনি।

একদিন অভির প্রস্তাবেই দেখা হলো দুজনের। রমনা পার্কে নয়, একটা শিশুপার্কে। একঘণ্টা একসঙ্গে ছিল দুজন। জুঁইয়ের সঙ্গ ওর এক কলিগ ও তার বাচ্চারা ছিল, তাই হাই-হ্যালো ছাড়া তেমন কথাও ওদের হয়নি। অভিই ভালোবাসার আহ্বান জানিয়েছিল, কিন্তু অভির চোখে জুঁইয়ের প্রতি তেমন আকর্ষণ জুঁই কখনোই দেখেনি। আর এই বিষয়টি সে অভির গাম্ভীর্যের প্রকাশ বলেই ধরে নিতো।

জুঁই ভালোবাসতে জানতো। ওকে ভালোবাসার দেবী বললে খুব বেশি ভুল হবে না, আত্মীয়-স্বজন এমন স্বীকৃতি বরাবরই দিয়েছে। অভিকে সে ভালোবাসার সুযোগ দেয়নি। কারণ, সে সব সময় অভিকে এক আদরের নিবিড় জালে জড়িয়ে রাখে, এমনই ভাবতো জুঁই। অভির সব কিছুই সে পজিটিভভাবে নিয়েছে। অভি ভালো অঙ্কের বেতন পেলেও সময়ে-অসময়ে জুঁইয়ের কাছে তার অভাবের কথা বলে, আর সেই পরিপ্রেক্ষিতেই জুঁই অভিকে নিজের মাসিক বেতনের অর্ধেকের বেশি দিয়ে নিজে কষ্ট করে চলেছে।

চার

সম্পর্ক বছর পেরোতে-না-পেরোতেই অভির ছাড়ছাড় ভাব সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। সম্পর্কটা অর্থকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছিল। একদিন অভির জন্মদিনে উইশ-করা পোস্টে এক মহিলা কেমন দ্বিধামূলক মন্তব্য করে এবং ইনবক্সে জুঁইয়ের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে। ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করে যে, অভির সঙ্গে তার একসময় সম্পর্ক ছিল এবং সেটা খুব গভীর।

যেহেতু জুঁই অভিকে এক চুল সন্দেহের চোখে দেখতো না, আর প্রায় চল্লিশ-অধিক-বয়স্ক মহিলার সঙ্গে ওর সম্পর্ক থাকতে পারে, এ বিষয় জুঁই কল্পনাও করতে পারেনি। সময়ের পরিক্রমায় ওই মহিলা অভির সাথে যে তার সম্পর্ক ছিল, তার অনেক প্রমাণ দেয়। জুঁইও মিলিয়ে দেখে, সবটা যেমন মিথ্যা মনে হচ্ছে না, আবার সবটাই সত্যি না-ও হতে পারে।

প্রথম দেখা হওয়ার পরে কয়েকবার জুঁই ও অভির দেখা হয়। শুধু হাতধরা ছাড়া অভির সঙ্গে তার আর কোনো স্পর্শ ছিল না। অভির আগের কয়েকটি রিলেশনের গল্প অভি জুঁইয়ের সঙ্গে করেছে। কিন্তু এমন রিলেশন কী করে সম্ভব! জুঁইয়ের সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল।

জুঁই ডিভোর্সি, নতুন চাকরিতে জয়েন-করা একটা মেয়ে। ওই মহিলা বলেছিল, ‘আপনার সাথে নয়, আপনার প্রতিষ্ঠিত জবের সাথেই সম্পর্ক করেছে অভি। আমার স্বামী যথেষ্ট অর্থশালী মানুষ, এটা জেনেই অভি প্রেম করেছে আমার সাথে। তার টার্গেট আমি পূর্ণ করতে পারিনি। কিছু দিন বাদেই তার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলাম, তাই সে কেটে পড়েছে।’

মহিলার বড় ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে, ছোট ছেলে কলেজে। সে দেখতে তেমন সুন্দর নয়। শিক্ষিত ঠিকই, কিন্তু আকর্ষিত হওয়ার মতো তেমন কিছু তার মধ্যে একদম নেই। ওই মহিলা আর অভির কিছু একান্ত ঘনিষ্ঠ প্রেম-আলাপের স্ক্রিনশটও সে দিলো। অবিশ্বাস করার মতো আর কোনো হেতুই রইল না। ওই মহিলার সঙ্গে অভির শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত ছিল, এটা বুঝতে জুঁইয়ের বাকি থাকলো না।

কী ভাববে, কী বলবে, কী করবে কিছুই জুঁই ভেবে পাচ্ছিল না। এক বিন্দু কান্না তার পেলো না, শুধু নিজের প্রতি খুব আহারে লাগলো। অনুভূতি-শূন্য হয়ে পড়লো জুঁই। অভিকে এ বিষয় কোনো প্রশ্নই করলেঅ না সে। একদম চুপ হয়ে গেলো জুঁই। আট বছর আগে যে প্রেম-ভালোবাসার কবর দিয়েছে জুঁই, সে কবরে এমন অপবিত্র ফুল ফোটালো সে! ঘৃণা হচ্ছিল তার নিজের প্রতি। মানুষ চিনতে তার কেন এত ভুল হয়।

পাঁচ

অভির কেমন আনমনা-ভাবে জুঁই অভিকে প্রশ্ন করায় অভি বলেছিল, তার কিছু ভালো লাগছে না। অভির ভালো না-লাগার কারণ হলো, টাকা। হাতে টাকা পেলে তার কিছু দিন খুব ভালো লাগে। কমে এলেই ভালো না-লাগা শুরু হয়।

জুঁইও জিদ করলো। ভালোবাসার চ্যাপ্টার মন থেকে শেষ করে ফেললেও জুঁই দেখতে চাইলো, কতটা নিতে পারে অভি। ওর অর্থলোভী সরলতার মুখোশ কতটাই বা রাক্ষস আকার ধারণ করতে পারে। অভির চাওয়ার দ্বিগুণ দেওয়া শুরু করলো জুঁই। নিজের বেতন, জমানো টাকা, গয়না বিক্রি করে পর্যন্ত।

অভি খুব সন্তুষ্ট, তার প্রেম উছলে পড়ে ইদানীং। জুঁই এমনটা দেখে নীরবে কাঁদে। কারণ, এক চিলতে প্রেম সে নিতে পারে না! জুঁই পৃথিবীর সবচেয়ে ঘৃণা করে অভিকে, আর সামনে ভালোবাসার সমুদ্র দেওয়ার অভিনয়। কষ্ট হলেও মানুষ চেনার অভিজ্ঞতা কিছুটা স্বস্তি দেয় জুঁইকে। এর মধ্যে আবিষ্কার হয় আর এক অধ্যায়ের।

এক কলেজ-পড়ুয়া মেয়ের সঙ্গে অভির তুমুল প্রেম চলছে। মেয়েটির নাম নীলা। বয়স উনিশ বা কুড়ি হবে। দেখতে অতটা সুন্দরী না হলেও খুব চঞ্চলা আর আলাপী। মেয়েটা জুঁইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে। সে সন্দেহ করছে, অভির সঙ্গে জুঁইয়ের সম্পর্কের কথা। তাই সে জুঁইয়ের সম্পর্কে জানতে চাইছে, কৌশলে উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করছে অভির সঙ্গে জুঁইয়ের সম্পর্কে স্তর।

নীলার কাছে অভির সঙ্গে সম্পর্কের কথা এড়িয়ে যায় জুঁই। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব গভীর করে, যেন অভির গতিবিধি সহজেই জানতে পারে জুঁই। আর অভি কী নিখুঁত অভিনেতা, সে কী সুন্দর জুঁইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক কন্টিনিউ করছে। এমনকি অভির বাসায় ডেটিংয়ের প্রস্তাব পর্যন্ত করেছে বারবার।

অভি ওই মেয়েটার প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল। জুঁইয়ের কাছ থেকে ছোট বোনকে দেবে বলে ড্রেস নিয়ে ওই মেয়েকে দিয়েছে। সকালের নাশতার টাকা নেই বলে টাকা নিয়ে ওই মেয়েকে নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেয়েছে। সবটাই জুঁই বুঝতে পেরেছে, কিন্তু কিছুই বলেনি। কারণ, অভি কতটা নিচে নামতে পারে, মানুষ কতটা হীন হতে পারে, সেই হীন মানুষের কুৎসিত রূপটাই শুধু জুঁই দেখতে চেয়েছিল, নিজের সর্বস্ব দিয়ে।

মেয়েটার সঙ্গে জমিয়ে প্রেম করছিল অভি। জুঁই প্রতিদিনের খবরই জানতো। মেয়েটাই জানাতো। একদিন দুপুরে মেয়েটি জুঁইকে ফোন করলো। খুব কান্নাকাটি করে বললো, অভি তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। মেয়েটি প্রেগন্যান্ট। সম্প্রতি নাকি অভি তার এক প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে খুব মাখামাখি সম্পর্কে রয়েছে।

অভি তো ধুরন্ধর খেলাড়ি! এই মেয়ের কাছে তার যতটা চাওয়া ছিল, তা অভি পেয়ে গিয়েছিল। কমলার রস সে খোসায় আঁচড় না দিয়েই নিংড়ে খেতে জানে। এখন আর নীলাকে তার কোনো প্রয়োজন নেই। নীলার পেছনে অভি যথেষ্ট টাকা-পয়সা-সময় ব্যয় করেছে। নীলার যা ছিল, নিয়ে হয়তো সে তুষ্ট বা তুষ্ট নয়। তবে একই শরীরে লেগে থাকার মতো মাছি অভি নয়।

আর যেহেতু, নীলার কাছে কোনো টাকা নেই, তাই প্রশ্নই আসে না, অভীর নীলাতে পড়ে থাকা। এ-ছাড়া, তার প্রাক্তন প্রেমিকার বর ঢাকায় বদলি হয়ে আসায় সে ঢাকায় সেটেল্ড। তার বাসায় নিয়মিত যাতায়াত অভির। সে ক্ষেত্রে শারীরিক চাহিদা মেটাতে তার নীলার কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সব পাখি তো ঘরে ফেরে না। তীরে ঘেঁষে চলে কি সব নাও!

ছয়

এত কিছু হয়ে যাচ্ছে, তবু অভি কেমন করে স্বাভাবিক আচরণ করে জুঁইয়ের সঙ্গে, সেটা ভেবেই জুঁই আরও বেশি চমকে যায়। মনে মনে জপে, মানুষ! মানুষ! মানুষ! জুঁইকে যে প্রত্যাখ্যান অভি করতে চায়নি, তা কিন্তু নয়। তবে জুঁইকে ছেড়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ অভি কখনোই দাঁড় করাতে পারেনি। জুঁই ছিল অভির মাত্রাতিরিক্ত বাধ্য। প্রথম-প্রথম জুঁই কিছুটা প্রতিবাদ-অভিমান-অভিযোগ করলেও ওই মহিলার সঙ্গে সম্পর্কের কথা জানার পরে জুঁইও নিখুঁত অভিনয় শুরু করে অভির সঙ্গে।

অভিনয়েই ভুল হওয়ার আশঙ্কা সবচেয়ে কম থাকে। তাই তো অভিও জুঁইকে খুব বোকা ভেবে একছত্র অধীশ্বর ভাবছে নিজেকে। সে জানেও না, জুঁই পৃথিবীর সব চেয়ে বেশি ঘৃণা করে অভিকে। অথচ দিনে তিনবার রুটিন করে তোতা পাখির মতো বলে, ‘ভালোবাসি তোমায়।’

নীলার কথা শুনে এবার আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না জুঁই। নীলার প্রতি অতি মাতামাতিতে জুঁই কষ্ট পেলেও খারাপ লাগতো না। ভাবতো, এবার বুঝি অভি ক্ষান্ত হবে। নীলাকে বিয়ে করবে। নীলার প্রতি কিঞ্চিৎ দুর্বলতাও জুঁইয়ের ছিল। জুঁই মনে মনে ঠিক করলো, আজ সে অভির সঙ্গে দেখা করবে, আর পর্দা উন্মোচন করবে সব নোংরামির। অভিকে দেখা করার জন্য বেশি রিকোয়েস্ট করতে হয়নি জুঁইয়ের, একবার বলতেই দেখা করতে চলে এলো সে।

অভির সঙ্গে কখনো নিরিবিলি জায়গায় দেখা করেনি জুঁই। অধিকাংশ সময়ে কোনো রেস্টুরেন্টে বা বন্ধুরা থেকেছে সঙ্গে। অনেকবার অভি তার বাসায় যাওয়ার কথা বললেও রাজি হয়নি জুঁই।

সাত

গার্ডেনে ঠিক চারটার সময় অভি এসে উপস্থিত হলো। হাঁটতে-হাঁটতে গার্ডেনের খুব নির্জন একটা যায়গায় মেহগনিগাছের নিচে এসে দাঁড়ালো জুঁই। সে-দিনের বিকেলটার মতো স্বর্ণরঙা আকাশ আর কখনো দেখেনি সে। অনেকবার পারিবারের সবাইকে নিয়ে জুঁই গার্ডেনে এসেছে, কিন্তু গার্ডেনের নিঝুম নির্জন ভাঁজে যে এমন তিলোত্তমা লুকিয়ে থাকে আগে কখনো দেখেনি জুঁই। হয়তো অনুভব করার মতো মানসিকতাও ছিলো না তার।

জুঁইকে দাঁড়াতে দেখে অভি বলল, ‘থামলে কেন!’ অভির একটা বিশেষ গুণ অবশ্য ছিল, দেখা হলে সে খুব বেশিই মনযোগী থাকত জুঁইয়ের প্রতি। জুঁই খুব চাপা স্বরে বলল, ‘অভি, আমি তোমার সাথে কিছু কথা বলতে চাই।’ অভি হাসতে লাগল, ‘কথা! তা তো দিনভরই হচ্ছে। নতুন করে কী বলবে? আর তোমার কথা এ জীবনেও শেষ হবে না। চলো, সামনের দিকে যাই।’

জুঁইয়ের কণ্ঠ চড়াও হলো। সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘পুরুষবেশ্যা।’ অভি হতভম্ব হয়ে গেল। জুঁই এত আস্তে কথা বলে যে, ওর কথা পাশের মানুষদের শুনতে বা বুঝতেও কষ্ট হয়। অথচ, আজ তার এমন আগুন-মাখা স্বর কেন? অভি অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আমি পুরুষবেশ্যা!’ জুঁই বলল, ‘হ্যাঁ, তুমিই পুরুষবেশ্যা।’

একে একে অভির প্রতিটি প্রেম-লীলার প্রমাণসহ বলতে থাকল জুঁই। অস্বীকার করার কোনো অপশন না থাকায় চুপ করেই ছিল অভি। সব শেষে জুঁই বলল, ‘তোমার কাছে আমার কোনো দাবি নেই, অভিযোগ-অনুযোগ কিছুই নেই। আমার ক্ষতিপূরণের ক্ষমতা তোমার নেই, তো সে-বিষয়ক কথা বলা খুব অমূলক। তবে একটা প্রশ্নের উত্তর তোমায় দিতে হবে।’

জুঁই আষাঢ়ী কণ্ঠে বলল, ‘এক দিনের জন্য বা এক মুহূর্তের জন্যও কি ভালোবাসোনি আমাকে? সবটা, সবটাই কি ছিল শুধু অভিনয়!’

অভি বলতে চাইল, ‘আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মেয়ে তুমি।’

জুঁই করজোড়ে বলল, ‘প্লিজ, চুপ করো অভি। আমি তোমার কাছ থেকে কিচ্ছুটি শুনতে চাই না। যদি সম্ভব হয় নীলাকে বিয়ে করবে।’

এক সেকেন্ডও দাঁড়িয়ে না থেকে জুঁই বেরিয়ে গেল গার্ডেন থেকে। এরপর জুঁই অভি বা নীলা কারো সাথেই আর যোগাযোগ করেনি। অভির এমন লাম্পট্য বা প্রতারণায় এক বিন্দু কষ্টও জুঁইয়ের হচ্ছে না। এক বছর অভির সঙ্গে সম্পর্ক, আর এক বছর সম্পর্কে থাকার অভিনয়ের সময় কেউ যদি জানতে চাইতো, কেমন আছ? বলার জন্য, ভালো আছি বললেও নিজেকে মিথ্যাবাদী মনে হতো খুব। এখন খুব সহজেই নিজে কুশলে আছে, বলতে পারে সে।

আট বছর আগের ফেলে-আসা খুচরো পাথরগুলো দুই বছর পাহাড়ের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে জুঁইকে স্ট্যাচু করতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি। জুঁই থেমে থাকেনি। জুঁই পুরুষকে ঘৃণা করে না, তার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষ যেহেতু তার বাবা, শ্রদ্ধায় সব বর্ণ নুয়ে পড়ে ভাইয়ের নামে, সে-ক্ষেত্রে পুরুষকে অসম্মান করার মতো হীন মানসিকতা জুঁইয়ের নেই। সব পুরুষই বেশ্যা নয়, তবে এ সমাজের আনাচ-কানাচে রয়েছে অভির মতো অনেক মুখোশধারী পুরুষবেশ্যা। তবে তাদের চিনতে খুব বেশি দেরি হয়ে যায়, জুঁইয়ের মতো সরলাদের।

আট

জুঁই জীবনের দ্বিতীয় ধাক্কায় আরও পোক্ত করে নিয়েছে নিজেকে। সবটা মনোযোগ তার কাজের প্রতি দিয়ে কম সময়ে পেয়েছে অবিশ্বাস্য সফলতা। সে মানুষকে অসম্মান করে না। আর মানুষ বলতে সে মানুষকেই জানতে চেষ্টা করছে। শুধু মনকে নিরালায় বোঝায়, আর প্রেম থেকে নিরাপদে রাখার চেষ্টা করে নিজেকে।

অপ্রাপ্ত বয়সে যে ভুল সে করেছিল, প্রতিষ্ঠিত অবস্থায়ও সেই ভুলেই পড়েছে সে! তার জন্য হয়তো প্রেম বা সংসার নয়। নীলাকে অভি বিয়ে করেনি। কোন নদীতে সে পাল ওড়াচ্ছে, সে বিষয় কোনো কৌতূহলও জুঁইয়ের নেই।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ