Skip to content

২৩ মে, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার | ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদে নারীর ইচ্ছার মূল্য নেই কেন

বিয়ে-প্রেম-বিচ্ছেদে নারীর ইচ্ছার মূল্য নেই কেন?

প্রবাদ আছে—‘লজ্জা নারীর ভূষণ’। আর এই আচ্ছাদনকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে নারীর জন্য শৃঙ্খল! নারী মানেই রূপে-গুণে স্বরসতী—এমন একটা চিত্র প্রায় সব পুরুষের মনে স্থান করে নিয়েছে। নারীর জীবন নারীর নিজের হতেই পারে না। সেখানে রয়েছে বিস্তর নিয়ম-নীতি-নৈতিকতার বুলি!

নারী কেন তার নিজের বিষয় নিয়ে ভাববে? কেন জীবন সম্পর্কে তার জ্ঞান পুরুষের তুলনায় বেশি হবে! কোনো বিষয়েই নারীর জীবনযাপন তার নিজের ইচ্ছায় হতে পারে না। এমনকি প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রেও নারীর ইচ্ছাকে মূল্য দেয় না সমাজ। নারীর মানসিক শক্তিকে বাল্যকাল থেকেই পঙ্গু করে দেওয়া হয়, যেন নিজের জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে না পারে!

পুরুষতন্ত্রের বানানো রীতি অনুযায়ী, নারী হবে লক্ষ্মীমন্ত-গোবেচারা। তাকে ডানে যেতে বললে ডান দিকেই যেতে হবে, বামে যেতে বললে বাম দিকেই যেতে হবে, এই যখন নিয়ম, তখন সেখানে উচ্চবাচ্য করার সুযোগ নেই! অন্য সেক্টরগুলো বাদ দিলেও একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তেও নারীর অভিমত শূন্যের কোঠায়।

প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদ একজন মানুষের জীবনের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্র সেখানে নারীকে চুপিসারে সব সয়ে যেতে হয়। কিন্তু কেন? যুগের পরিবর্তন হলেও কেন নারীর জীবন এতটা প্রশ্নবিদ্ধ! নারীর ইচ্ছের কোনো মূল্য নেই! এক্ষেত্রে সর্বস্তরে গেঁথে গেছে পুরুষতন্ত্রের আদিপত্য! এই আধিপত্যে যে একমাত্র পুরুষেরই অবস্থান তা নয়, বরং তাদের সঙ্গী একশ্রেণীর নারীরাও! যারা প্রতিনিয়ত নারীর প্রতি বিভিন্নভাবে সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে। কন্যাশিশু জন্মানোর পরই তার মাথায় সফটওয়্যারের মতো একটি নির্দিষ্ট টপিক ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, ‘তুমি মেয়ে। তোমার সববিষয় পারতে নেই, সববিষয়ে কথা বলতে নেই।’ সেখানে নেপথ্যে পুরুষের শোষণ মানসিকতা কাজ করলেও অগ্রবর্তী ভূমিকা পালন করে নারী নিজেই! তারা স্বামী-শ্বশুর-ছেলের কথা শিরোধার্য মনে করে জীবনযাপন করেছেন। তাই তার কোলের ফুটফুটে মেয়েটিকেও সেই গণ্ডির বাইরে বের না করার সব পাঁয়তারা তাদের নিজেদের তৈরি!

আবহমানকাল ধরে চলে আসে পুরুষতন্ত্রের এ জাল ভেদ করে নারীরা নিজেরাও বের হতে পারে না অনেকক্ষেত্রে, তারা চায়ও না। পুরুষতন্ত্রের এই আধিপত্যকে কায়েম করতে একসঙ্গে যুক্ত করা হয় ধর্মীয় বিধিবিধান! যেখানে নারীকে একজন পুরুষের ছত্রচ্ছায়াকে স্বীকার করা হয়! নারীর সব ভালো-মন্দ, বিচার-বিবেচনা পুরুষের হাতে রক্ষিত এই বিষয়ে জোর ফোতায়া দেওয়া হয়! ফলে প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদের মতো সিদ্ধান্তগুলো নারী নেওয়ার ক্ষমতায় রাখে না। প্রেমের ক্ষেত্রে একশোটি প্রেমের প্রস্তাবে একটিতে নারীর দিক প্রথম আগ্রহ বা প্রস্তাব প্রকাশিত হয় এই সংখ্যা হয়তো কদাচিৎ ঘটে! আবার বিয়ের ক্ষেত্রেও নারীর মত ধোপে টেকে না। আর বিচ্ছেদ সে তো আরও বড় ব্যাপার! সেখানে নারী মুখ খুললে পরিবার-পরিজন সমাজের রক্তচক্ষু তাকে তিলেতিলে নিঃশেষ করে দেয়! যদিও বর্তমানযুগে নারীরা অন্যয়ের প্রতিবাদে কিছুটা সরব। সেই সরব হওয়ার পেছনের গল্পটা অনেকটা ভিন্ন!

নারী হয়তো না পেরে নিজের জীবনকে সুরক্ষিত রাখতে বিচ্ছেদের মতো ভয়াবহ ঘটনাকে স্বীকার করে নিচ্ছে। কিন্তু থেকে যাচ্ছে জীবনের পথে কলঙ্কের অমোঘ বোঝা! যা ভেদ করা একজন নারীর একার পক্ষে খুবই কঠিন। করণ এক্ষেত্রে পরিবারের সম্মান-ঐতিহ্য হানির ভয়ে পরিবার নারীর হাতটি অরক্ষিত রেখে মাঝপথে তাকে একা করে চলে যাচ্ছে! নারীর অবস্থান শোচনীয় হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে আরও! সব পরিবারে যে একই নিয়ম-নীতি চর্চা হবে; বিষয়টা এমন নয়। এক্ষেত্রে ভিন্ন ধারাও বিদ্যমান। তবে নিরানব্বইটা পরিবারই আজকের দিনেও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারেনি। নারীকে সেফজোনে না আনার কারণ পুরুষতন্ত্রের আধিপত্য; এরসঙ্গে যথাক্রমে যুক্ত হয়েছে ধর্মীয় বিধিনিষেধ, সমাজপতিদের রক্ষচক্ষু, পারিবারিক সম্মান-ঐতিহ্য হানির আশঙ্কা।

নারীর জীবন বিপন্ন হোক তাতে ক্ষতি নেই। কিন্তু পরিবারের সম্মান রক্ষা করতে হবে। মূলত একজন মানুষের জীবনের চেয়ে কোটিগুণ মূল্যের হয়ে ওঠে পরিবারের সম্মান! তাই তো বিয়ে-প্রেম-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে নারীর মত নৈব নৈব চ! যদি কোনো নারী এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, তবে তাকে বখে যাওয়া সন্তান রূপেই মনে করে পরিবার-সমাজ! একজন পুরুষ চাইলেই নারীকে প্রেম-বিয়ে-বিচ্ছেদের প্রস্তাব দিতে পারে, যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে! কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে সেটা গলার কাঁটা! সহ্য না করতে পারলেও তাকে পরিবার-সমাজের মোল্লা-মাতবরেরা মানিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। আর পুরুষের ক্ষেত্রে যদি ঘটে, তবে সিদ্ধান্তটা উল্টে যায়! এক্ষেত্রে সমাজের প্রচলিত কথা, ‘সোনার আংটি বাঁকাও ভালো’!

শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঘটেছে কিন্তু মানসিক অগ্রগতি কতটা ঘটেছে! সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজও পুরুষতন্ত্রের আধিপত্য। পুরুষের ইগো সবকিছু গুঁড়িয়ে দেয়। নারীর জীবন নারীর ভালো-মন্দ আজও কেন নারীকে গ্রহণ করতে দেওয়া হয় না! নারী কি কোনো মানুষ! নারীর কি বিবেক-মনুষ্যত্ব-সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকতে পারে না! নারী কেন অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে! কেন নিজের যোগ্যতা-দক্ষতা দিয়ে স্বর্গ রচনা করতে পারবে না!

আবার নারীর সঙ্গে যখনই পুরুষ কোনো বিষয়ে পেরে উঠতে পারে না, তখনই তার হাতের একটি অস্ত্রকে সে কাজে লাগায়! নারীর চারিত্রিক স্খলন! নারীকে কলঙ্কিত করে পুরুষের ইগোকে জিতিয়ে দিতে সর্বদা প্রস্তুত থাকে! এভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে নারীর প্রতি অবজ্ঞা! নারীর সব মত-পথ তাই পথের ধুলোর মতোই উবে যায়! সেগুলোর কোনো গ্রহণযোগ্যতা না পরিবারে, না সমাজে থাকে!

কিন্তু নারী তো আমাদের সমাজের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ! তাই নারীর জীবনকে সুরক্ষিত করে তুলতে প্রথমত নারীদেরই আওয়াজ তুলতে হবে। নারীরা যদি নিজেরাই একে অন্যের কাঁধকে শক্ত করে তোলে, তবে সেই সাঁকো দিয়ে পার হয়ে যাবে হাজারো নারী! নারীর জীবনকে শক্তি-সামর্থ্য-যোগ্যতা-দক্ষতায় আত্মশক্তিতে বলীয়ান করতে পারলেই একদিন স্বর্গ রচিত হবে। কেটে যাবে কালো মেঘ, ফুটে উঠবে নিজস্ব আলো। তৈরি হবে নারীর নিজস্ব আলোকবর্ষ!

অনন্যা/এসএএস