ঈদের আনন্দ বাড়াতে ঈদ সালামি
ঈদ মানেই খুশি, ঈদ মানেই আনন্দ। আর সেই আনন্দের অন্যতম বিশেষ অংশ হলো ঈদ সালামি। ছোটদের জন্য এটি ঈদের সবচেয়ে প্রত্যাশিত এবং রোমাঞ্চকর বিষয়গুলোর একটি। ঈদের দিন সকালে নামাজ শেষে বড়দের কাছ থেকে সালামি নেওয়ার আনন্দ যে কতটা বিশেষ তা অনুভব করতে পারে প্রত্যেক শিশু-কিশোর। শুধু ছোটরাই নয়, তরুণ-তরুণী এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও ঈদের সালামি পাওয়ার আনন্দ উপভোগ করেন।
বাংলাদেশে ঈদ সালামির সংস্কৃতি অনেক পুরনো। আগে সালামির পরিমাণ ছিল ছোট। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্কৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেকেই বড় অঙ্কের সালামি দেন। সালামির পরিমাণ যাই হোক না কেন এর পেছনের ভালোবাসা ও আন্তরিকতাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ঈদ সালামির উৎপত্তি নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে ধারণা করা হয় এটি মূলত মুসলিম সমাজে দান-খয়রাত ও উপহারের একটি অংশ হিসেবে শুরু হয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যে ঈদের সময় উপহার দেওয়ার প্রচলন বহুদিনের। এটি ভারতীয় উপমহাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে ঈদ সালামির ধারণা মূলত পারিবারিক ভালোবাসা ও সম্পর্কের প্রতীক। আগে এটি শুধুমাত্র নাতি-নাতনিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন কাজিন, ছোট ভাই-বোন এমনকি বন্ধুদের মধ্যেও সালামি দেওয়ার রীতি গড়ে উঠেছে।
ঈদ সালামি সাধারণত পরিবারের বড়রা ছোটদের দেন। দাদা-দাদী, নানা-নানী, বাবা-মা, চাচা-মামা, খালা-ফুফুরা ছোটদের হাতে কিছু টাকা তুলে দেন। এটি ছোটরা বেশ আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করে। তবে বর্তমানে এই সংস্কৃতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছে। এখন শুধু ছোটরাই নয়, মাঝ বয়সী বা তরুণরাও সালামি পান। বিশেষ করে যারা দূর থেকে বাড়ি আসেন বা অনেকদিন পর পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়।
সালামির পরিমাণ নির্দিষ্ট না হলেও, এটি সাধারণত ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০, ১০০০ এমনকি ৫০০০ টাকা পর্যন্তও হতে পারে বিশেষ করে ধনী পরিবারের ক্ষেত্রে। কেউ কেউ আবার একসঙ্গে নতুন নোটের বান্ডিল নিয়ে ছোটদের মধ্যে বিতরণ করেন, যা ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
ঈদ সালামি শুধু আনন্দের জন্যই নয় এটি অর্থনীতির ওপরও প্রভাব ফেলে। ঈদের সময় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নোট সরবরাহ করে। এই নোটগুলোই সালামির জন্য ব্যবহৃত হয়। ঈদের আগে নতুন টাকার চাহিদা বেড়ে যায়। অনেকে ব্যাংক থেকে নতুন নোট তুলে রাখেন যা পরবর্তীতে বাজারে প্রবাহিত হয়।
এছাড়া, ছোটদের হাতে টাকা আসায় ঈদের দিন তারা বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটা করে। এটি স্থানীয় ব্যবসার জন্য ইতিবাচক। ছোটরা সাধারণত চকলেট, খেলনা, বেলুন, আইসক্রিম, কসমেটিকস ইত্যাদি কিনতে ভালোবাসে। ফলে ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি আয় সৃষ্টি হয়।
ছোটদের জন্য ঈদের সালামি পাওয়া মানে হলো এক রকম স্বাধীনতা। সারা বছর বাবা-মার কাছ থেকে টাকা নিতে দ্বিধা থাকলেও ঈদ সালামির ক্ষেত্রে কোনো বাধা থাকে না। ঈদের দিন ছোটরা তাদের প্রাপ্ত সালামির টাকায় মনের মতো কিছু কিনতে পারে।
অনেক শিশু তাদের সালামির টাকা দিয়ে নতুন খেলনা বা জামাকাপড় কেনে, ঘুরতে যাওয়ার জন্য জমায়, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মিষ্টি বা খাবার ভাগ করে নেয়। অনেক বাবা-মা আবার ছোটদের শিখিয়ে দেন কিভাবে সালামির টাকা সঞ্চয় করতে হয়। এটি তাদের ভবিষ্যতের জন্য ভালো শিক্ষা হতে পারে।
প্রতিটি পরিবারের ঈদ সালামির গল্প আলাদা এবং মজাদার। অনেক সময় দেখা যায়, শিশুরা আগেভাগেই হিসাব করে রাখে যে কোন মামা বা চাচা কত টাকা সালামি দিতে পারেন! কেউ কেউ ঈদের নতুন জামার পকেটেই সালামির টাকা জমাতে থাকে, আবার কেউ কেউ খেলার মধ্যে দিয়ে সালামির অর্থ খরচ করে ফেলে।
একটি মজার বিষয় হলো, ঈদ সালামির বেলায় দর-কষাকষির একটা ছোটখাটো সংস্কৃতি আছে। ছোটরা প্রায়ই বলেন— “১০০ টাকা দিলে হবে না, কমপক্ষে ৫০০ টাকা লাগবে!” এতে অনেক বড়রা হাসিমুখেই বাড়তি কিছু টাকা দিয়ে দেন। আর ছোটরা খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়।
আগে সালামি শুধু নগদ টাকাতেই দেওয়া হতো, কিন্তু বর্তমানে ডিজিটাল লেনদেনের জনপ্রিয়তা বাড়ায় অনেকে মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ওয়ালেটের মাধ্যমে সালামি পাঠাচ্ছেন। বিশেষ করে বিদেশে থাকা আত্মীয়রা বিকাশ, নগদ, রকেট বা ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে দেশে থাকা স্বজনদের ঈদ সালামি পাঠাচ্ছেন।
এতে একদিকে যেমন সহজেই সালামি পৌঁছে দেওয়া যায়, অন্যদিকে নিরাপদ লেনদেনের সুবিধাও পাওয়া যায়। তবে এখনো নগদ টাকা দিয়ে সালামি দেওয়ার আনন্দটাই সবার কাছে বেশি প্রিয়।
ঈদ সালামি শুধু টাকা দেওয়ার ব্যাপার নয় এটি ভালোবাসা প্রকাশের একটি মাধ্যম। এটি পারিবারিক বন্ধনকে দৃঢ় করে এবং সম্পর্কের উষ্ণতা বৃদ্ধি করে। বড়রা ছোটদের প্রতি যত্ন ও স্নেহ প্রকাশের একটি উপায় হিসেবে এটি ব্যবহার করেন।
এছাড়া, অনেকেই ঈদের দিনে গরিব ও দুস্থ শিশুদের সালামি দেন। এতে সমাজে সমান আনন্দ ছড়িয়ে দেয়। এই উদ্যোগ ঈদের খুশিকে আরও অর্থবহ করে তোলে।
ঈদ সালামি হলো ঈদের আনন্দের অন্যতম সেরা অংশ। এটি প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। এটি ভালোবাসা, আনন্দ ও পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
ঈদের দিনে সালামি পেয়ে ছোটদের মুখে যে উজ্জ্বল হাসি ফুটে ওঠে, সেটিই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য। তাই ঈদের উৎসবের অনিবার্য আনন্দের অংশ হল সালামি।