চাঁদরাতে ঘরে ঘরে মেহেদি উৎসব

ঈদ মানেই সাজগোজ, আনন্দ আর উৎসবের আমেজ। আর ঈদের সাজের অন্যতম অনুষঙ্গ হলো মেহেদি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মেয়েরা ঈদের আগের রাতেই হাতে মেহেদি লাগিয়ে পরিপূর্ণ ঈদের প্রস্তুতি নেয়। ছোট-বড়, তরুণ-তরুণী, এমনকি অনেক বয়স্ক নারীরাও এই বিশেষ দিনে মেহেদি পরতে ভালোবাসেন। শুধু মেয়েরাই নয় এখন ছেলেদের মাঝেও হালকা মেহেদির ট্রেন্ড দেখা যায়।
ঈদের আগের রাত, যাকে আমরা ‘চাঁদ রাত’ বলি, সে রাত যেন মেহেদির রঙ ছাড়া অসম্পূর্ণ। কিশোরী থেকে শুরু করে গৃহবধূ, কর্মজীবী নারী থেকে শিক্ষার্থী সবাই এই রাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন হাতে মেহেদির নকশা ফুটিয়ে তুলতে।
ঈদের মেহেদি – একটি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি
বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে মেহেদি পরার প্রচলন বহু বছর ধরে চলে আসছে। আগে বিয়েশাদির মতো বড় উৎসবেই মেহেদির প্রচলন বেশি ছিল। তবে এখন ঈদসহ অন্যান্য আনন্দের দিনগুলোতেও এটি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
মেহেদির ব্যবহারের পেছনে রয়েছে কিছু বিশ্বাস ও ঐতিহ্য। বলা হয়, মেহেদির গাঢ় রং সৌভাগ্যের প্রতীক। অনেকে মনে করেন মেহেদির রং যত গাঢ় হয় ততই তা সৌভাগ্য ও সুখের ইঙ্গিত দেয়। এ কারণে ঈদের দিনে সুন্দরভাবে মেহেদি লাগানোর আগ্রহ সবসময়ই থাকে।
সময় বদলেছে, বদলেছে মেহেদির নকশাও। আগে সাধারণ গোল নকশা ও পাতার নকশার প্রচলন বেশি থাকলেও এখন আধুনিক ডিজাইনের প্রতি ঝোঁক বেড়েছে। এবারের ঈদের মেহেদির কিছু জনপ্রিয় ট্রেন্ড সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
অ্যারাবিক মেহেদি
অ্যারাবিক মেহেদির ডিজাইন এখন বেশ জনপ্রিয়। এতে সাধারণত হাতের তালু ও আঙুলের দিকে ফ্লোরাল ও পাতা ডিজাইন করা হয়। এর নকশা বেশ খোলামেলা ও স্পষ্ট হয়। তাই অনেকের কাছেই এটি আকর্ষণীয় লাগে।
ইন্ডিয়ান স্টাইল মেহেদি
এই ডিজাইনগুলো বেশ জটিল ও সূক্ষ্ম নকশার সমন্বয়ে তৈরি হয়। হাতের প্রায় পুরো অংশ জুড়েই থাকে দারুণ সব কারুকাজ। কেউ কেউ এতে নববধূদের মতো হাত ভরে মেহেদি পরেন। এটি দেখতে বেশ সুন্দর লাগে।
মিনিমালিস্ট মেহেদি
এখন অনেকেই খুব বেশি জটিল ডিজাইন পছন্দ করেন না। তাই সহজ ও ছোট ছোট নকশার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। হাতে শুধু আঙুলের দিকে পাতার নকশা বা সামান্য কিছু রেখা দিয়ে নকশা করাই মিনিমালিস্ট মেহেদির বৈশিষ্ট্য। যারা খুব বেশি ঝামেলা পছন্দ করেন না তারা এই ডিজাইনকেই বেশি পছন্দ করেন।
গ্লিটার ও কালারড মেহেদি
এখন গাঢ় রঙের পাশাপাশি গ্লিটার ও রঙিন মেহেদিরও চল এসেছে। সোনালি, রুপালি কিংবা নীল রঙের গ্লিটার মেহেদি তরুণীদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। বিশেষ করে যারা ফ্যাশনেবল লুক চান তারা এই ধরনের মেহেদি পরতে পছন্দ করেন।
ঈদের আগে মেহেদি কেনার ধুম পড়ে যায় সারা দেশেই। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন শহরের বাজারে পাওয়া যায় নানা ধরনের মেহেদি।
এখন বাজারে দুই ধরনের মেহেদি পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক বা হ্যান্ডমেড মেহেদি যা খাঁটি মেহেদি পাতা থেকে তৈরি। এটি হাতে বসতে একটু সময় নেয় তবে ক্ষতিকর নয়। কেমিক্যাল মেহেদি যা দ্রুত রং ধরে, কিন্তু ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অনেকেই এখন স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে প্রাকৃতিক মেহেদির দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষ করে অনেকে ঘরেই মেহেদি বেটে ব্যবহার করেন। এটি নিরাপদ ও প্রাকৃতিকভাবে দীর্ঘস্থায়ী হয়।
ঈদের আগের রাত অর্থাৎ চাঁদ রাতের সঙ্গে মেহেদির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। মেয়েরা দল বেঁধে মেহেদি লাগাতে বসে, গল্প-আড্ডায় রাত পার করে দেয়। অনেক জায়গায় এখন চাঁদ রাত উপলক্ষে বিশেষ মেহেদি উৎসবের আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনে পেশাদার মেহেদি ডিজাইনাররা নানা ধরনের নকশা একে দেন।
শপিংমল, পার্লার এবং বিভিন্ন স্ট্রিট মার্কেটে চাঁদ রাতের সময় মেহেদি পরানোর স্টল বসে। ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মেহেদি ডিজাইনের দাম হয়ে থাকে। বিশেষ করে গুলশান, বসুন্ধরা, নিউ মার্কেট, চকবাজার, চট্টগ্রামের রেয়াজউদ্দিন বাজার, সিলেটের লালা বাজারসহ বড় শহরগুলোতে এসব স্টল বেশ জনপ্রিয়।
বাংলাদেশের গ্রাম কিংবা শহর, যেকোনো জায়গাতেই ঈদের দিনে মেয়েদের হাতে মেহেদির সৌন্দর্য লক্ষ করা যায়। চাঁদ রাতের এই উৎসবের মধ্য দিয়ে ঈদের আমেজ আরও রঙিন হয়ে ওঠে।
ঈদ মানেই উৎসব, আর এই উৎসবে মেহেদির রং যেন ঈদের আনন্দকে আরও গাঢ় করে তোলে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও সমান জনপ্রিয়। ঈদের মেহেদির রঙে রাঙিয়ে উঠুক সবার হাত, হৃদয় ও ঈদের আনন্দ!