Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

হিউজ মেডেলে ভূষিত একমাত্র নারী হার্থা আয়ারটন

মেরি ক্যুরিকে চেনেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার সমসাময়িক অনেক নারীকেই তিনি নিজের অর্জন দিয়ে ম্লান করে দিয়েছিলেন। তবে ওই সময় অনেক নারীই ছিলেন, যারা তাদের নিজ যোগ্যতায় বিজ্ঞানের দুয়ারে অনন্য নজির স্থাপন করছিলেন। মেরি ক্যুরির প্রিয় বান্ধবী হার্থা আয়ারটন ঠিক এমনই একজন বিজ্ঞানী।

মূলত তিনি একজন গণিতবিদ ও নারী অধিকার আদায়ের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। এই নারী অর্জন করেছিলেন প্রথম হিউজ মেডেল। তবু, তাকে লন্ডন রয়্যাল সোসাইটি সদস্যপদ দেয়নি নারী হওয়ার কারণে। কিন্তু প্রতিভাকে দাবিয়ে রাখা এত সহজ নয়। আয়ারটনকেও দমিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। একসময় রয়্যাল সোসাইটি তাকে প্রথম নারী সদস্য হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।

১৮৫৪ সালে হার্থার জন্ম। বাবা একজন পোলিশ ঘড়ি প্রস্তুতকারক। জন্মের পর তার নাম রাখা হয় ফোবে সারাহ মার্কস। যেহেতু বাবা নিজে ঘড়ি নিয়ে কাজ করতেন, সেহেতু মেয়েও ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করার আগ্রহ পেতে শুরু করে। সেই অল্প বয়স থেকেই পরিবারের সবাই তাকে জিনিয়াস বলে ডাকতো। কারণ, হার্থাও ঘরের অনেক জিনিসপত্র পেলেই ঠিক করার চেষ্টা করতেন।

সুখী এক পরিবার। হাসিঠাট্টা আর স্বপ্নবোনা পরিবারটিকে ছায়া দিয়ে রেখেছেন বাবা। মার্থার বয়স যখন সাত, তখন বাবা মারা যান। আট সন্তান দিয়ে এবার পথে বসার অবস্থা মার্থার মায়ের। মার্থার মা মেয়ের মেধা ঠিকই ধরতে পেরেছিলেন। লন্ডনে তার বোন একটি স্কুল পরিচালনা করতেন। মার্থাকে সেই স্কুলে পড়তে পাঠানো হলো। সেখানেই মার্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গণিত, ল্যাটিন, ফ্রেঞ্চ, সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করেন।

আসলে ওই স্কুলে তাকে গভর্নেস হওয়ার জন্যেই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছিল। বাড়িতে টাকা পাঠাতে তো হবেই। ষোল বছর বয়সেই তাই তাকে বাধ্য হয়ে গভর্নেসের কাজ নিতে হয়। হয়তো জীবনটা এভাবেই সাদামাটাভাবে কেটে যেতো।

এই ব্যতিব্যস্ত সময়েই মার্থার সঙ্গে মাদাম বারবারা বদিচনের দেখা হয়। মাদাম সে সময়কার বিখ্যাত শিক্ষাবিদ, শিল্পী। তারচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ক্যাম্ব্রিজের গিরটন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা। বদিচনের সাহায্যেই হার্থাকে গিরটনে গণিত বিভাগে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়। এই কলেজে পড়ার সময় আলগারনন সুইয়াইনবার্নের কবিতা থেকে তাকে হার্থা নামটি দেওয়া হয়। ঠিক কেন এই নামটি তাকে দেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।

কলেজে পড়ার সময় মাদাম বদিচনের সাহায্য পেয়েছেন বহুবার। বদিচনের সাহায্যেই বেশ ক’টি আবিষ্কারের প্যাটেন্ট বানিয়ে ফেলেন। এরমধ্যে একটি ছিল লাইন ডিভাইডার। এই যন্ত্রটি আর্টিস্টরা দুটি নিখুঁত এবং সমান লাইন আঁকতে পারতো। এছাড়া একজনের পালস পরিমাপের জন্যে সাইমোগ্রাফ নামে একটি যন্ত্রের প্যাটেন্ট আবিষ্কার করেন।

কলেজ শেষে হার্থা গণিত শেখানোর কাজ নেন। ফিনসবারি টেকনিক্যাল কলেজে রাতে ছাত্রদের গণিত দেখাতেন। পরের বছর ওই কলেজের ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর উইলিয়ান আয়ারটনকে বিয়ে করেন। এই বিয়েটিকে অনেকেই ভালো চোখে দেখেনি। কিন্তু মার্থার উদ্ভাবন ও আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ইনিই সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী হয়েছিলেন।

উইলিয়াম তার স্ত্রীর গুণমুগ্ধ এক ভক্ত ছিলেন। প্রায়ই তার বন্ধুদের বলতেন, ‘তুমি আর আমি সাধারণ মানুষ। কিন্তু মার্থা এক জিনিয়াস’। স্বাভাবিকভাবেই, ওই সময় নারীদের ঠিক সমকক্ষ ভাবার মতো পুরুষের সংখ্যা ছিল অনেক কম। উইলিয়ামের সহকর্মীরাও একে ঠিক বউপাগল এক মানুষ বলেই ধরে নিতেন। এদিকে উইলিয়াম তার স্ত্রীর যেকোনো কাজেই উৎসাহ দিতেন। এমনকি নিজ বাড়ির ওপরতলায় মার্থার জন্যে একটি ল্যাবরেটরির ব্যবস্থা করে দেন।

দুজনই একে অন্যের ভাবনা জানাতেন। উইলিয়াম এক্ষেত্রে বেশ সতর্ক থাকতেন। মার্থার কোনো প্রজেক্টে সহজে নিজের নাম জড়াতেন না। এতে করে মার্থার আবিষ্কারের কৃতিত্ব কোনোমতেই ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব না।

এতকিছুর পরও মার্থা তার পরিশ্রমের স্বীকৃতি পাচ্ছিলেন না। সারাজীবন তাকে এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। একবার হতাশায় বলেছিলেন, ‘সামান্য ভুলই ভীষণ পীড়া দেয়। কিন্তু একজন নারীর করা ভুল একজন পুরুষের সামনে আরও বিশাল হয়ে ধরা পড়ে। ভাগ্যিস মেয়েদের কাজ বিড়ালের জীবনের মতো।’

১৮৯৩ সালে উইলিয়ামের কাছ থেকে হার্থা একটি প্রজেক্ট পান। মূলত ইলেকট্রিক তারের বাঁক থেকে এক ধরনের অদ্ভুত এবং বিরক্তিকর হিস হিস শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। লন্ডনের রাস্তার পাশের বাতিগুলোতে বিদ্যুৎ প্রবাহের জন্যে এই তারগুলোই ব্যবহার করা হয়। ল্যাম্পের ভেতর দুটো কার্বন রড ছিল। এই দুই রডের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করলে আলো জ্বলে ওঠে।

কিন্তু বিদ্যুৎ প্রবাহ শুরু হতেই এক বিরক্তিকর হিস হিস শব্দ পাওয়া যায়। হার্থাই সর্বপ্রথম আবিষ্কার করেন কার্বন ইলেকট্রোডের অক্সিডেশনের ফলে এই হিস হিস শব্দ হয়। যদি পুরো বাল্বটাকেই এমনভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়, যেন কোনো বাতাস ভেতরে প্রবেশ না করে, তাহলেই এই শব্দ দূর করা যাবে।

এই চমৎকার বিষয়টি আবিষ্কার করায় সমসাময়িক অনেকেরই প্রশংসা কুড়োন হার্থা। ১৮৯৯ সালে তিনিই প্রথম নারী হিসেবে ইনস্টিটিউশন অব ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারে একটি পেপার সাবমিট করেন। তিনিই এই ইনস্টিটিউশনের প্রথম নারী সদস্য। এরপর লন্ডনের ইনটারন্যাশনাল কংগ্রেস অব উইম্যান এবং প্যারিসে ইলেকট্রিক্যাল কংগ্রেসে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। নিজেকে প্রতিটি জায়গায় এভাবে তুলে ধরার কারণে ব্রিটিশ অ্যাসোসিয়েশন বুঝতে পারলো, বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে নারীদের যোগ করাতে হবে।

সাফল্য ধরা দিচ্ছে। তবু, বাধাবিঘ্নের অভাব নেই। ১৯০১ সালেই হার্থার পক্ষ থেকে এক পুরুষ রয়্যাল সোসাইটিতে ইলেকট্রিক আর্কের পেপার সাবমিট করেন। তখন রয়্যাল সোসাইটিতে নারীদের সদস্যপদ পাওয়ার সুযোগ ছিল না। তাই একজন পুরুষকেই সে কাজ করতে হলো। ১৯০২ সালে তার নাম তুলে আনা হলেও তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। কেন? সামান্য একটি কারণ। বিবাহিত নারীদের এখানে সদস্যপদ দেওয়ার নিয়ম নেই।

১৯০৬ সালেও তারা একগুঁয়ে এই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। তখন হার্থা শক্তিক্ষেত্র নিয়ে কাজ করায় হিউজ মেডেল পান। তিনিই ইতিহাসের সর্বপ্রথম নারী, যাকে এই পদক দেয়া হয়েছে।

এভাবে এমন সম্মানজনক সায়েন্টিফিক সোসাইটির সদস্যপদ না পাওয়াটা কষ্টকর। একই সময়ে মাদাম ক্যুরিকে অ্যাকাডেমি দে সায়েন্সে সে সদস্যপদ দেওয়া হয়নি। এ সময় হার্থাই ম্যারি ক্যুরিকে একটি চিঠি লিখে জানান, ‘বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের ক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য দূর করতে হবে।’

দুজনের মধ্যে নিবিড় এক বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। তারা হ্যাম্পশায়ার উপকূলে দেখা করেন। এখানেই তিনি রিপল মার্কসের উদ্ভাবন করেন। হাস্যকর বিষয় হলো, এই পেপারটি রয়্যাল সোসাইটি প্রকাশ করে। কিন্তু উদ্ভাবনটির সম্মাননা হার্থার স্বামীকে দেওয়া হয়। আয়ারটন ১৯০৮ সালেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। একজন মৃত মানুষকে সম্মান দেওয়া যায় কিন্তু একজন নারীকে কোনোভাবেই না।

পরবর্তী সময়ে হার্থা আয়ারটন ফ্যান আবিষ্কার করেন। এই ফ্যান যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বিষাক্ত গ্যাস দূর করতে সাহায্য করে। প্রথমে অবশ্য অনেকেই সামান্য এক ফ্যান ব্যবহার করতে রাজি হয়নি। তবে বেশ কয়েকবার ব্যবহারেই উপকার মিললো। অবশেষে এক লক্ষ চার হাজার ফ্যান উৎপাদন করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। হার্থা তার বাকি জীবন ওয়েব থিওরিতে কাটিয়ে দেন। কিভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে জঘন্য গ্যাস দূর করা সম্ভব, তা নিয়েই ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠেন।

এছাড়া সাফ্রাজিস্ট আন্দোলনেও তার ব্যাপক ভূমিকা আছে। সর্বোপরি হার্থার মেধা সমগ্র পৃথিবীকে এগিয়ে নিয়ে গেছে বহু বছর। অন্তত রয়াল সোসাইটিতে নারী সদস্যপদ প্রাপ্তির বিষয়টি উঠে আসার পর থেকে আরও ৪১ বছর কেটে যাবে। কিন্তু হার্থার অবদান বিজ্ঞানের জগতে কেউ সহজে ভুলতে পারবেন না।

অনন্যা/এআই