কিশোরীদের জন্য ফেসবুক-টিকটকে ‘প্রেমের ফাঁদ’ দুশ্চিন্তায় অভিভাবকেরা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনে অনেক সুবিধা এনে দিয়েছে। তবে এর নেতিবাচক দিকগুলো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে অনেক ক্ষতির সম্মুখীনও করতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে ফেসবুক, টিকটক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে কিশোরীদের ‘প্রেমের ফাঁদে’ ফেলার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব, প্রেমের নামে প্রতারণা, মানসিক চাপ, এমনকি ব্ল্যাকমেইলিং পর্যন্ত এর বিস্তৃতি।

প্রেমের ফাঁদে কিশোরীর করুণ পরিণতির ঘটনা
ঢাকার মিরপুরের ১৬ বছর বয়সী মেয়ে রাফিয়া (ছদ্মনাম) ফেসবুকে এক যুবকের সঙ্গে পরিচিত হয়। যুবকটি নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দেয় এবং ধীরে ধীরে রাফিয়ার সাথে ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলে। প্রতিদিনের কথাবার্তা, ভালোবাসার মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং কৌশলী কথা বলার মাধ্যমে মেয়েটিকে প্রেমে ফেলে সে।
কয়েক সপ্তাহ পর যুবকটি রাফিয়াকে দেখা করার জন্য অনুরোধ করে। প্রেমের মোহে আচ্ছন্ন হয়ে সে দেখা করতে রাজি হয়। এসময়ে যুবকটি কৌশলে তাদের কিছু অন্তরঙ্গ ছবি তুলে রাখে। প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও কিছুদিন পর যুবকটি তাদের অন্তরঙ্গ কিছু ছবি ও কথোপকথনের স্ক্রিনশট ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করতে শুরু করে। সে চাপ প্রয়োগ করে অর্থ দাবি করে এবং অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর হুমকি দেয়।
রাফিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং আত্মহত্যার কথা চিন্তা করতে শুরু করে। সৌভাগ্যক্রমে তার মা তার আচরণের পরিবর্তন দেখে বুঝতে পারেন তার পরিস্থিতি। তখন তিনি দ্রুত পদক্ষেপ নেন। রাফিয়ার পরিবার পুলিশের সহায়তার জন্য অভিযোগ দায়ের করে এবং তদন্তের পর দেখা যায়, যুবকটি একজন প্রতারক যে আগে বহু মেয়েকে একইভাবে প্রতারিত করেছে।
যেভাবে কিশোরীরা প্রেমের ফাঁদে পড়ে?
অনেক কিশোরী পারিবারিক ভালোবাসা ও স্নেহ না পেলে সামাজিক মাধ্যমে কাউকে খুঁজে নিতে চায়, যে তাকে গুরুত্ব দেবে। অনেক সময় কিশোরীরা বুঝতে পারে না যে অপরিচিত ব্যক্তিরা তাদের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারে। প্রেমের নামে অনেক মেয়েই নিজের গোপন তথ্য শেয়ার করে ফেলে যা পরে তাদের বিপদে ফেলে। টিকটক বা ফেসবুকে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য অনেকে অপরিচিতদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে যা বিপদের কারণ হতে পারে।

অভিভাবকদের করণীয়
এই ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধে অভিভাবকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।শিশুরা যেন ভয় না পায় বা লুকিয়ে কিছু না করে সেজন্য তাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। তারা যেন যেকোনো সমস্যায় প্রথমেই অভিভাবকের কাছে আসে সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
শিশুরা কীভাবে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে, কার সঙ্গে কথা বলছে তা মনিটর করা জরুরি। তবে এটি যেন নজরদারির নামে কড়া শাসনে পরিণত না হয়। প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে বসে সোশ্যাল মিডিয়ার নিরাপত্তা সেটিংস দেখানো যেতে পারে।
কিশোরীদের শেখাতে হবে যে, কোনো অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিগত তথ্য বা ছবি শেয়ার করা বিপজ্জনক। তাদেরকে অনলাইনে নিরাপত্তা, গোপনীয়তা ও ডাটা সুরক্ষার বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে।
যদি দেখেন, আপনার সন্তান হঠাৎ করে অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার করছে, নির্জনে ফোনে কথা বলছে, হতাশাগ্রস্ত বা চাপগ্রস্ত মনে হচ্ছে তাহলে তার সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
প্যারেন্টাল কন্ট্রোল সফটওয়্যার ব্যবহার করে অনলাইনে কী ধরনের কনটেন্ট তারা দেখছে তা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
শুধু পরিবার নয়, স্কুল ও সমাজেরও উচিত কিশোরীদের সাইবার অপরাধ সম্পর্কে সচেতন করা। বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মশালা আয়োজন করা যেতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অপব্যবহার কিশোরীদের জন্য ভয়াবহ পরিণতি আনতে পারে। প্রেমের নামে প্রতারণার ঘটনা প্রতিদিন বাড়ছে যা অভিভাবকদের জন্য চিন্তার কারণ। তাই, পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। এটা নিশ্চিত করতে হবে যেন কিশোরীরা প্রতারিত না হয় এবং নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে।