Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীরা কেন প্রতিবাদ করতে চায় না?

নারীরা কেন প্রতিবাদ করতে চায় না?

‘ধর্ষণের প্রতিবাদ করায় ধর্ষিত হলো নারী’ বেশ কয়েকবার চোখের সামনে এসেছে এমন বহু শিরোনাম। প্রতিবাদ করা আমাদের সমাজে মহা বড় অন্যায়। ভিক্টিম ব্লেমিং এর বিষয়তো অহরহ ঘটছে। তার উপর পরিবার, সমাজের বাঁকা চাহুনি। রুদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির শিকার হতে হয় নারীকে৷ আর সেই সাথে যুগের পর যুগ ধরে নারীর মাথায় যে বীজ বপন করা হয়েছে তা উপরে ফেলা কি এতো সহজ?

নারী জন্মের পর যখন থেকে বুঝতে শিখেন, তাকে শেখানো হয় সে দুর্বল, তার উচ্চস্বরে কথা বলা নিষেধ, একা ঘরের বাইরে বের হওয়া নিষেধ, পুরুষের সাথে বাকবিতন্ডায় জড়ানো নিষেধ। এরপর একটু বড় হতে হতে আবার তাকে বোঝানো হয়, তার আসল ঠিকানা শ্বশুর বাড়ি, স্বামী-সন্তানের পরিচয়ই তার পরিচয়, তার নিজের পরিচয় বলতে কিছু নেই। এভাবে ধীরে ধীরে নারীর মস্তিষ্কে যে বীজ বপন করা হয়, তা এতোটা বিস্তৃত হয়ে শেকড় গেড়ে বসে যে নারী তার জীবন চক্রে প্রতিবাদ শব্দটিকে স্থান দিতে ভয় পায়।

তারপর আসে আধুনিক সমাজের এগিয়ে চলার কথা, প্রগতিশীল মানুষদের চিন্তাভাবনার কথা। হ্যাঁ, সমাজ অনেকদূর এগিয়েছে। নারীরাও আজকাল আত্মনির্ভরশীল হচ্ছে, আত্মপরিচয় তৈরির লক্ষ্যে এগিয়ে চলছে। তবে সে পথে আসছে হাজারটা বাঁধা। ঘর থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই নারীর জন্য ওত পেতে থাকে হাজারটা বিপদ। যদিও কিছু ক্ষেত্রে নারী নিজের পরিবারেও নিরাপদ নয়।

নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তা প্রতিনিয়ত প্রচার করা হলেও, নারী বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে তা ‘ওপেন সিক্রেট’ হিসেবে রয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়ে না ভুক্তভোগী নিজে কথা বলবেন না প্রগতিশীল কাউকে কথা বলতে দেখা যায়। আর ভুক্তভোগী নারী প্রতিবাদ করবেন কিভাবে? তাকে শেখানো হয়েছে, উচ্চস্বরে কথা বলা নিষেধ, স্বামীর বিরুদ্ধে আঙুল তোলা নিষেধ। এছাড়াও তিনি দেখতে পাচ্ছেন সমাজের আর পাঁচটি দৃশ্য যেখানে ডিভোর্সের জন্য পুরুষকে কোন দায় দেয়া হয়না, কিন্তু ঘরবন্দী হতে হয় নারীকে, আঙুল তোলা হয় নারীর চরিত্রের দিকে।

তারপর আসুক রাজপথে প্রতিবাদের কথা। কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেসব নারীরা রাজপথে নেমে প্রতিবাদ করবে তাদের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে সমাজ। আজকাল ধর্ষণের শিকার নারীকে করা প্রথম প্রশ্ন , তোমার পরনের পোশাক কেমন ছিলো? অর্থাৎ পোশাক যদি সমাজের কারো মনের মত না হয় তাহলে সে মেয়ে ধর্ষণ হতেই পারে। আরেকটি পরিচিত প্রশ্ন, ‘এতো রাতে মেয়েদের বাইরে কি?’

নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট বলছে বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী কোনো না কোনো সময় যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ জীবনের যেকোনো সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর এসব তালিকায় বাংলাদেশ উপরের দিকে থাকার মর্যাদা লাভ করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।

গত বছর আলোচনায় আসে, ‘যৌন হয়রানির শিকার অভিনেত্রী পরীমনি’। এ ঘটনায় গুটিকয়েক মানুষ ব্যতীত বাকি সবাই দোষারোপ করেন পরীমনিকে। প্রশ্ন উঠে তার পোশাক, পেশা এমনকি চরিত্র নিয়ে। পরীমনির প্রতিবাদী মনোভাব টিকে থাকতে পারেনি দূষিত সমাজের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। গোপালগঞ্জে রাত নয়টার পর ধর্ষণের শিকার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর দিকে আঙুল তোলা হয়, কেন এতো রাত করে বাইরে ছিলো।

আজকাল মৌলবাদীরা আবার ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীদের পায়ে শেকল পরিয়ে দেয়। ধর্মের বিভিন্ন মিথ্যা অনুষঙ্গ ব্যবহার করে নারীদের আওয়াজ রোধ করার চেষ্টায় লিপ্ত একদল পুরুষ। নারী যত ভয়ে ভীত থাকবে, ততই তারা নারীকে পন্য হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। বেশিরভাগ নারীরাই হার মানতে বাধ্য হোন সমাজের এসব তথাকথিত ভয়ের কাছে।

মূলত অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় অবস্থার কারণেই নারী প্রতিবাদ করতে ভয় পায়। আর নারীর গায়ে যে ট্যাগ লাগানো হয়, তার কথা কারোই অজানা নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়ম মেনে চললেই তুমি লক্ষ্মী-সরস্বতী। আর অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই নষ্ট মেয়েছেলে। সমাজ যতই আধুনিক হোক না কেন, শুদ্ধ চিন্তাচেতনার, প্রতিবাদী মনোভাবের ১০০ জন নারীর ৯৮ জন নারীই এখনও নিজের গায়ে নষ্ট মেয়েছেলে ট্যাগ লাগাতে নারাজ। তবে দিনশেষে প্রতিবাদ করবে কে?

অনন্যা/এসএএস