Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

যৌতুকের বলি তরুণী চিকিৎসক: কোন পথে সমাজ

বাংলাদেশ ও ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশেই যৌতুকের হিংস্রতার শিকার হচ্ছে নারী। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার শর্ত স্বরূপ কন্যার পরিবারের কাছে দাবি করা হয় মোটা অঙ্কের টাকা, আসবাবপত্র, স্বর্ণালংকারের মতো বিবিধ জিনিস! যার ভার বইতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয় অধিকাংশ পরিবারকে। কখনো-কখনো তার ফল যে খুবই ভয়াবহ হতে পারে, তা চিকিৎসক তরুণী জীবন দিয়ে বুঝিয়ে গেছেন!

যৌতুক এক ধরনের সামাজিক অবক্ষয়। নারী নির্যাতনের একটি বিশেষ মাধ্যম এই যৌতুক। সময়ের সঙ্গে মানুষ আধুনিক হলেও তাদের মস্তিষ্কের অন্ধকার দূরীভূত হয়নি। যার ফল এ সমাজ আজও ভোগ করে যাচ্ছে। বর্তমানে আবারও যৌতুকের কালো ছায়া সমাজে বেশ আসন গেঁড়ে বসেছে। একসময় সামাজিক এই অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে নানাবিধ প্রচার-প্রচারণা চলতে থাকে। যার মাধ্যমে গা ঢাকা দেয় এই শ্রেণি। সময়ের সঙ্গে বিনাশ না হয়ে আবারও বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে যৌতুক নামক সামাজিক ব্যাধি।

গণমাধ্যম বরাত জানা যায়, প্রেমের সম্পর্ক বিয়েতে গড়াতে সব প্রস্তুতিই ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত আলাপের আগে প্রেমিকের পরিবারের পক্ষ থেকে যৌতুক হিসেবে চাওয়া হয়, ১৫ একর জমি, ১৫০ ভরি স্বর্ণালংকার ও পাত্রের জন্য একটি বিএমডব্লিউ গাড়ি। এরপরই ঘটল হৃদয়বিদারক ঘটনা।

ভারতের কেরালার এক তরুণীর স্বজন ও প্রতিবেশীদের বরাত দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, পাত্রপক্ষের যৌতুকের দাবি পূরণ করতে না পারায় ওই বিয়ে শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়।

এর প্রতিক্রিয়ায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন পেশায় চিকিৎসক তরুণী।

কেরালার স্থানীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই তরুণীর নাম শাহানা (২৬)। তিনি তিরুবন্তপুরমের সরকারি মেডিকেল কলেজের সার্জারি বিভাগে স্নাতকোত্তর কোর্স করছিলেন। একই এলাকায় মা ও দুই ভাইয়ের সঙ্গে থাকতেন।

সম্প্রতি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে শাহানার লাশ উদ্ধার করা হয়। কক্ষে থাকা একটি চিরকুটে লেখা ছিল, ‘সবাই শুধু টাকা চায়।’ প্রতিবেদনে শাহানার লাশ কবে উদ্ধার হয়েছে তা উল্লেখ করা হয়নি। এতে বলা হয়েছে, আরেক চিকিৎসক রুওয়াইসের সঙ্গে শাহানার প্রেমের সম্পর্ক ছিল।

এক পর্যায়ে তাঁরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। শাহানার পরিবারের অভিযোগ, রুওয়াইসের পরিবার যৌতুক হিসেবে যা দাবি করে তা দেওয়ার সামর্থ তাদের নেই। এ কথা জানালে রুওয়াইসের পরিবার বিয়ে ভেঙে দেয়। এর প্রতিক্রিয়ায় শাহানা আত্মহত্যা করেছেন। 

একসময় যৌতুক প্রথা নিয়ে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা হলেও বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তাহলে বলাই চলে সমাজের এই কুপ্রথা থেকে চিরতরে মুক্তি মিলেছে। কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজও যৌতুক বিদ্যমান তা প্রত্যেকেই জানেন। এটা এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেটের মতো। মুখে ফুটে কেউ বলে, আবার কেউবা চুপচাপ থাকলেও যৌতুক নেওয়ার জন্য প্রেশার সৃষ্টি করেন। এই বিষয়টির আবার বেশ কয়েকটি নামও সমাজে প্রচলিত হয়েছে।

দুজন নারী-পুরুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর মেয়ের পরিবার থেকে উপঢৌকন দেওয়া। মেয়ে জামাইকে খুশি হয়ে মোটরসাইকেল, ঘরের আসবাবপত্র, টাকা-পয়সা দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে দেওয়া, স্বাবলম্বী করার দায়ভার গ্রহণ করার মতো নানারকম ফন্দি-ফিকির সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে উপঢৌকন দেওয়ার নামকরণে শব্দটা পাল্টাতে পারলেও অপরাধটা থেকেই যায়।

তবে এই প্রথা এতটাই মানুষকে ঘিরে রেখেছে যে, পাত্রের পরিবারগুলো এ থেকে কোনমতেই বের হতে পারেননি। এখনও অঞ্চলভেদে কিছু কিছু জায়গায় যৌতুক প্রথার প্রভাব এতটাই বেশি যে সেখানে কন্যা জন্মগ্রহণ করলেই বাবা-মায়ের মাথায় হাত পড়ে। তারা সন্তানকে পরিপূর্ণ মানুষরূপে গড়ে তোলার আগে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা কিভাবে তার কন্যাকে পাত্রস্থ করবেন সে বিষয়ে তটস্থ থাকেন।

ভারতের ঘটনা হলেও আমাদের দেশে তা খুবই প্রাসঙ্গিক আজও। যৌতুক প্রথার রমরমা প্রথার দেখা মেলে বিশেষভাবে উত্তরাঞ্চলে এই প্রথা প্রকট হলেও সারাদেশেই যৌতুকের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। সাধারণভাবে পাত্রের পরিবার ধরেই নেন, তারা যদি যৌতুকের কথা মুখে উচ্চারণ নাও করেন তাও বিয়ের পর মেয়েকে বাপের বাড়ি থেকে টাকা, অলঙ্কার, আসবাবপত্র, দৈনন্দিন ব্যাবহার্য তৈজসপত্র নানাবিধ উপকরণ গৃহে প্রবেশ করবে। প্রকাশ্যে, লুকিয়ে, সমস্যা সৃষ্টি করে, প্রেশার দিয়ে যেমন করেই হোক না কেন সমাজে আজও যৌতুকের রমরমা পসরা সাজিয়ে আছেন পাত্রপক্ষ। নারীরা কবে এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে?

একজন পুত্র সন্তানকে সঠিকভাবে মানুষ করে তোলার জন্য বাবা-মা যতটা সাধনা করেন কন্যার ক্ষেত্রে ঠিক ততটা করেন না। এই বিষয়টিও সবার জানা। তবে এর নেপথ্য কারণ কন্যাটিকে বিয়ে দিতে হবে। একটা বয়সের পর তার পরিবার হবে অন্য কেউ ফলে পিতা-মা অযথা ইনভেস্ট করতে চান না। তারা জানেন কন্যাকে যতই মানুষের মতো মানুষ করুন না কেন, বিয়ের সময় মেয়েকে পার করতে হলে যৌতুক প্রযোজ্য। ফলে তারা কন্যার জন্য যেটা খরচ করতেন সেই অর্থ বা সম্পত্তি জমা করেন।

এতে কন্যার বিয়ের সময় দায়গ্রস্ত পিতার কাঁধে যৌতুকের ভারটা কিছুটা কমে। বিষয়টির সাদামাটা হিসাবে হয়তো পিতার দিকে ঠিক কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয় নারী নিজে। একে তো যৌতুক দেওয়া অন্যায়-অপরাধ। তারওপর একবার দিয়ে পাত্রপক্ষের আকাঙ্ক্ষাটা আরও চতুর্গুণ বাড়িয়ে দেন। ফলে যখনই তারা কোনো সমস্যায় পড়েন বাড়ির বউকে প্রেশার দিতে শুরু করেন। মনে হয় বিয়ে করে পরিবারগুলো স্ত্রী নয় বরং একটা টাকার মেশিন বাড়িতে স্থাপন করেছেন।

যৌতুক দানের ফলে দুজনের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-সম্মান কমে যায়। নারীর দিক থেকে মনের অজান্তেই জন্মে অসম্মানের পাহাড়। কারণ কোনো নারীই চান না তার নিজের পরিবারকে কষ্টে দেখতে। ২০-৩০ বছর যেই বাবা-মা কোলে-পিঠে করে লালন-পালন করেন তাদের ঘরে সিঁদ কেটে অন্যের ঘরে আলো আনতে, কোনো নারীই চান না এটা হলফ করে বলা চলে। তবে আজকের দিনেও নারীরা এবং তার পরিবার বাধ্য হন। বাবা-মা চান না তার সন্তানটিকে কষ্ট, অসম্মানের ভাগী করতে।

ফলে নিজেদের সামর্থ্য থাক বা না থাক তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। আর এর মধ্যে তারা জেনে বা না জেনে আবারও অন্যায় অপরাধকে প্রশ্রয় দেন। আজকের নারীরা বেশ সচেতন। তারা যৌতুককে মন থেকে ঘৃণা করলেও পাত্রপক্ষের খুশি করতে উপঢৌকন দেন। এর মধ্যে নানবিধ উপকরণই থাকে। আগেই বলেছি ওপেন সিক্রেট আজকে যৌতুক প্রথা। নামকরণ পাল্টেছে কিন্তু প্রথা নয়।

আজকাল ডিভোর্সে হার বেড়েছে। বলা হচ্ছে নারীদের স্বাবলম্বী হওয়া, শিক্ষিত হওয়া এর কারণে ডিভোর্সের হার বেড়েছে। তবে নেপথ্য কারণ শারীরিক, মানসিক অত্যাচার। আগের যুগে নারীরা বেশিই মুখ বুজে সহ্য করতো আর এখন এটা কিছুটা কমে এসেছে। নারীদের শিক্ষা-দীক্ষা, কর্মজীবন সবকিছুর বাইরে গিয়ে পাত্রপক্ষের অযাচিত উপঢৌকন রূপ যৌতুক এর একটি কারণ। খুবই লজ্জাজনক হলেও সত্য শিক্ষার হার বেড়েছে কিন্তু সমাজের মাঝে জেঁকে বসা যৌতুক প্রথা থেকে নারীর মুক্তি মেলেনি।

সম্প্রতি যৌতুকের ঘটনা যেভাবে গণমাধ্যমে উঠে আসছে তাতে করে এ সম্পর্কে নাগরিকদের ভাবা প্রয়োজন। নতুন করে এই অনাচার সমাজে গজিয়ে উঠতে দেওয়া উচিত নয়। প্রত্যেকের সচেতন দৃষ্টিই পারে এ ধরনের সমস্যা থেকে জাতিকে মুক্তি দিতে। প্রকৃত শিক্ষায় পারে জনগণকে সচেতন করতে। ক্ষমতার দৌড়ে যেন কোন নারী নির্যাতনকারী পার পেয়ে না যায় সোদিকেও সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। নারীকে রক্ষার জন্য কঠোরভাবে এই সামাজিক ব্যাধি দমন করতে হবে। শুধু আইনের দ্বারা এ ধরনের সহিংসতা বন্ধ করা কষ্টদায়ক। এজন্য জনগণেট সচেতনতার পাশাপাশি আইনের আওতায় আনতে হবে।

নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান বোধ সৃষ্টির জন্য সমূলে যৌতুক প্রথা প্রতিহত করতে হবে। এ ব্যাপারে পরিবারগুলোকে আরও সচেতন হতে হবে। বুঝতে হবে যে বা যারা কন্যার সঙ্গে খুশি হয়ে দেওয়া উপঢৌকন রূপ যৌতুক প্রত্যাশা করেন সেই পরিবারে কন্যার সুখে থাকার সম্ভবনা নেই বললেই চলে। পরবর্তী জীবনে সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আগেই পরিবারগুলোকে সচেতনতা অবলম্বন করতে হবে। আমরাজানি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ