Skip to content

১৬ই মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

যৌতুক কি আবার মহামারীতে রূপ নিচ্ছে?

একসময় যৌতুক প্রথা নিয়ে প্রচুর আলোচনা-সমালোচনা হলেও বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। তাহলে বলাই চলে সমাজের এই কুপ্রথা থেকে চিরতরে মুক্তি মিলেছে। কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে আজও যৌতুক বিদ্যমান তা প্রত্যেকেই জানেন। এটা এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেটের মতো। মুখ ফুটে কেউ বলে, আবার কেউবা চুপচাপ থাকলেও যৌতুক নেওয়ার জন্য প্রেশার সৃষ্টি করেন। এই বিষয়টির আবার বেশ কয়েকটি নামও সমাজে প্রচলিত হয়েছে।

নারী-পুরুষ বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর মেয়ের পরিবার থেকে উপঢৌকন দেওয়া। মেয়ে জামাইকে খুশি হয়ে মোটরসাইকেল, ঘরের আসবাবপত্র, টাকা-পয়সা দিয়ে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করে দেওয়া, স্বাবলম্বী করার দায়ভার গ্রহণ করার মতো নানারকম ফন্দি-ফিকির সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। তবে উপঢৌকন দেওয়ার নামকরণে শব্দটা পাল্টাতে পারলেও অপরাধটা থেকেই যায়।

তবে এই প্রথা এতটাই মানুষকে ঘিরে রেখেছে যে, পাত্রের পরিবারগুলো এ থেকে কোনমতেই বের হতে পারেননি। এখনও অঞ্চলভেদে কিছু কিছু জায়গায় যৌতুক প্রথার প্রভাব এতটাই বেশি যে সেখানে কন্যা জন্মগ্রহণ করলেই বাবা-মায়ের মাথায় হাত পড়ে। তারা সন্তানকে পরিপূর্ণ মানুষরূপে গড়ে তোলার আগে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা কিভাবে তার কন্যাকে পাত্রস্থ করবেন সে বিষয়ে তটস্থ থাকেন। সমাজ যেভাবে ভয়াবহ হয়ে উঠছে সেক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভীতিপ্রবণ হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়!

আমাদের সমাজে বর্তমানে যৌতুক প্রথা আবারও ব্যাপকারে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। যৌতুকের জন্য এ শ্রেণি শুধু চাপ প্রয়োগ নয় বরং জীবননাশও করছে! এ সমাজ এখন হুমকির মুখে! কোথাও নারীর জীবনের নিরাপত্তা নেই। সংসার নামক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-সম্মানের মাধ্যমে। কিন্তু যখন একজন শোষক হয়ে ওঠে সেখানে সংসার নামক আর কিছু বিদ্যমান থাকে না! আমাদের সমাজে বর্তমানে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা অহরহ ঘটছে!

ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে হাবিব নগর এলাকায় ২৬ আগস্ট যৌতুকের দাবিতে স্ত্রী নাবিলাকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করে পালিয়ে যায় তার স্বামী!

গণমাধ্যম বরাত জানা যায়, বুধবার (৩০ আগস্ট) দুপুরে কেরানীগঞ্জের রাজেন্দ্রপুর এলাকায় র‍্যাব-১০ সদর দপ্তরে এডিশনাল ডিআইজি ফরিদ উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, হত্যার ঘটনায় নিহত নাবিলার বাবা টুটুল খান দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করলে মামলার আসামি হিসেবে মাদারীপুরের পুরান বাজার এলাকা থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জীবনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃত জীবন শেখের বরাত দিয়ে র‍্যাব জানায়, জীবন শেখের সঙ্গে নাবিলার দেড় বছর পূর্বে বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকে তারা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানাধীন হাবিব নগর এলাকায় ভাড়া বাড়িতে বসবাস করত।
তাদের দাম্পত্য জীবনে জিহাদ (৮ মাস) নামের পুত্রসন্তান রয়েছে। বিয়ের কয়েক মাস পর থেকে জীবন ব্যবসা করার জন্য নাবিলাকে তার পরিবারের নিকট হতে যৌতুকের জন্য চাপ প্রয়োগ করত। নাবিলা বিষয়টি তার পরিবারকে জানালে, পরিবারের পক্ষ থেকে জীবনকে ব্যবসা করার জন্য ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। তার কয়েকদিন পর জীবন শেখ পুনরায় নাবিলাকে তার পরিবারের কাছ থেকে আরো টাকা নিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন প্রকার চাপ প্রয়োগ করে।

এরপর নাবিলা আরো কোনো টাকা আনতে পারবে না জানালে এ নিয়ে তাদের মধ্যে মনোমালিন্য শুরু হয়। যার ফলে আসামি জীবন শেখ ও ভিকটিম নাবিলার মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো এবং জীবন শেখ নাবিলাকে মারধরও করত বলে জানা যায়। ঘটনার দিন গত শনিবার (২৬ আগস্ট) সকালে ঝগড়া হলে জীবন নাবিলা’কে মারধরের এক পর্যায়ে নাবিলার গলায় ওড়না পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করে, লাশ ঘরের মধ্যে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়।

গ্রেপ্তার জীবন শেখকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

যৌতুকের বলি নাবিলা! একটি সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর দাম্পত্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে পরস্পরের ভালোবাসা-শ্রদ্ধা-সম্মান জরুরি। যেখানে শুধু টাকার লেনদেন বা মনের অমিল সেখানে দাম্পত্য সংকট তৈরি হয়! নাবিলারা এ সমাজে হত্যার শিকার হচ্ছে বারবার। তবু পরিবার-পরিজন তাদের ঘাড়ে বোঝা ভাবতেই নারীকে পাত্রস্থ করে! কিন্তু কার হাতে নিজের আপনজনকে তুলে দিচ্ছে সে-সম্পর্কে যথেষ্ট জানাশোনা থাকে না! এবং বিয়ের সময় অপ্রত্যাশিত কিছু বলে প্রাথমিকভাবে নারীর জীবনে সংকট সৃষ্টি করে!

যৌতুক বা টাকা-পয়সা, ধনদৌলতের লোভ এতটাই প্রবল যাদের মধ্যে এই বৃত্তি কাজ করে তারা কখনও সুপথে আসার নয়। একবার তার চাহিদা পূরণ করলে আবার সংকটে পড়লে বা না পড়লে টাকার মেশিন হিসেবে ভাবতে বসে বউয়ের পরিবার বা শ্বশুরবাড়িকে! ফলে নাবিলাদের সমস্যা থেকে পরিত্রাণ দিতে অত্যন্ত পরিবারের সচেতন হওয়া আবশ্যক।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ