Skip to content

৫ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ২১শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

গ্রিক ভালোবাসার দেবী আফ্রোদিতি

আফ্রোদিতি। গ্রিক পুরাণের সৌন্দর্য ও প্রেমের দেবী। যার সৌন্দর্যে অভিভূত ছিল স্বর্গ মর্ত্য পাতাল এমনকি দেবতা ও মানুষদের মধ্যে যুদ্ধ হতো তাকে পাওয়ার জন্য। রোমান পুরাণে আফ্রোদিতির আরেক নাম ভেনাস৷ সৌন্দর্য ও প্রেমের এক গভীর সংমিশ্রণের অধিকারী ছিল দেবী আফ্রোদিতি। 

হেসিয়ডের ‘THEOGONY’ অনুসারে তাঁর জন্ম সাইপ্রাস দ্বীপের পেফোসের জলের ফেনা থেকে৷ কল্পনা করা হয় তাঁর জন্ম জলের ফেনা থেকে হয়েছে যখন দানব ক্রোনাস তার পিতা ইউরেনাসকে হত্যা করে এবং জননতন্ত্র কেটে সমুদ্রে নিক্ষেপ করে। 

গ্রিক ভাষায় ‘আফ্রোস’ শব্দের অর্থ ‘ফেনা’। সমুদ্রের ফেনা থেকে জন্ম হয়েছিল বলে তাকে আফ্রোদিতি নামে ডাকা হয়। গ্রিক ভাষায় আফ্রোদিতি শব্দের অর্থই হলো ‘সমুদ্রোদ্ভুতা’, মানে যার জন্ম সমুদ্র থেকে হয়েছে। এভাবে সাইথেরার লেডি, সাইপ্রাসের লেডি এবং প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি প্রথম আদিম দেবী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রিক কবি হিসিওড এই মতের পক্ষে। আরেক বিখ্যাত গ্রিক কবি হোমারের মতে, আফ্রোদিতি দেবরাজ জিউস ও দেবী ডিওনের কন্যা। দার্শনিক প্লেটো আফ্রোদিতি সম্পর্কে আরেক তত্ত্ব দেন। তার মতে, দেবালয়ে আফ্রোদিতি নামে দুজনের অস্তিত্ব ছিল। এর একজন ছিল ‘স্বর্গীয় প্রেমের দেবী’, অপরজন ‘দৈহিক প্রেমের দেবী’। 

আবার, হোমারের ‘ইলিয়াড’ অনুসারে আফ্রোদিতি জিউস এবং ডিয়নের কন্যা। এমন অনেক গ্রীক দেবদেবী আছে যাদের উৎপত্তির বহু গল্প পাওয়া যায়। অনেক দেবতারা বিশ্বাস করতো আফ্রোদিতির সৌন্দর্য এতই মোহনীয় ছিল যে দেবতাগন নিজেদের মধ্যে  বিবাদে জড়িয়ে পড়তো তাঁকে নিয়ে। তাঁর সৌন্দর্যের আভা দেবতাদের মধ্যে যুদ্ধের স্ফুলিঙ্গ তৈরি করতো। ঠিক এই কারণেই জিউস আফ্রোদিতিকে বিয়ে দিয়েছিল হেপাইসটাসের সাথে, কারন হেপাইসটাসের কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না তার অসুন্দর মুখাবয়ব ও বিকলাঙ্গতার জন্য৷

হেসিয়ডের বর্ণনানুযায়ী, আফ্রোদিতি হলেন সবচেয়ে প্রাচীন অলিম্পিয়ান। তিনি সমুদ্রকে শান্ত করেন, তৃণভূমিগুলোকে ফুল দিয়ে সতেজ করেন। এমনকি, তার কথায় ঝড় থেমে যায়। বন্য প্রাণীরাও তার বশ্যতা স্বীকার করে। এই কারণেই তার প্রধান প্রতীকগুলো সাধারণত প্রকৃতি থেকে আসা, যার মধ্যে রয়েছে গোলাপ, ঘুঘু, চড়ুই এবং রাজহাঁস। “অলিম্পিয়ান” তাদেরকে বলা হয়, যারা গ্রিক পুরাণের সবচেয়ে প্রভাবশালী দেবতা-দেবী। সমস্ত দেব-দেবীর মধ্যে আফ্রোদিতি সবচেয়ে বেশি কামুক এবং যৌনতায় পরিপূর্ণ। এজন্য অনেক ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মে তাকে নগ্নভাবে দেখানো হয়। লম্বা সোনালি চুলগুলো তার পিঠের নিচে প্রবাহিত হয়। 

আফ্রোদিতি তার নিজের সৌন্দর্য নিয়ে বেশ অহংকারী ছিলোও বটে। অন্য কেউ তার চেয়ে সুন্দর হলে সে হিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতো। সে চাইতো, স্বর্গ মর্ত্য পাতালের সবাই তার রূপের পূজা করুক। সে সময় গ্রীসে এক কন্যাসন্তানের জন্ম হলো, বাবা-মা নাম রাখলেন সাইকি। সে এতোটাই সুন্দর ছিল যে, সাইকির বাবা একদিন বলেই বসলেন, “আমার মেয়ে আফ্রোদিতির চেয়েও সুন্দর” সৌন্দর্যের দেবী এই কথা শুনে চটে উঠলেন। মর্ত্যে পাঠালেন আফ্রোদিতির ছেলে কিউপিড। এ-সেই কিউপিড, যার তীরের আঘাত মানুষকে ভালোবাসতে শেখায়। তো কিউপিড পৃথিবীতে গেলো, সাইকিকে শিক্ষা দিতে। সাইকি সুন্দরী হলেও, তার মন ছিল কাঁচের মতো স্বচ্ছ। সেদিন সাইকি অন্ধ, খোঁড়া মানুষদের খাবার দিচ্ছিলো। আফ্রোদিতির মনে কূটিল ইচ্ছা জাগলো যে, সাইকির মনে ওই অন্ধ-ব্যক্তির প্রতি প্রেম জাগুক। এইজন্য কিউপিডকে পাঠালো। কিন্তু সাইকির রূপ দেখে কিউপিড এতোটাই অভিভূত হয়ে গেলো যে, নিজের তীর নিজের মধ্যেই বিদ্ধ করলো। প্রেমে পাগল হয়ে গেলো সাইকির। এসব দেখে আফ্রোদিতি কিউপিড-সাইকি দুজনকেই অভিশাপ দিলেন। কিউপিড হয়ে গেলো অন্ধ আর সাইকি আত্মহত্যা করলো। এভাবেই আফ্রোদিতি নিজের স্বার্থ হাসিল করার জন্য নানা-রকম কূটকৌশলের আশ্রয় নেয়। 

বলা হয়, ট্রোজানের যুদ্ধ আর ট্রয় নগরী ধ্বংসের কারণেও আফ্রোদিতি পরোক্ষভাবে দায়ী। আবার আফ্রোদিতি নিজের সৌন্দর্যের জালে সবাইকে ফাঁসালেও, নিজেই প্রেমে পড়েছিলেন অ্যাডোনিসের। গ্রীক পুরানে বর্ণিত সবচেয়ে সুন্দর ও আকর্ষণীয় পুরুষ হলেন অ্যাডোনিস। তার সৌন্দর্য এতোটাই বেশি ছিল যে প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি পর্যন্ত তাকে ভালবেসে ফেলেছিলেন। গ্রীক পুরানে বর্ণিত অ্যাডোনিস ও দেবী আফ্রোদিতি এর কাহিনীটি তাই বেশ জনপ্রিয় এবং বিয়োগান্তক ও বটে। সুপুরুষ অ্যাডোনিস এর পরিচয় দেয়া যাক। যদিও এটা কিছুটা বিব্রতকর , তবুও বলতে হয় অ্যাডোনিস ছিল মিরহা এর পুত্র, এবং অ্যাডোনিস এর জন্ম হয়েছিলো একটি পাপ এর পরিণতি হিসেবে। মিরহা ছিল রাজা থিয়াস (আরেক নাম সিনিরাস) এর অনন্য সুন্দরী কুমারী কন্যা। মিরহা এর সৌন্দর্য নিয়ে তার পিতার বেশ গর্ব ছিল। এমনকি তিনি মনে করতেন তার কন্যা সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি এর চেয়েও বেশি সুন্দরী। আফ্রোদিতি অবশ্যই থিয়াস এর এই মনোভাব মেনে নিতে পারেন নি। তাই তিনি কন্যা মিরহা এর অন্তরে তৈরি করে দিলেন তার নিজেরই পিতার জন্য কামনার আগুন, যেটা থেকে শেষ পর্যন্ত মিরহা বের হয়ে আসতে ব্যর্থ হয়। দাসীদের সহযোগিতায় বেশ ছলনার সাহায্যে নিজের পরিচয় গোপন রেখে রাজা থিয়াস এর সাথে মিরহা মিলিত হয়, যার ফলাফল হিসেবে মিরহা এর গর্ভে আসে একটি সন্তান। রাজা থিয়াস যখন বুঝতে পারেন যে যার সাথে তিনি মিলিত হয়েছেন সেটি তার নিজেরই কন্যা তখন তিনি ক্রোধে মত্ত হয়ে পড়েন। তিনি মিরহা কে হত্যা করতে উদ্যত হলেন।হতবিহব্বল মিরহা নিজের বিপদ বুঝতে পেরে পালিয়ে গেলো। সে করজোড়ে দেবতা কুলে প্রার্থনা করলো তাকে যেন অদৃশ্য অথবা লুকিয়ে ফেলা হয়। তার বিপদ দেখে আফ্রোদিতির দয়া হল। তিনি মিরহা কে পালিয়ে যেতে সাহায্য করলেন। তিনি মিরহা কে রূপান্তরিত করলেন একটি গাছে যাতে রাজা থিয়াস থাকে কখনো খুঁজে না পায়। তার নামানুসারে গাছটার নাম হয় পরবর্তীতে মীড় গাছ। নয় মাস পরে গাছের গুড়ি ফেটে সেখান থেকে বের হয়ে আসলো একটি পুত্র সন্তান, যার নাম অ্যাডোনিস। দেবী আফ্রোদিতি ভূমিষ্ঠ অ্যাডোনিস কে দেখলেন এবং তার রূপে তৎক্ষণাৎ মুগ্ধ হলেন। আফ্রোদিতি অ্যাডোনিসকে অন্যভাবে চেয়েছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন অ্যাডোনিস শুধু তারই হোক, তাই তিনি অ্যাডোনিস এর মাতৃভুমিকা নিতে চাইলেন না।

তিনি বরং অ্যাডোনিসকে লুকিয়ে ফেললেন একটি সিন্দুকে এবং নিয়ে গেলেন দেবী পার্সিফোন এর কাছে। পার্সিফোন ছিলেন মৃতদের রানী ও পাতালপুরীর দেবী, তিনি অ্যাডোনিস এর অভিভাবকত্ব নিতে সম্মত হলেন। কিন্তু ঝামেলা তখনই তৈরি হল যখন অ্যাডোনিস বড় হতে লাগলো, এবং আফ্রোদিতি পার্সিফোন এর কাছে অ্যাডোনিসকে দাবী করলেন। পার্সিফোন ও অ্যাডোনিসকে ভালবেসে ফেলেছিলেন এবং অ্যাডোনিসকে দিতে চাইলেন না। দুই দেবীর মাঝে চরম বিদ্বেষ তৈরি হল, এবং কেউই অ্যাডোনিসকে হারাতে চাইলেন না। অবশেষে জিউস আসলেন মধ্যস্ততাকারী হিসেবে। তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে অ্যাডোনিস, বছরের ৪ মাস কাটাবে জিউস এর সাথে, ৪ মাস পাতালপুরির রানী এর সাথে , এবং বাকি ৪ মাস প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি এর সাথে। অ্যাডোনিস কোন এক কারণে আফ্রোদিতিকে বেশ পছন্দ করত, এবং তার সাথে সময় কাটাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করত। প্রায়শই অ্যাডোনিস আফ্রোদিতি এর সাথে লুকোচুরি খেলায় মত্ত হতো, আফ্রোদিতি এর রথ তাড়া করে বেড়াত, এবং আফ্রোদিতি কে অনুসরণ করতো দুর্গম বন বনানীতে। কিন্তু অ্যাডোনিস এর ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল না , অথবা এটাকে আফ্রোদিতি এর ও দুর্ভাগ্য বলা যায় যে একদিন আফ্রোদিতিকে খুঁজতে যেয়ে অ্যাডোনিস এক হিংস্র বন্য শুকর এর সামনে পড়ে। বলা হয়ে থাকে বন্য শুকরটি প্রেরিত হয়েছিলো আরেক শিকারি দেবী আর্টেমিস এর দ্বারা, যদিও আর্টেমিস এটি কেন করেছিলেন তার কারন অজ্ঞাত। আবার অনেকে মনে করেন অ্যাডোনিসের রূপে ঈর্ষান্বিত হয়ে অ্যারেস প্রেরণ করেছিলেন বন্য শুকরটি, কারন অ্যারেস আফ্রোদিতিকে ভালবাসতেন এবং তিনি অ্যাডোনিসের প্রতি আফ্রোদিতির ভালোবাসাকে মেনে নিতে পারেন নি।

বন্য শুকরটিকে অ্যাডোনিস প্রায় কাবু করে ফেলেছিল। এমনকি অ্যাডোনিসের বর্শা শুকরটিকে বেশ ভালো রকম ভাবেই আহত করেছিলো। কিন্তু কোণঠাসা শুকরটা হঠাৎ করেই ছুটে এসে আঘাত করলো অ্যাডোনিসকে এবং তাকে বিদ্ধ করলো তার দীর্ঘ দাতে। রক্তাক্ত অ্যাডোনিস মাটিতে পতিত হল। 
দেবী আফ্রোদিতি তখন বেশ দূরে ছিলেন। তিনি রথে থাকাবস্থাতেই বুঝেছিলেন যে বিপদে পড়েছে অ্যাডোনিস। কিন্তু তিনি যতক্ষণে অ্যাডোনিসকে রক্ষা করতে ছুটে এলেন, ততক্ষনে বেশ দেরী হয়ে গেছে। হাঁটু গেড়ে তিনি বসে পড়লেন অ্যাডোনিসের পাশে। অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে রইলেন তার দিকে। অ্যাডোনিসের ঠোটে এঁকে দিলেন এক দীর্ঘ চুম্বন, কিন্তু তখন অ্যাডোনিসের প্রাণ চলে গিয়েছিলো মর্ত্য থেকে, পড়ে ছিল শুধু অ্যাডোনিসের দেহ খানি।সৌন্দর্যের আর প্রেমের দেবী নিজেও ভোগ করলেন বিচ্ছেদের তীব্র ব্যাথা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস থেকে মুক্তি পেলেন না তিনিও, আপন করতে পারলেন না নিজের প্রেম খানি। অ্যাডোনিস এবং আফ্রোদিতি এর প্রেম কাহিনী তাই মহাকাব্য হয়ে রইলো। প্রাচীন গ্রীসের মেয়েরা প্রতিবছরই পালন করে আসতো অ্যাডোনিস এর জন্য শোকগাঁথা।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ