Skip to content

২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ডিএনএ’র গঠন আবিষ্কারের বঞ্চিত কারিগর রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন

রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন

জীবের সকল বৈশিষ্ট্যের নীল নকশা ডিএনএ। সাধারণ চোখে দেখা না গেলেও এই নকশার অনেক চিত্রই খুঁজে পাওয়া যাবে। দুটি প্যাঁচানো সিঁড়ি দিয়ে নির্মিত খুদে একটি অঙ্গাণু। ১৯৫৩ সালে আবিষ্কৃত এই নকশার মূল কারিগর মার্কিন বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন, ব্রিটিশ বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক ডিএনএ। তাদের ডাবল হেলিক্স এর নকশার স্বীকৃতিস্বরুপ ক্রিক, ওয়াটসন এবং উইলকিনসকে ১৯৬৩ সালে নোবেল পুরষ্কার প্রদান করা হয়।

মানব ইতিহাসের অন্যতম যুগান্তকারী এই আবিষ্কারের নেপথ্যে আরেকজনের নাম আছে। এক ক্ষণজন্মা কিন্তু প্রচণ্ড প্রতিভাবান এক নারী বিজ্ঞানী – রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন। ইতিহাসের বঞ্চনার আরেকটি প্রমাণ রোজালিন্ড। ইতিহাসের পাতায় ডিএনএ এর গঠন আবিষ্কারে তার অবদানের স্বীকৃতিই বহুদিন দেয়া হয়নি।

লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হয়ে তার প্রাপ্য সম্মান কখনই পাননি। বহু বছর সমগ্র পৃথিবীর মানুষ জানতেনই না তার এই অবদানের কথা। অনেকেই তাকে ডার্ক লেডি অব ডিএনএ বলে ডাকেন। তাছাড়া জীববিজ্ঞানের ইতিহাসে তিনিই সবচেয়ে বিতর্কিত নারী। কে এই প্রতিভাবান বিজ্ঞানী? একবার তার জীবনের পাতায় চোখ রেখেই দেখা যাক।

১৯২০ সালের ২৫ জুলাই লন্ডনের নটিংহিল শহরে এক সম্পন্ন ইহুদি পরিবারে রোজালিন্ডের জন্ম। খুব ছোটবেলা থেকেই তার মেধার স্ফুরণ ঘটেছিলো। মাত্র পনেরো বছর বয়সেই তিনি বিজ্ঞানী হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। তখনকার ইংরেজ সমাজের কথা একবার বিবেচনা করা যাক। অভিজাত হলেও ইংরেজ সমাজ ছিলো রক্ষণশীল। তাই উচ্চশিক্ষা এত সহজ ছিলোনা। অভিজাত পরিবারের কোনো মেয়ে খুব জেদি আর দৃঢ় মনোভাবের না হলে কখনই উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করতে পারতো না।

রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন (ডান থেকে দ্বিতীয়)

রোজালিন্ডের বাবা মেয়ের প্রতিভা বুঝতে পেরেছিলেন। তবে তিনিও সমাজের বিরুদ্ধাচরণে রাজি হননি। ধরেই নিলেন মেয়ে সমাজকর্মী হলেই স্বাধীনতা পাবেন। কিন্তু রোজালিন্ড বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতা শুধুমাত্র সমাজের চাহিদায় নির্ধারিত হয়না। শেষ অবধি কেমব্রিজের নিউয়েনহ্যাম কলেজে ফিজিক্স এবং কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়াশোনা করেন।

শুধু পড়াশোনা করেই ক্ষান্ত হননি। পড়ালেখা শেষেই ব্রিটিশ কোল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন-এর অধীনে কয়লার গঠন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এই গবেষণায় তিনি পাঁচটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। অবশেষে ১৯৪৫ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।

বিজ্ঞানের আনন্দ এখানে। আবার নতুন কিছুর সন্ধানে ফিরে যাওয়াই যায়। যেকোনো পদার্থের গঠন ভালোভাবে বিশ্লেষণের জন্যে এক্স-রে ক্রিস্টালোগ্রাফি অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠছিলো। এই পদ্ধতিতে ক্রিস্টালাইন পদার্থের পরমাণুর বিন্যাসটুকুও ভালোভাবে দেখা যায়। এই নতুন বিষয়টিতে বিশেষ দক্ষতা অর্জনের জন্যে ফ্রান্সের এক গবেষণাগারে যোগ দেন।

রোজালিন্ডের এই গবেষণা আস্তে আস্তে তাকে বেশ জনপ্রিয় করে তোলে। একদিকে জৈব অণুর ছবি তোলা আর অন্যদিকে উচ্চ তাপমাত্রায় কার্বনের হঠাৎ গ্রাফাইটে পরিণত হওয়ার কারণ খুঁজে বের করা। এসব কিছুই তাকে অনেক জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।

পড়ালেখা শেষেই ব্রিটিশ কোল রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন-এর অধীনে কয়লার গঠন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন রোজালিন্ড

১৯৫১ সালে লন্ডনের কিংস কলেজে গবেষক পদে যোগ দেয়ার জন্যে আবার লন্ডনে ফিরে আসেন। সেই সময়ে কিংস কলেজের বায়োফিজিক্স বিভাগের প্রধান ছিলেন স্যর জন র‍্যান্ডল। তিনিই রোজালিন্ডকে নিয়োগ দিয়েছিলেন বিশেষভাবে এক্সরে ব্যবহার করে ডিএনএ এর উপর গবেষণা করার জন্যে। মরিল উইলকিন্স ও তখন ডিএনএ নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ধরেই নিলেন রোজালিন্ড তার অধীনস্ত হবেন। কিন্তু রোজালিন্ড যথেষ্ট স্বাধীনচেতা। তিনি কারো ছায়া হয়ে থাকবেন না। কিংস কলেজে একদম শুরু থেকেই এ দুজনের মধ্যে ঠিক বনিবনা হচ্ছিলো না।

যত ঝামেলাই হোক। রোজালিন্ড কিন্তু নিজের কাজ থামালেন না। ডিএনএ এর কেলাসে পরিণত করা এবং এক্সরে এর ব্যবহারে ছবি তোলা তখনকার সময়ে এত সহজ ছিলোনা। রোজালিন্ড অবশ্য এই কাজের জন্যে বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি সূক্ষ্ম তন্তুর মতো ‘কাফ থাইমাস ডিএনএ স্যাম্পল’ ব্যবহার করেন। এছাড়াও নিজের সঞ্চিত বহুদিনের অভিজ্ঞতা থেকে জৈব অণুর পক্ষে উপযুক্ত এক এক্স রে ক্যামেরা বানিয়ে নেন। এই ক্যামেরা ব্যবহারে ছবিও চমৎকার হচ্ছিলো। আলোচনা চক্রে গেলেই তিনি নিজের এই আবিষ্কার সকলকে দেখাতে শুরু করেন।

তখন অবশ্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক ও ডিএনএ-এর গঠন নিয়ে কাজ করছিলেন। এখন ডিএনএ এর গঠন নিয়ে আমাদের একটু ভাবতে হবে। এটি মূলত অতিমাত্রায় লম্বা অণু। এর গঠনে অসংখ্য সুগার এবং ফসফেট অণু পাওয়া যাবে। চার রকম নিউক্ললিওটাইড বেজ জুড়ে পুরো কাঠামোটি।

জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক তাদের ডিএনএ মলিকিউল মডেলের সঙ্গে (১৯৫৩)

ওয়াটসন ও ক্রিক মূলত জটিল গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহারে সুগার ফসফেট বেজগুলো কিভাবে সাজানো থাকে তা বের করার চেষ্টা করছিলেন। আর এই কাজের জন্যে তাদের স্পষ্ট ছবি প্রয়োজন ছিলো যা ওই সময় পাওয়া অনেকটাই অসম্ভব ছিলো।

রোজালিন্ড অবশ্য বুঝতে পেরেছিলেন পানির উপস্থিতির তারতম্যে ডিএনএ দুইরকম রূপে ধরা পড়ে। একে এ আর বি বলে অনেকে আখ্যা দেন। তবে একদম নিশ্চিত না হয়ে তিনি এই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশে রাজি হননি। ১৯৫৩ সালেই ওয়াটসন, কিংস কলেজে আসেন। উইলকিন্স এসময় রোজালিন্ডের তোলা একটি ফটো দেখতে দেন যাকে ভবিষ্যতে ‘ফটোগ্রাফ ৫১’ বলে বিখ্যাত হয়ে ওঠে। এই ছবি দেখেই তিনি চমৎকৃত হয়ে গেলেন। ফেরার পথে যতটা সম্ভব নোটবইতে এঁকে ফেলেন। আর ফিরেই তিনি সকলকে বোঝাবেন দ্বি-সূত্রক গঠনই আসলে ঠিক।

রোজালিন্ডের এই ছবি থেকেই ওয়াটসন তার গবেষণার দরকারি তথ্য খুঁজে পেয়ে যায়। বঞ্চনার শিকার হলেন রোজালিন্ড আরো পরে। তবে সে যাই হোক, লন্ডনের বারবেক কলেজে টোব্যাকো মোজায়িক ভাইরাস নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পোলিও ভাইরাস নিয়েও তার কাজ চলছিলো। সফলতাও আসছিলো। তবে জরায়ুর ক্যান্সারে মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জরায়ুর ক্যান্সারে মাত্র ৩৮ বছর বয়সেই রোজালিন্ড মৃত্যুবরণ করেন

বেঁচে থাকলে হয়তো ওয়াটসন ক্রিকের সাথে তিনি নিজেও নোবেল পেতেন। দুঃখের বিষয় হলো নোবেল পুরষ্কারের বক্তৃতায় ওয়াটসন রোজালিন্ডের নামও নেননি। এমন একটি বিষয় তখন কেউ ই স্বীকার করেননি। নারীর অর্জনের বাঁধা হয়ে অনেককেই দাঁড়াতে দেখা গেছে। আদপে সেই স্বীকৃতিও তারা কোনোদিন দিতে রাজি হয়নি। রোজালিন্ডও তার স্বীকার।

অনন্যা/এআই