Skip to content

২২শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ৯ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

আফগান নারীদের গ্রেপ্তার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠুক

দিন যতই যাচ্ছে, আফগান নারীদের ভাগ্য ততই খারাপের দিকে গড়াচ্ছে। তাদের জীবন হয়ে উঠছে শোচনীয়। ২০২১ সালে তালেবানরা ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আফগানিস্তানের নারীদের ভাগ্যের আকাশে কালো মেঘ ভর করেছে। তালেবানদের একের পর এক নিয়ম-নীতির ফাঁদে জর্জরিত সে দেশের নারীরা। ঘরে অবরুদ্ধ করে রাখতে তালেবান সরকার নারীদের ওপর নানাবিধ বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। আর এর ভিত্তিতে ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠেছে নারী সমাজ। কারণ তালেবান সরকার নারীদের শিক্ষা-দীক্ষা থেকে শুরু করে জীবনযাপনের ওপর নানাবিধ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। নারীরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারবে না এমনকি পার্কেও বেড়ানোর ক্ষেত্রেও এসেছে নিষেধাজ্ঞা। তালেবানদের তোপের মুখে সর্বস্তরের নারী সমাজ বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছে নানা মাধ্যমে। স্বাভাবিকভাবেই এমন বিধিনিষেধ আরোপের ফলে নারীরা আর আগের মতো স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারছে না। এবং পূর্বে তারা যে অবস্থানে ছিল সেখান থেকে দুই বছরেরও অধিক সময় নির্বাসিত হয়েছে। যা এই নারীদের জন্য দুঃখ ও বেদনার।

তালেবান সরকার শুধু নারীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং নারীরা কোনোরকম উচ্চবাচ্য করলেও তাদের ওপর চলছে নিপীড়ন-নির্যাতন। ২৬ মার্চ আফগানিস্তানে একটি বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজন নারী জানান, স্থানীয় সময় রোববার সকালে দেশটির রাজধানী কাবুল থেকে তিনজন নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন ফাতিমা মোহাম্মদী, রোকিয়া সাই এবং মালালাই হাশেমি। মূলত তালেবান সরকারের কট্টরপন্থী মনোভাবের কারণে সেদেশে বর্তমানে নারীরা অনিরাপদ। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে তারা বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সেখানেও তালেবান সরকারের দমন-পীড়ন চলেছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া নারীরা বলেছেন, তারা তালেবানের ‘সহিংসতার’ সম্মুখীন হয়েছেন। এবং সমাবেশের সময় তালেবান তাদের ‘মারধর’ করেছে। কিন্তু তালেবানরা নারীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

গত দুই বছরে নারীদের স্কুল-কলেজ থেকে সরিয়ে দেওয়া মূলত সমাজ থেকেই নারীকে সরিয়ে দেওয়ার পাঁয়তারা। নারীরা যাতে আর মাথা তুলে না দাঁড়তে পারে তালেবান সরকার সে ব্যবস্থায় করে চলেছে মূলত। না হলে নারীদের প্রতি এত আক্রোশ থাকার কারণ কী। কেনোই বা নারীরা এতটা অস্পৃশ্য হয়ে উঠেছে!

যদি আফগান নারীদের হত্যভাগ্য- দুর্দশাকে চিরতরে দূর করতে হয় তবে সংঘবদ্ধ শক্তির কোনোই বিকল্প নেই।

সমাজ গঠনে যেখানে নারী-পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণ থাকা বাঞ্ছনীয় সেখানে তালেবানদের এমন অনৈতিক কাজ বিবেকের প্রশ্ন তোলে। প্রকৃত অর্থে একটি দেশের উন্নয়ন তরান্বিত করতে হলে সেদেশের জনগণকে জনশক্তিতে পরিণত করতে হয়। আর জনশক্তি তখনই পরিপূর্ণ হয় যখন নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যায়। কারণ নারী-পুরুষের পরস্পর সহোযোগিতা ছাড়া কোনো কল্যাণময় কাজ হতে পারে না। যদিও কোনোদিনই আফগান নারীদের কণ্ঠস্বর জোরালো ছিল না। কিন্তু সে যুগ পেরিয়ে এসে মানুষ এখন আধুনিক। তথ্য-প্রযুক্তি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে নিজেদের বারবার নবায়ণ করে চলছে সভ্য মানুষ। যুক্তি-বুদ্ধির দ্বারাই জীবনকে যাপন করতে সচেষ্ট হচ্ছে। সেখানে বরাবরই আফগান নারীরা স্বাধীন জীবনযাপনে ব্যর্থ। তবে তালেবান সরকার আসার পর থেকে তাদের দুর্ভাগ্য আরও প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছে। অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে যখন তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হচ্ছে সেখানেও তালেবানদের হিংস্র পদাঘাতে জর্জরিত নারী সমাজ।

চরম পুরুষতান্ত্রিক দেশ আফগানিস্তান। তালেবান সরকার তো বটেই এমনকি এদেশের বেশিরভাগ পুরুষেরই মত, নারীদের কাজ ঘরে। যখন পশু-পাখি পর্যন্ত পরাধীন জীবনযাপন করতে হাস-ফাঁস করে সেখানে মানুষকে এভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা কতটুকু নীতিসম্মত? সংবাদসংস্থা রয়টার্স জাতিসংঘের একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে জানায়, মাত্র ১৫ শতাংশ আফগান পুরুষ বিশ্বাস করে, বিবাহিতাদের বাইরে গিয়ে কাজ করা উচিত। দুই তৃতীয়াংশের দাবি, আফগান নারীদের একটু বেশিই স্বাধীনতা দেওয়া হয়। দেশের সরকার এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন জনগণের সংখ্যাই যখন অধিক তখন এদেশের নারীদের দুর্দিন কাটাতে কে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে?

ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তালেবান দেশটির নারীদের ওপর যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তা থেকে পরিত্রাণ পেতে যখন নারীরা নিজেরাই রাস্তায় নামছে তখন তালেবান সরকার তাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে। পুলিশ নারীদের গ্রেপ্তার করছে। তালেবানদের এমন মানবতাবিরোধী আচরণকে অপরাধের শামিল বলে উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ। কিন্তু বিশ্বের কার্যকরী পদক্ষেপ না থাকলে তালেবানদের হাত থেকে আফগান নারীদের রক্ষা করা দায় হয়ে পড়বে! আর এর নেতিবাচক ফল পুরো বিশ্বেই প্রভাব ফেলতে সক্ষম। তাই তালেবানদের এমন অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হওয়া জরুরি।

মানবতা এবং নৈতিকতার দিক থেকে হলেও বিশ্ববাসীকে এক হয়ে তালেবানবিরোধী প্রচারণায় অংশ নেওয়া প্রয়োজন। যদি নারীরা মুক্ত না হন তবে ধীরে ধীরে সভ্যতা বিপর্যস্ত হবে। কারণ প্রতিটি সভ্য জাতির প্রধান নিয়ামক স্বাধীন জীবনপ্রণালী। যদি দেশের জনগণ স্বাধীন জীবনযাপনে বাধাগ্রস্ত হয় তবে সুষ্ঠু কোনো নীতিই সেখানে উপস্থিত থাকতে পারে না। কারণ নারীকে বাদ দিয়ে কোন সমাজ গঠিত হয় না। তাই নারীর জীবনযাপনকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। এই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গ- সংগঠনকে একযোগে তালেবান বিরোধী প্রচারণায় অংশ নিতে হবে। যদি আফগান নারীদের হত্যভাগ্য- দুর্দশাকে চিরতরে দূর করতে হয় তবে সংঘবদ্ধ শক্তির কোনোই বিকল্প নেই।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ