Skip to content

২০শে মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | সোমবার | ৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

মাতৃমৃত্যু কমাতে সচেতন হতে হবে

পৃথিবী এখন আধুনিকতার ছোঁয়ায় রাঙালেও নারীর জীবনযাপন সম্পর্কে আজও অনেক ধোঁয়াশা থেকে গেছে। নারীকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। জীবনের স্বাভাবিকযাত্রায়ও নারীকে লুকোচুরি করতে হয় রক্ষণশীলতার কারণে। গর্ভধারণ এবং প্রসবকালীন সময় নারীর কাছে খুবই গর্বের। তবু বিভিন্ন সময়ে অনেক বিষয় অজানা থাকার কারণে নারীরা ঠিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে সক্ষম হোন না। ফলস্বরূপ মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। গত ২০ বছরের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। তারপরও গর্ভাবস্থা বা প্রসবজনিত জটিলতার কারণে প্রতি দুই মিনিটে একজন নারীর মৃত্যু হয়ে থাকে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বৃহস্পতিবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়।

জাতিসংঘ বলেছে, ২০০০ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর এই হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কিন্তু ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে এটি মূলত স্থবির ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে এই হার বেড়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে, গত ২০ বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিক মাতৃমৃত্যুর হার ৩৪.৩ শতাংশ কমেছে। ২০০০ সালে প্রতি ১ লাখ জীবিত শিশু জন্মে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩৩৯ জন। আর ২০২০ সালে একই পরিমাণ জীবিত শিশু জন্মে মাতৃমৃত্যুর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ২২৩ জনে। এরপরও ২০২০ সালে প্রতিদিন প্রায় ৮০০ জন নারী মারা গেছেন। যার অর্থ হলো প্রতি দুই মিনিটে প্রায় একজন নারী মারা গেছেন।

এদিকে বেলারুশে মাতৃমৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি কমেছে। শতাংশের হিসেবে যা ৯৫.৫ ভাগ। অন্যদিকে ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মাতৃমৃত্যুর হার সর্বোচ্চ বৃদ্ধি পেয়েছে ভেনেজুয়েলায়।

 মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আরও জোরালো ভূমিকা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নারীদেরও জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রধান টেড্রোস আধানম গেব্রেইয়েসুস বলেছেন, ‘যদিও গর্ভাবস্থা অনেক প্রত্যাশার সময় হওয়া উচিত এবং সব নারীর জন্য ইতিবাচক অভিজ্ঞতার সময় হওয়া উচিত; তারপরও এটি দুঃখজনকভাবে এখনও বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের জন্য মর্মান্তিকভাবে বিপজ্জনক অভিজ্ঞতা।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের ৮টি অঞ্চলের মধ্যে মাত্র দু’টিতে মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে। এর মধ্যে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ৩৫ শতাংশ কমেছে এবং মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় কমেছে ১৬ শতাংশ। এছাড়া ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় মাতৃমৃত্যুর এই হার ১৭ শতাংশ এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবিয়ানে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। অন্য অঞ্চলগুলোতে এই হার স্থির রয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে নারীর গর্ভকালীন এবং প্রসবকালীন এসব জটিলতা এড়িয়ে চলতে সবার মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।

মূলত বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র অঞ্চলে এবং সংঘাত-পীড়িত দেশগুলোতেই বিশেষ করে মাতৃমৃত্যুর ঘটনা বেশি ঘটছে। ২০২০ সালে রেকর্ড করা মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশই সাব-সাহারান আফ্রিকায় হয়েছে। তাছাড়া মাতৃমৃত্যুর এই হার অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের তুলনায় ‘১৩৬ গুণ বেশি’।

রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাতৃমৃত্যুর পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে গুরুতর রক্তপাত, সংক্রমণ, অনিরাপদ গর্ভপাত থেকে জটিলতা এবং এইচআইভি/এইডস-এর মতো অন্তর্নিহিত বিষয়গুলো রয়েছে। যদিও এগুলোর বেশিরভাগই প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিৎসাযোগ্য। দেশের মাতৃমৃত্যু হারের কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রক্তক্ষরণে ৩১ শতাংশ, একলামশিয়া ২৪ শতাংশ, পরোক্ষ কারণে ২০ শতাংশ, অনির্ধারিত কারণে ৮ শতাংশ, গর্ভপাত জটিলতায় ৭ শতাংশ, অন্যান্য কারণে ৭ শতাংশ এবং অমানসিক শ্রমে ৩ শতাংশ মৃত্যু হয়।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মাতৃমৃত্যুর হার বর্তমানে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে মাতৃমৃত্য ১৬৫ জন। যা ২০০৯ সালে ছিল ২৫৯ জন। গত ১০ বছরে মাতৃমৃত্যু হার কমেছে প্রতি লাখ জীবিত জন্মে প্রায় ৯৪ জন। যদিও গত ১০ বছরের পরিসংখ্যানে কিছুটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে তবু মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখ জীবিত জন্মে ৭০ জনের নিচে নিয়ে আসতে প্রত্যেককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করতে হবে। মাতৃমৃত্যুর হার কমিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে আরও জোরালো ভূমিকা পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। নারীদেরও জীবনযাপন পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

সবাই সচেতন হলে দেশে মাতৃমৃত্যু আরও কমিয়ে আনা সম্ভব। যততত্র গর্ভকালীন চিকিৎসা বা ডেলিভারি কারানো থেকে বিরত থাকতে হবে। নারীরা যদি স্বাস্থ্যগত সঠিক পরিচর্যায় মনোনিবেশ করেন তবে মাতৃমৃত্যু হার কমে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব। মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্যোগী হতে হবে। যেখানে সেখানে মায়েদের ডেলিভারি বন্ধ করতে হবে।

প্রসবকালীন সময়ে তিনি কোন ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হবেন সেটা আগেই জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। মনে রাখতে হবে একটি সুস্থ শরীরই পারে একটি সুস্থ -স্বাভাবিক প্রজন্ম উপাহার দিতে।

সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্য সেবা বাড়াতে হবে। মূলত গ্রামের অধিকাংশ পরিবারই অসচ্ছল- হতদরিদ্র। ফলে জীবনের জন্য বাড়তি করে ভাবার সময় বা জ্ঞান তাদের নেই। তাই সরকারি জনবল নিয়োগ করে তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিযুক্ত কর্মীরা মায়েদের সচেতন করে তুলবেন। উঠোন বৈঠকের মাধ্যমে গর্ভকালীন এবং প্রসবকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে৷ যেখানে যেমন উদ্যোগ ফলপ্রসূ হবে ঠিক তেমনই কাজে অংশগ্রহণ করলে তবেই মাতৃমৃত্যু কমে আসবে।

মাতৃমৃত্যু কমাতে দ্রুত সেবা প্রদান করার ব্যবস্থা করতে হবে। যানবাহন, যথেষ্ট লোকবল নিয়োগ করতে হবে। দালাল চক্রে পড়ে ক্লিনিকে নেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এ লক্ষ সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে৷ ডাক্তারদের মানবতার সেবায় আরও সক্রিয় হতে হবে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে দায়িত্বের কোনোই সুষম বণ্টন নেই। ফলে রোগী নিয়ে গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই!

দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। সেক্ষেত্রে যদি একজন গর্ভকালীন বা প্রসবকালীন মাকে নিয়েও এমন বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয় তবে তার স্বাস্থ্যগত ত্রুটি দেখা দিতেই পারে। তাই হাসপাতালে নির্দিষ্ট ইউনিট গঠন করে সরকারের উর্ধতন কর্মকর্তাদের সর্বদা মনিটরিং এর ব্যবস্থা রাখতে হবে। যদি তা না করা যায় তবে যতোই স্বাস্থ্য সেবার কথা বলা হোক না কেন, মাতৃমৃত্যু কমিয়ে আনা সম্ভব হবে না। সর্বোপরি নারীকে সচেতন হতে হবে।

গর্ভকালীন সময় থেকেই জীবনযাপন পদ্ধতি বদলাতে হবে। স্বাস্থ্য ঝুঁকি দেখা দেয় এমন কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। এবং তালিকা মেনে জীবনযাপন করতে হবে। প্রসবকালীন সময়ে তিনি কোন ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হবেন সেটা আগেই জেনে-বুঝে সিদ্ধান্ত গ্রহন করতে হবে। মনে রাখতে হবে একটি সুস্থ শরীরই পারে একটি সুস্থ -স্বাভাবিক প্রজন্ম উপাহার দিতে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ