Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

প্রবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে

গ্রাম-অঞ্চলের বহু নারী ভাগ্যান্বেষণে দেশের মায়া ত্যাগ করে বহির্বিশ্বে পাড়ি জমায়। নিজের এবং পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে এসব নারী জীবনের ঝুঁকি নেয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এসব নারীর অধিকাংশই শ্রমিক হিসেবেই দেশের বাইরে যায়। দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা, সুনাম বয়ে আনে। তবে এসব নারীদের অনেকেই দালালের খপ্পরে পড়ে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে হয়েছেন নিঃস্ব। অনেকে যৌন-হয়রানি, শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন।

অভিবাসী নারী শ্রমিকদের নানারকম প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে এভাবেই টিকে থাকতে হয়। কেউ কেউ আশাভঙ্গ হলেও পুনরায় দেশে ফিরে আসেন। এই নারীদের অনেকেই কাজ করলেও তার যোগ্য মজুরি পান না। বাসাবাড়িতে কাজ করলে গৃহকর্তাদের দ্বারা যৌন ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এক্ষেত্রে এই নারীরা কর্মসংস্থানে নির্যাতনের শিকার হলে বেশিরভাগই সঠিক বিচার পান না। তবে যারা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আনয়ন করছেন, দেশের সুনাম বৃদ্ধি করছেন, সেসব নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই এসব নারীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সচেতন হতে হবে।

বিশ্ব শ্রমবাজারে অভিবাসী নারী শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিক সংখ্যার প্রায় অর্ধেক। আর শ্রমবাজারে অংশ নেয়া এসব নারীর মধ্যে অনেকেই কম দক্ষতাসম্পন্ন হওয়ার কারণে কর্মক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়েই সুরক্ষা সমস্যায় পড়েন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সঠিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি আজও । বিভিন্ন দেশে এক কোটির বেশি প্রবাসী শ্রমিকের মধ্যে ১০ লক্ষাধিক নারী শ্রমিক রয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থানে স্থবিরতার মধ্যেও নারী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিটেন্স আশার আলো জুগিয়েছে । মধ্যপ্রাচ্যে নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের মূল বিশেষত্ব হচ্ছে, শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত নারী শ্রমিকরা বছরে গড়ে আড়াই লাখ টাকা আয় করছে।

সরকারি হিসাবে শুধু সৌদি আরবেই সাড়ে চার লাখের বেশি বাংলাদেশি নারী শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। সৌদিতে কর্মরত নারী শ্রমিকরা প্রতিমাসে সাড়ে ১২শ কোটি টাকা দেশে পাঠাচ্ছে বলে বিএমইটির সূত্রে জানা যায়। তবে মাঝেমধ্যেই গণমাধ্যম বরাত এই নারীদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাদের অনেকেই দেশে ফিরে এসে তাদের নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা তুলে ধরেছেন গণমাধ্যমের কাছে। তবু আজ অবধি তেমন কোনোই কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি এসব নারীর নিরাপত্তার স্বার্থে!

সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অভিবাসী নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে দেশ-বিদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষক দলের সম্প্রতি প্রকাশিত এক জরিপ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, নির্যাতিত নারীদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ নারী শ্রমিক মহামারি শুরুর পর কাজে যোগ দিয়েও কোনোরকম বেতন-ভাতা পাননি। বিদেশফেরত ৬৫৫ জন নারীর কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, করোনাকালীন আরব দেশগুলোয় যাওয়া নারী অভিবাসীদের ২৮ শতাংশ কখনো স্কুলে যাননি। করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে বিভিন্ন দেশ থেকে ফিরে আসেন ৬০ শতাংশ শ্রমিক।

পাবে।

দালালরা এসব নারীকে বিদেশে গৃহপরিচারিকার কাজ দেওয়ার নামে নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করে, তা থেকে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের বের করে আনতে হবে। তাই প্রবাসী ও অভিবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে।

২০২০ ও ২০২১ সালে এ শ্রমিকরা দেশে ফিরে আসেন। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশই বিবাহিত। আর বিচ্ছেদ হয়েছে ১৬ শতাংশের। বিধবা ১১ শতাংশ। ৭ শতাংশ অবিবাহিত। বিবাহিত নারীরা অধিকাংশই তাদের পরিবারের খরচ চালানোর জন্য বিদেশে শ্রমিক হিসেবে যান। ৬৫৫ জনের মধ্যে ৩০ শতাংশ দেশে ফিরে আসার অপেক্ষা করতে করতে জমানো টাকা খুইয়েছেন। এদের তখন ধার করে দেশে আসতে হয়েছে। ৬৫ শতাংশকে পারিবারিক ব্যয় খোয়াতে হয়েছে। এ সময় বিদেশে কোনো ধরনের স্বাস্থ্যসেবা পাননি ১৪ শতাংশ। একা বিদেশ যাওয়ার কারণে ১১ শতাংশ নারী সামাজিক প্রতিহিংসার শিকার হন। দেশে ফিরে আসার পর এসব নারীর কারও কারও পরিবার তাকে গ্রহণ করতে চায়নি। কারও স্বামী নতুন বিয়ে করেছে। খালি হাতে দেশে ফিরে আসায় পরিবারের সদস্যদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি হয়েছেন অনেকে। ফিরে আসা নারীদের মধ্যে ৮৭ শতাংশ কাজে যুক্ত হলেও আগের চেয়ে তাদের আয় কমেছে। ৪৩ শতাংশ নারী জানান, তাদের যে বেতন দেওয়ার কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় তার চেয়ে তারা কম বেতন পেয়েছেন।

এছাড়া ২৭ শতাংশ নারী কোনো না কোনো নির্যাতন ও হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। ৪১ শতাংশের সে দেশে কোনো নারী বন্ধু বা পরিচিত কেউ ছিল না। প্রত্যেকের দিনে ১৪ ঘণ্টা করে কাজ করতে হয়েছে এবং ৭৬ শতাংশ এক দিনের জন্যও সাপ্তাহিক ছুটি পাননি। বিএমইটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২১ সালে দেশের বাইরে কাজ করতে যান ৮০ হাজার ১৪৩ জন নারী। আর ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত গিয়েছেন ৪৩ হাজার ৬১০ জন। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই গিয়েছেন ২৭ হাজার ৩১৯ জন। যা মোট প্রবাসে গমনকারী নারীর ৬৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা বলেন, পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ না থাকায় বাংলাদেশ থেকে আরব দেশগুলোতে যাওয়া নারী শ্রমিকরা নানা নির্যাতনের শিকার হলেও তারা প্রতিকার চাইতে পারেন না।

নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকাংশই বাধ্য হয়েই কাজ করতে যান। পারিবারিক সংকট কাটিয়ে উঠতে এসব নারীরা নিজেদের জীবনকে হুমকিট সম্মুখীন করে তুলতেও শেষমেশ তারা কিছুই পায় না। দেশের বাইরে নির্যাতনের শিকার হতে হয় বেশিরভাগক্ষেত্রে। আবার পরিবারে ফিরে এলে তাদের অবজ্ঞার শিকার হতে হয়, লাঞ্ছিত হতে হয়। ভাগ্যান্নোয়নের খোঁজ পেতে গিয়ে এসব নারীরা সর্বস্ব খোয়াই। প্রবাসে কর্মরত এসব নারীরা সঠিকভাবে বেতন ভাতা পাচ্ছে কিনা, তাদের নিরাপত্তা আছে কিনা তা নজরদারির দায়িত্ব সরকারের।

যেহেতু দেশের মাঝে সবার কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ নেই তাই এই নারীরা ঝুঁকি নিয়ে হলেও বাইরে যাচ্ছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে যদি তাদের ভাগ্যে শুধু বিড়ম্বনা জোটে তবে তা দেশের জন্যও লজ্জার। অভিবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষায় শক্তিশালী অবলম্বন হিসেবে কাজ করতে পারে নারীর মানবাধিকার ও ক্ষমতায়নবিষয়ক সব কনভেনশনসমূহ। নারী শ্রমিকরা যাতে নির্যাতন ও বঞ্চনার শিকার না হন সেদিকে লক্ষ রাখতে এখনই যথাযথ উদ্যোগ গ্রহন করতে হবে। দেশে যেহুতু সবার কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না তাই বাইরেও যদি নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় তবে দেশের বাড়তি চাপ কমবে। রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাবে।

দালালরা এসব নারীকে বিদেশে গৃহপরিচারিকার কাজ দেওয়ার নামে নানাবিধ কৌশল অবলম্বন করে, তা থেকে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের বের করে আনতে হবে। তাই প্রবাসী ও অভিবাসী নারী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। যাতে সাধারণ নারীরা সুখের আশায় বিপদে জড়িয়ে না পড়ে। তাই নারী অভিবাসীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আজ ১৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। আজকের দিনে আমাদের একটাই প্রত্যাশা অভিবাসী নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হোক।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ