Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

নারী মুক্তিতে মানবিক সমাজ চাই

আবহমানকাল ধরে পরিবারে, সমাজে নারীরা নিগৃহীত। নারীকে সমাজের বিধিনিষেধ মেনে জীবনযাপন করতে হয়। কিন্তু পরবার, সমাজ যদি নারীর চলার পথে বাধা না হয়ে সহযোগী হয়ে ওঠে তবে নারীরা উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে পারবে সহজেই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে সর্বদাই শোষণ করে তাদের ফায়দা লোটার জন্য। যাতে নারীরা স্বাবলম্বী হতে না পারে। পুরুষের ওপর নির্ভরশীল হয়ে থাকতে পারে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে গজিয়ে ওঠা এই ধারণা নারীর জীবনকে বিপর্যস্ত করে চলেছে। নারীরা যতই এই অবরুদ্ধ সমাজ থেকে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করছে ততই নারীকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলা হচ্ছে । নারীর মুক্তির জন্য মানবিক সমাজ অতীব জরুরি।

আজকাল সমাজে নারীর সঙ্গে নানারকম অন্যায়- অবিচার হচ্ছে। নারীর জীবন কোথাও নিরাপদ নয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, পরিবার-পরিজন, কর্মক্ষেত্রে সবই বেহাল দশা। বর্তমান সময়ে নারীর জন্য সবচেয়ে ভীতিকর পরিস্থিতি পরিবারে। আগে যে সম্পর্কগুলো অত্যন্ত আস্থার, বিশ্বাস ও ভালোবাসার ছিল যুগের পরিবর্তনে তা হয়ে উঠেছে অভিশপ্ত। দাম্পত্য সম্পর্কের জেরে স্বামীর হাতে অহরহ স্ত্রী খুন হচ্ছে, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। আবার পরিবারে বাবা- মায়ের কাছে কন্যা সন্তান নিরাপদ নয়। অভিভাবকের হাতে খুনের শিকার হচ্ছে সন্তান।

নারীর এই হীন দশা পরিবার থেকে শুরু করে সর্বত্র ঘটছে। তবে পরিবারে যদি কন্যা সন্তানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়, মতের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয় তাহলে নারীরা জীবনযাপনের সুস্থ পরিবেশ পাবে। ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নারী তার যোগ্য মূল্যায়ন পেলে সমস্যা ধীরে ধীরে কমে আসবে। মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন না করে যদি শুধু কন্যা বলে ঘরে- বাইরে বঞ্চিত, নিপীড়িত হতে হয় তবে নারীর কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করা সম্ভব নয়।

নারীরা স্বাবলম্বী হতে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজে অংশগ্রহণ করছে। কিন্তু সেখানে নারীকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। তীর্যক চোখে দেখা হচ্ছে। নারী যে স্বাবলম্বী হতে চায়, যোগ্যতা, মেধার পরিচয় দিতে চায় এটাও এক শ্রেণি ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। পুরুষতান্ত্রিক হীন মানসিকতা পরিহার না করলে নারীকে সম্মান করা সম্ভব নয়। নারীরা ফুটবলের মাঠ থেকে শুরু করে ট্রেন চালনা কোনটায় পিছয়ে আছে? নারীরা পরিবারের, সমাজের ধাক্কা খেলেও গুটি গুটি পায়ে সামনে এগিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। কিন্তু নারীর এই অগ্রযাত্রা এতটা কঠিন হতো না যদি আমরা মানবিক হতাম। নারীর প্রতি সহমর্মী হতাম। পরিবারে ছেলে সন্তানের সঙ্গে মেয়েকে যদি আলাদা না করতাম। কন্যা সন্তান পরের আমানত ভেবে তার ওপর একরাশ দায়িত্ব চাপিয়ে না দেওয়া হয় তবে মেয়েদের স্বাভাবিক বিকাশ গড়ে উঠবে।

নারীকে বোঝা না ভেবে নারীরাও পরিবার, সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সেই মানসিকতা ধারণ করতে হবে। নারীর প্রতি মানবিক দৃষ্টি নারীর চলার পথে জটিলতা দূর করতে সক্ষম। প্রত্যেকটি নারী যদি নিশ্চিত হন যে আগামীকাল থেকে তার জন্য রাস্তায় কোথাও ইভটিজিং, যৌন হয়রানি বা ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটবে না তাহলে নিশ্চিতভাবেই নারীর বিকাশ হবে। কারণ আমাদের সমাজে নারীরা হয়তো কোনদিনই বিকাশিত হয় না। অনেক কিছু লুকিয়ে, চাপিয়ে তাকে নিজেকে মেলে ধরতে হয়। কারো গায়ের রঙ কালো হলে তাকে গায়ের রঙ লুকাতে হয়। কারো নিজস্বতা লুকাতে হয় পরিবার, সমাজের চাপে। ফলে আজীবন নারী তার নিজের সত্তায় চিনে উঠতে পারে না।

অনেক নারী হয়তো বয়স শেষ হয়ে গেলেও বুঝতেই পারেন না, তার ঘুরতে ভালো লাগে, সাজতে ভালো লাগে, খেতে ভালো লাগে বা সংস্কৃতির ধারক- বাহক হতে ভালো লাগে প্রভৃতি ভালোলাগা আসলে নারীর থাকলেও সে বেশিরভাগসময়ই বুঝে উঠতে পারেন না। সৃষ্টি সম্ভারে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে পারেন না। কারণ তাকে যাপন করতে হয় অন্যের দেওয়া জীবন। পরিবার, সমাজের নিয়মে যে জীবন তাই নারী যাপন করতে বাধ্য৷ কেউ যদি নিজের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠাকে প্রাধান্য দেন তবে সমাজের রক্তচক্ষু তাকে গিলে খায়।

আমাদের নারীরা ফুটবল জয়ী হয়ে ঘরে ফিরলো৷ সেখানেও একপক্ষের অতি রক্ষণশীলতা, গোঁড়ামি নারীকে কটুকথায় বিদ্ধ করতে ব্যস্ত থেকেছে। ভালোকে গ্রহণ করার ক্ষমতায় যেন একশ্রেণির নেই। তবে সমাজ কখনোই শতভাগ পরিবর্তন হয় না। কিন্তু যাদের শিক্ষিত তরুণ সমাজ বলছি তারা যখন চোখ অন্ধ করে নারীদের প্রতি বাজে মন্তবয় ছুঁড়ে দেয় তখন হতাশ হতে হয়। নারীর প্রতি মানবিক হলে এই ধরনের পচা, নোংরা, দুর্গন্ধযুক্ত মানসিকতা পরিহার করা সম্ভব হবে।

ঘরের মা, বোনটাও নারী। কোন নারীকে অসম্মান করলে মূলত নিজের মাকেই অসম্মানিত করা হয়৷ নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনোভাব একটি সুন্দর এবং সুস্থ জাতি উপহার দিতে সক্ষম। পুঁথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত হলেই ভালো মানুষ হওয়া যায় না। ভালো মানুষ হতে গেলে মনের পবিত্রতা জরুরি। আর নারীর প্রতি মানবিক চেতনা আমাদের সমাজের আমূল পরিবর্তন করতে সক্ষম।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ