Skip to content

২রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীর আত্মপরিচয়ই হোক তার ঠিকানা

নারীরা প্রতিনিয়তই কারও না কারও ওপর নির্ভরশীল হয়েই জীবন কাটায়। কখনো বাবার পরিচয়, কখনো স্বামী আবার কখনো ছেলের। আজ অবধি নারীর জীবন এই চক্রের মধ্যেই ঘুরপাক খাচ্ছে। নারীকে আজও তার স্বপরিচয়ে পরিচিত হতে দেখা যায় না বললেই চলে। প্রতিনিয়তই একই হাল চলে আসছে সমাজে। কিন্তু নারী কেন তার স্বপরিচয়ে পরিচিত নন? কেনই বা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীর আত্মপরিচয় নারী নিজেই নয়?

যুগ পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু আমরা যে তিমিরে ছিলাম আজও সেখানেই আটকে আছি। শৈশব থেকে একজন মেয়ের পরিচয় বাবাকে কেন্দ্র করে। পরিবারের সদস্যরা কখনোই একজন মেয়েকে নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়তে শেখান না। বরং তাকে আপষ করে, মানিয়ে নিয়ে, নরম-ভদ্র, কমোল সুরে কথা বলতে শেখান। নারীকে মানুষ হিসেবে না বরং নারীর পরিচয় তার বাপ- ভাইয়ের সঙ্গে। ফলে মেয়েরা শৈশব থেকেই পরনির্ভরশীল জীব হয়ে ওঠে। অনেকটা পরগাছার মতো।

যখন বাবার পরিবার থেকে নারীর যাত্রা স্বামীর ঘরে তখন স্বামীই নারীর পরিচয়। স্বামীহীন নারী যেন খালি আসবাবের মতোই। বিশ্বাস করা হয়, স্বামী-ই নারীর শোভাবর্ধন করে। নারীর মাথার মুকুট। এই মনগড়া কথা শেকড় গজিয়েছে পুরুষতন্ত্রের ভণ্ডামিতে। তারা নারীকে দমিয়ে রেখে আজীবন শোষণ করতে চায় ফলে নারী যাতে নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে না পারে সে বিষয়ে সমাজে রয়েছে নানান বিধিনিষেধ। শুধু তাই নয় একজন সিঙ্গেল মাদার নিজের সন্তানকে বহু কষ্টে বড় করেন যেখানে পিতার কোনই অস্তিত্ব থাকে না। তবু মায়ের পরিচয়ে সন্তান পরিচিত হচ্ছেন না। যেই জীবন থেকে নারীরা বেরিয়ে আসছেন সন্তানের জন্য প্রতিপদেই তাকে একই বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। কিন্তু কেন নারীর পরিচয় নারী নয়? কেন সমাজের চাপিয়ে দেওয়া অপপ্রথাকে সঙ্গী করে নারীকে একবিংশ শতাব্দীতেও এসেও চলতে হবে?

একজন পুরুষকে তো কেউ বলেন না, অমুকের স্বামী তুমি বা আপনি! কিন্তু নারীকে কিসের জন্য তার নিজেকে অসহায়ভাবে স্বামীকে মাথার মুকুট মনে করেই সামনে এগুতে হবে? সমাজের পরিবর্তন কবে হবে? নারী নিজ যোগ্যতা-দক্ষতা-জ্ঞানের অধিকারী। তবে কেনই বা জড় বস্তুর মতো পুরুষকেই পথ দেখাতে হবে? নারী তো কোন অন্ধ জড় বস্তু সদৃশ নন। তবে কেন পরিবার, সমাজ আইনে নারীর নিজ পরিচয়কেই পরিচিত করা হচ্ছে না? বাবা, স্বামীর পরিচয় ছাড়া নারী নিজে একজন স্বতন্ত্র্য মানুষ। ফলে তার সেই স্বতন্ত্র্যতা রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের সবার।

বাবা, স্বামীর গণ্ডি পেরিয়ে নারী পড়েন আরেক গোলকধাঁধায়। অমুকের মা। কেন? তার সন্তানকে তো তিনিই বড় করেছেন, গড়ে তুলছেন। তবে মায়ের পরিচয় কেন মায়েরই হবে না? সন্তান তো পরের জেনারেশান। লজিকে দাঁড়ালে মায়ের পরিচয়ে সন্তানের বা ছেলের পরিচিত হওয়া উচিত কিন্তু এ সমাজ এতটাই ধাপ্পাবাজ যে যখন পুরুষতন্ত্রের স্বার্থে এসে গড়ায় তখন তারা নিজ নিজ নিয়ম ফাঁদতে প্রস্তুত থাকে। উদ্দেশে একটাই কোন মতেই নারীকে শেকল ভেঙে বেরুতে দেওয়া যাবে না। নারী পায়ের তলায় পড়ে থাকার জিনিস মাত্র! তাকে কেন নিজের পরিচয়, নিজের জীবন নিয়ে বাড়তে দেওয়া হবে?

আজব সমাজের বাসিন্দা আমরা। ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারে অন্যের মুণ্ডুচ্ছেদ করতে গায়ে বাধে না আমাদের। ফলে নারী কী হলো না হলো এ নিয়ে সমাজের কোন মাথা ব্যাথা নেই। পুত্র সন্তান কতটা নাম কামাতে পারবে, বাবা-মাকে উচ্চতায় তুলবে সে নিয়ে প্রত্যেক বাবা-মা অসম্ভব প্রেশার। কিন্তু নারী? সে ঘরের এককোণে পড়ে স্বামীর দুটো উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকলেই হলো। তার আবার এত কেনো? এই মানসিকতা যতদিন না পাল্টাবে ততদিন নারীর আত্মপরিচয় গঠিত হবে না।

ফলে নারীর স্বপরিচয় যদি আত্মপরিচয়ে রূপ দিতেই হয় তবে পরিবার, সমাজের মাথা থেকে বস্তাপঁচা সংস্কার- কুসংস্কার ধুয়েমুছে পরিষ্কার করতে হবে। নতুবা একটি পচা আলুর সঙ্গে আর ভালো আলুর পচন ধরতে বাধ্য। পরিবার, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের এখনই উপর্যুক্ত সময়। তাই আসুন নারীকে তার স্বপরিচয়ে পরিচিত হতে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা এবং সহোযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিই। তাহলে নারী বাঁচবে তথা দেশ বাঁচবে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ