Skip to content

২১শে ফেব্রুয়ারী, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বুধবার | ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

‘সূর্যদীঘল বাড়ি’র জয়গুণ: নারীর শক্তিশালী রূপের চিত্রায়ণ

বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক (১ নভেম্বর ১৯২৬-১ নভেম্বর ২০০৩) শরিয়তপুর জেলার নড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘সূর্য দীঘল বাড়ি’ (১৯৫৫)। গ্রামজীবনের বিশ্বস্ত দলিল এই গ্রন্থটি। কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, পুরুষতন্ত্রের নির্যাতন, ধনিক শ্রেণির শোষণ-নিপীড়নে পিষ্ট এক নারীর জীবন কথা বর্ণিত হয়েছে এই উপন্যসে। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, সাতচল্লিশের দেশভাগ, মোড়ল শ্রেণির ষড়যন্ত্র, নারীর সংগ্রাম একই সমান্তরালে অনবদ্য রূপ পেয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জয়গুণ। তার জীবন সংগ্রামই এ উপন্যাসে মুখ্য।

জয়গুণ বাংলাদেশের এক দরিদ্র শ্রমজীবী নারী। প্রথম স্বামীর সন্তান কিশোর হাসু, দ্বিতীয় স্বামীর ঘরে জন্ম নেওয়া মেয়ে মায়মুনাকে নিয়ে জয়গুণ বাপের ভিটেয় ফিরে আসে। দ্বিতীয় স্বামী করিম বকশ শিশু পুত্র কাসুকে সঙ্গে রেখে বউ, মেয়েকে বাড়ি ছাড়া করেছে। কাসু বড় হয়ে তার দেখভাল করবে কিন্তু কনয়া মায়মুনাকে বেগার পুষে তার লাভ নেই। তাই মায়মুনাকে মায়ের সঙ্গে বিদায় করে। জয়গুণের মাতৃহৃদয় পুত্রটির জন্য হাহাকার করে। লুকিয়ে শিশুপুত্রটিকে দেখতে গেলে করিম বকশ তাকে গালমন্দ দেয়। কাসুকেও প্রহার করে মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য। স্বামীর নির্যাতনের শিকার জয়গুণ নিজের ভাগ্যরেখা নিজেই বদলানোর জন্য কাজে নামে।

জয়গুণ গ্রামে ফিরে আশ্রয় নেয় তালগাছের ভিটে বলে পরিচিত বাবার রেখে যাওয়া সূর্য দীঘল বাড়িতে। গ্রামে সাধারণত বাড়ি বানানো হয় উত্তর-দক্ষিণ করে। কিন্তু এই বাড়িটি পূর্ব-পশ্চিমে। এ কারণে বাড়িটি পরিচিতি লাভ করে ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ রূপে। গ্রামে সবার মাঝে কুসংস্কার রয়েছে এই বাড়ি থাকা মানে অমঙ্গল হবে। গ্রামের মোড়ল-মাতবরেরা সবাই প্রচার করে, এই বাড়িটিতে ভূতের আছর আছে। অন্ধকার রাতে ঘরের চালে ঢিল ছোড়ে ভূত।

জয়গুণ সাহসী নারী। ভূত-প্রেতের ভয়কে উপেক্ষা করে সে জীবন সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সে জানে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করার জন্য এলাকার মোড়লরা এমন রটিয়েছে। আর জয়গুণ মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে ভূতের ভয় করতে গেলে গরিবের চলে না। খেটে খাওয়া মানুষ সে। জীবন-জীবিকার জন্য তাকে লড়তে হবেই। গ্রামের ফকির জয়গুন ও তার ভাবিকে ভয় দেখায় এ ভিটাতে এবং বিশেষ করে চারপাশের গাছগুলোতে রয়েছে জিনের আছর। যদিও হাসু বলে, ‘আমরা তো ক দিন গাছতলাতেই ছিলাম, আমাদের তো কিছু হয় নাই।’ ফকির বলে, ‘হয় নাই, হতে কতক্ষণ।’ সে বাড়ি বন্ধন করে। অর্থাৎ ঝাড়ফুঁক করে তাবিজ দেয়। এর বদলে সে পায় চাল। এ ধরনের লোক ঠাকানো কাজই তার পেশা।

অন্যের বাড়ির দাসীবৃত্তি ছেড়ে জয়গুণ ব্যবসা শুরু করে। আর এরফলে তার আয়ও বৃদ্ধি পায়। দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে সংসারটা কোনো রকমে চালিয়ে নিতে জয়গুণের তেমন কষ্ট হয় না। মায়মুনা হাঁস পালে। জয়গুণ, মায়মুনার জীবন সংগ্রামের পথে বাধা হয় গ্রামের ইমাম, মোড়লরা। মায়মুনার হাঁসের ডিম হারাম বলে আখ্যায়িত করে। তবু জয়গুণ সমাজের প্রতিবন্ধকতাকে গায়ে না মেখে পরিশ্রম করেছে।

বেঁচে থাকার তাগিদে নতুন নতুন চ্যলেঞ্জ নিতে সে পিছু হটেনি। বরং মোড়ল, মাতবার, শোষক শ্রেণির বুকে চপেটাঘাত করেছে। বাঙালি নারীর আদর্শ হয়ে উঠুক জয়গুণ।

গ্রামের মোড়ল গদু প্রধান জয়গুনের উপর কুদৃষ্টি দেয়। তাকে ‘নিকা’ করতে চায়, যদিও তার ঘরে আরো দুই স্ত্রী রয়েছে। কিন্তু সাহসী জয়গুন গদু প্রধানকে প্রত্যাখ্যান করে।

এদিকে জয়গুনের কিশোরী মেয়ে মায়মুনের বিয়ে স্থির হয়। কিন্তু বিয়ের আসরে বলা হয় জয়গুনকে তওবা করতে হবে এবং সে ময়মনসিংহে ব্যবসার কাজে যেতে পারবে না ও গ্রামের বাইরে কাজ করতে যেতে পারবে না। এভাবে জয়গুনের জীবিকার পথ বন্ধ করে দিয়ে তাকে নিজের বশে আনতে চায় গদু প্রধান। মেয়ের বিয়ে দেয়ার জন্য জয়গুন তওবা করে।

এদিকে কাসুর অসুখ হলে তাবিজ ও ফকিরের ঝাড়ফুঁকে যখন তার অবস্থা মরমর তখন এগিয়ে আসে জয়গুন। শফিকে দিয়ে শহর থেকে ডাক্তার আনে, মায়মুনের পোষা হাঁস দুটি বিক্রি করে চিকিৎসা করায়। দিনরাত ছেলের সেবা করে। এই সেবার ফলে সুস্থ হয় কাসু। জয়গুনের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করে করিম বকশ। কাসুকে সে ফিরিয়ে দেয় মায়ের কাছে।

শ্বশুর বাড়ি থেকে মায়মুনাকে তাড়িয়ে দিলে মায়ের কাছে ফিরে আসে। শেষপর্যন্ত বাঁচার তাগিদে জয়গুণ কাজ নেয় ধানকলে। কিন্তু সেসব সহয় হয় গদু প্রধানের। একরাতে ঢিল মারার সময় দেখে ফেলায় করিমকে গলা টিপে হত্যা করে। এ সময় জয়গুণ হত্যাকাণ্ডটি দেখে ফেলায় প্রতিবাদ করে। উপন্যাসের আদ্যোপান্ত বেঁচে থাকার জন্য জয়গুণের লড়াই পরিলক্ষিত হয়। আবু ইসহাক বাঙালি নারীকে সমাজের বাঁধা ধরা নিয়মের বাইরে বের করে আনতে সক্ষম হন। তাইতো বাংলা উপন্যাসের জগতে জয়গুণ এক অম্লান চরিত্র।

কুসংস্কার, অজ্ঞতা দিয়ে বারবার সমাজের মোড়লরা জয়গুণকে বেধে ফেলতে চেয়েছে। লালসা চরিতার্থ করতে চেয়েছে। কিন্তু জয়গুণ প্রথাবিরুদ্ধ । বেঁচে থাকার তাগিদে নতুন নতুন চ্যলেঞ্জ নিতে সে পিছু হটেনি। বরং মোড়ল, মাতবার, শোষক শ্রেণির বুকে চপেটাঘাত করেছে। বাঙালি নারীর আদর্শ হয়ে উঠুক জয়গুণ। সব শোষণ, ভণ্ডামি বুকে পদাঘাত করে চিনে নিক আপন রাজত্ব।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ