Skip to content

২রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

ডেসডিমনা : সন্দেহপরায়ণতার বলি

ইংরেজি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ার (১৫৬৪-১৬১৬)-এর ‘ওথেলো’ একটি বিয়োগান্তক নাটক। এই নাটকের চরিত্র সংখ্যা মোটামুটি অনেক। তবে প্রত্যেকটা চরিত্র তাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অন্যের জন্য পেতেছে ফাঁদ। কেউ কেউ না বুঝেই ফাঁদে শিকার হয়ে ধরা দিয়েছে। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র ওথেলো, ডেসডিমনা। এছাড়া এ নাটকে স্থান পেয়েছে ইয়াগো, এমিলিয়া, ক্যাসিও, বিয়াঙ্কা, ব্রাবনশিও, রোডারিগো, গ্রাটিয়ানো, লোডোভিকো, মন্টোনো, ক্লাউন, সেনেটরগণ, নাবিক।

ধনী, অসচ্চরিত্র রোডারিগো সেনেটর ব্রাবানশিওয়ের কন্যা ডেসডিমনার প্রণয়প্রার্থী। এ লক্ষে তিনি ব্রাবানশিওয়ের কাছে প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। কিন্তু ডেসডিমনা ভালোবেসে ভেনেসীয় সেনাবাহিনীর মুর জাতীয় জেনারেল ওথেলোর সঙ্গে গোপন বিয়ে করে। এবং ইয়াগো এই ঘটনাটি রোডারিগোকে জানাতে অসমর্থ হয়। তাই রোডারিগো তার ওপর রুষ্ট হয়েছে।ডেসডিমনা সুন্দরী, জ্ঞানী।

অন্যদিকে ওথেলো কৃষ্ণাঙ্গ। দুজনের ভালোবাসা রাজ্যের সবার মনে অসন্তোষ সৃষ্টি করে। ইয়াগো আবার ওথেলোকে অপছন্দ করতেন। কারণ তিনি ক্যাসিও নামে এক যুবককে তার চেয়ে উচ্চপদে আসীন করেন। ফলে একদিকে রোডারিগোর ক্রোধ অন্যদিকে ইয়াগোর। দুজনের ষড়যন্ত্রের শিকার করে তোলে ক্যাসিওকে। ইয়াগোর স্ত্রী এমিলিয়া ডেসডিমনার পরিচারিকা।

ওথেলোর প্রথম দেওয়া রুমাল কুড়িয়ে নিয়ে স্বামী ইয়াগোকে দেয়। সেসময় এমিলিয়া ইয়াগোর ষড়যন্ত্রকে বুঝতে পারে না। এই রুমালটিকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে ইয়াগো ওথেলোর মনকে সন্দেহপরায়ন করে তোলে। ক্যাসিওর প্রেমিকা বিয়াঙ্কাকে নিয়ে কথা বলার সময় ইয়াগো ছলোনা করে। ওথেলোকে হাতের ইশারা, অঙ্গভঙ্গি দিয়ে বুঝাতে চান যে ডেসডিমনার প্রতি সে অনুরক্ত। এবং একটি পর্যায়ে গিয়ে ওথেলো ডেসডিমনাকে হত্যা করে। ইয়াগো এমিলিয়াকে হত্যা করে। রোডারিগো যাতে গোপন ষড়যন্ত্র ফাঁস করতে না পারে সেজন্য তাকেও ছুরিকাঘাত করে। তারপর ইয়াগো বিয়াঙ্কাকে অভিযুক্ত করে ক্যাসিওকে হত্যা করার জন্য একটি ব্যর্থ ষড়যন্ত্র করে। রোডারিগো, এমিলিয়া, ও ডেসডিমনাকে হত্যার দায়ে লোডাভিকো ওথেলো এবং ইয়াগোকে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতারকৃত অবস্থায় ওথেলো নিজের ভুল বুঝতে পেরে আত্মহত্যা করে।

ওথেলা ও ডেসডিমনা দুজনে ভালোবেসে পরিণয়ে আবদ্ধ হয়। নাট্যকার দুজনের ভালোবাসার প্রগাঢ়তা দেখাননি। দুজনের প্রেম ও বিয়ের দৃশ্যপটের প্রসার না ঘটে বরং তিনি ইয়াগো, রোডারিগোর ষড়যন্ত্রকে বেশি বিস্তৃত করেছেন। প্রেমের প্রতি নিবেদন এখানে ওথেলোর নেই। ওথেলোর প্রতি ডেসডিমনার ভালোবাসা, বিশ্বাস থাকলেও ওথেলো কোনোভাবেই বুঝতে পারেনি তার প্রণয়। ডেসডিমনার পিতা ব্রাবানশিও মেয়ের ওথেলোর ভবিষ্যৎ শঙ্কার কথা বলে। সেটাকেই কাজে লাগায় ইয়াগো।

চরিত্রগুলো নিয়তি নির্ভরতা মেনে নিয়েছে। নাহলে ডেসডিমনা মৃত্যুদূত দেখে, সব বুঝেও মৃত্যুকে গ্রহণ করলো। আবার ওথেলোই বা কেন বুদ্ধিহীন আচরণ করে ষড়যন্ত্রের শিকার হলো?

ব্রাবানশিও কন্যা ডেসডিমনার ভালোবাসাকে মেনেনিলেও তাকে ধোঁকা দিয়েই সে ওথেলোকে বিয়ে করেছে। তাই ওথেলোকে ব্রাবানশিও বলে, ডেসডিমনা যেমন নিজের বাবাকে ঠকিয়েছে এবং তোমাকেও ঠকাবে। ইয়োগো এই বিষ ধীরে ধীরে ওথেলার মনে প্রবেশ করায়। ওথেলো এই ফাঁদে পা দিয়ে ডেসডিমনাকে খুন করে। নিজেও আত্মহত্যা করে।

ওথেলোর প্রতি নির্লিপ্ত ভালোবাসা ডেসডিমনার। আবেগপ্রবণ ও রোমান্টিক চরিত্র ডেসডিমনা। তার আবেগের কারণেই ইয়াগোর প্ররোচনায় যখন ওথেলো তাকে পদচ্যুত করে তখন ডেসডিমনার স্মরণাপন্ন হতে বলে। ক্যাসিও নিজের পদ ফিরে পেতে ডেসডিমনার আনুকুল্যে আসে। ডেসডিমনার আবেগাপ্লুত মন ক্যাসিওর ভালোর জন্য প্রণয়ী ওথেলোকে বলতেই ইয়াগো সুযোগ গ্রহন করে।

এই নাটকের মূল হর্তাকর্তা ইয়াগো, রোডারিগো। যদিও রোডারিগো ষড়যন্ত্র লিপ্ত ছিল কিন্তু সে সক্রিয় ভূমিকা নেয়নি। ইয়াগো প্রত্যেককে তার অবস্থানে বিষিয়ে তুলেছে একে অন্যের প্রতি। ওথেলোর চরিত্রকে বিবেকবুদ্ধি সম্পন্ন করেননি শেক্সপিয়ার। চরিত্রটির সঙ্গে তার বুদ্ধি-জ্ঞানের ঘাটতি মনে দাগ কাটে। যে কিনা মুর জাতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল সে সাধারণ সৈন্যের কাছে ষড়যন্ত্রে ধরা দিলো। নাটকে ষড়যন্ত্রই সক্রিয়।

ভেনিসের কৃষ্ণাঙ্গ বীর সেনাপতি ওথেলোর বীরত্ব, ব্যক্তিত্বের প্রেমে পড়ে ডেসডিমনা। শেতাঙ্গ সুন্দরী ডেসডিমনার এই বিয়ে সে সময় ভেনিসের অনেক যুবকই মেনে নিতে পারেনি। ইয়াগো, রোডারিগো তাই ষড়যন্ত্র করে ওথেলোকে বিগড়ে দেয় ডোডিমনার বিরুদ্ধে। ডেসডিমনার সরল মন ওথেলোর প্রতি কোনো অভিযোগ না আনলেও শেষ পর্যন্ত তার হাতেই প্রাণ যায়।

ধীরে ধীরে ওথেলোর মানসিক পরিবর্তন লক্ষ করলেও ডেসডিমনা থেকেছে নির্বিকার। শয্যায় অপেক্ষমান ডেসডিমনার কাছে মৃত্যুদূতরূপী ওথেলোকে দেখেও নির্বিকার থাকে ডেসডিমনা। কোনো অভিযোগ-বাদ-প্রতিবাদ করেনি ডেসডিমনা। ভালোবাসার হাতেই জীবনদীপ নির্বাপিত হলো তার।

ডেসডিমনা আবেগপ্রবণ, রোমান্টিক, একনিষ্ঠ প্রণয়িনী। পক্ষান্তরে ওথেলো বিবেকহীন, বুদ্ধিহীন। যেই ডেসডিমনা সবাইকে উপেক্ষা করে কৃষ্ণাঙ্গ ওথেলোকে বিয়ে করলো সেই ওথেলোর সন্দেহপরায়ণ মন সবকিছু ধ্বংস করে দিলো। এখানে ওথেলো যে ইয়াগোর ষড়যন্ত্র বুঝতে পারেনি সেটায় মনে খটকা লাগে। কারণ ওথেলো তো মুর সেনবাহিনীর প্রধান জেনারেল। চরিত্রের সঙ্গে বুদ্ধির সমন্বয় ঘটেনি। সন্দেহ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ভালোবাসা, বিশ্বাস, আস্থা নয়।

শেক্সপিয়ারিয়ান নাটকের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য নায়ক ভালো-মন্দ; উভয় বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। কাহিনির মধ্যে অতিনাটকীয়তা আছে তবে তা শেষ পর্যন্ত ট্র্যাজেডিতে রূপ নিয়েছে। কিন্তু এই নাটকের চরিত্র ওথেলো, ডেসডিমনা যেন ভাগ্যের ওপর বিশ্বাসী। চরিত্রগুলো নিয়তি নির্ভরতা মেনে নিয়েছে। নাহলে ডেসডিমনা মৃত্যুদূত দেখে, সব বুঝেও মৃত্যুকে গ্রহণ করলো। আবার ওথেলোই বা কেন বুদ্ধিহীন আচরণ করে ষড়যন্ত্রের শিকার হলো?

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ