Skip to content

২রা ডিসেম্বর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | শুক্রবার | ১৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রৌঢ় নারীর বিয়েতে সমস্যা কোথায়

নারীর ক্ষেত্রে সমাজের নিয়মনীতি আজীবনই রক্ষণশীল পর্যায়ে। পুরুষের জন্য যেটা সমাজের চোখে পৌরুষ, নারীর ক্ষেত্রে সেই একই কাজ কলঙ্কের। কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীরা নিরাপদ নয়। আর একা নারীর জীবনে রয়েছে নানারকম চ্যালেঞ্জ। কন্যাশিশু থেকে শুরু করে প্রৌঢ়া নারী; কারও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি। জীবনের নানামুখী সমস্যাকে ডিঙিয়ে নারীরা তাদের জীবনকে চালিয়ে নিতে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। তবে একটি নির্দিষ্ট বয়স পার হলেই যে নারীর জীবনের সব আশা-আকাঙ্ক্ষা ঘুচিয়ে দেওয়া উচিত এটার কি ধর্মীয় কোন বিধান আছে?

ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশ এটি তবে দেশের বেশিরভাগ জনগণ মুসলিম। কোনো ধর্মের বিধানের কোথাও উল্লেখ নেই যে, একজন প্রৌঢ়া নারী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না। যেহেতু ধর্মমতে কোনো বিধিনিষেধ নেই বিবাহবন্ধনের, সেহেতু প্রৌঢ়ার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে সমস্যা কোথায়?

সমাজের মাঝে একটা শেকড় গজিয়ে উঠেছে, যার নেপথ্যে রয়েছে নারীকে শোষণ করা। একটা নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ করা। খুব হাস্যকর হলেও সত্য এদেশের বেশিরভাগ জনগণ ইসলামকে জীবনবিধান মানে কিন্তু পরক্ষণেই নিজেদের স্বার্থে তারা বিপরীতমুখী কথা বলে এবং প্রচার করে। একজন পুরুষের চারটা বিয়ের বিধান আছে। সে করতেও পারে। সেটাকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ফলাও করে বলেও। কেউ কেউ সুযোগকে কাজেও পরিণত করে। শুধু তাই-ই নয় পুরুষ যদি ষাটোর্ধ বয়সেও বিপত্নীক হন তবু তিনি আবার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। আর আমাদের সমাজে সেটা অতীব সাধুবাদ দিয়েই গ্রহণ করা হয়। কারণ তিনি পুরুষ। ফলে একা পুরুষের জীবন একাকীত্বময়, হতশাময়, বিষাদময়, বয়স্ক মানুষ দিনশেষে তার মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার কেউ থাকবে না! এ-ও কি হয়?

নানারকম কথার চাপাকষ্টে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হতাশায়-বেদনায় মুষড়ে পড়েন। আবার কোনো প্রৌঢ় পুরুষের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে সেখানে তো পুরুষতন্ত্রের অনেকটা প্রতিশোধপরায়ণ স্পৃহাও দেখা দেয়। ফলে তার পরিবার-পরিজন প্রাক্তন স্ত্রীকে দেখিয়ে পুরুষটির দ্রুত একটি সঙ্গী জুটিয়ে দিতে উঠেপড়ে লাগে। পুরুষটিও নতুন জীবনকে সাদরে গ্রহণ করে। বিপত্নীক পুরুষের ক্ষেত্রে এটাও দেখা যায়, স্ত্রীর মৃত্যুর ৪০ দিন পার না হতেই বাদ্য- বাজনা করে ঘরে নতুন বউয়ের আগমন ঘটে৷ পুরুষের সঙ্গে ঘটে চলা সমাজের নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা এটি।

ফলে পদক্ষেপ নারীকেই গ্রহণ করতে হবে। গোঁড়ামি না করে শেষজীবন পর্যন্ত নিজের আত্মমর্যাদা, আনন্দপূর্ণ জীবনকে প্রাধান্য দিতে হবে। নারীদের জাগরণ ঘটলেই নারীর মুক্তি সম্ভব। সে প্রৌঢ়া নারীর বিবাহবন্ধন হোক আর স্বামীর অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া হোক।

এবার আসুন প্রৌঢ়া নারীর বিবাহবন্ধনের পরিপ্রেক্ষিতে! এই নারীর ক্ষেত্রে প্রথম প্রচলিত বাক্য ‘বুড়ো বয়সে ভীমরতি’। এক্ষেত্রে স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে নারীটি তো সমাজে মুখ-ই দেখানোর যোগ্য থাকে না। কেউ তার ব্যক্তিক সমস্যাকে উপলব্ধি করে না। বরং ভারী ভারী গোলাবর্ষণ করে তার হৃদয়কে ক্ষত বিক্ষত করে দেয়। বিধবা প্রৌঢ়ার আবার বিয়ের কী দরকার! ঘরে ছেলে-মেয়ে আছে। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিলেই পারে। আশ্চর্যভাবে ঘটেও তাই। কতই তো প্রৌঢ়া নারী আছেন কুমারী কিংবা বিধবা। কয়জন ডিভোর্সি নারীর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে আজ অবধি? রাষ্ট্র ও ধর্মে কোথাও যেখানে নিষেধ নেই, সেখানে কেন এত বিদ্বেষ নারীর নতুনভাবে জীবনের পথে হাঁটার?

এর জন্য বিশেষভাবে দায়ী রক্ষণশীল মনোভাব। একজন প্রৌঢ় পুরুষ যদি নতুনভাবে জীবন শুরু করতে পারে, নারী কেন পারবে না? নারীর ক্ষেত্রে এই শৃঙ্খল কেন? পুরুষতন্ত্রের ফাঁদা জালে নারীরাও যুগ যুগ ধরে শিকারে পরিণত হয়েছে। আজও হচ্ছে। শৈশব থেকে মা-চাচি-দাদিরা মাথায় ঢুকিয়ে দেন, জীবন যেমন একটা, সংসারও একটাই। তাই যা ঘটে যায় যাবে, এই একের বাইরে তার যাওয়া চলবে না। অল্প বয়সে বিধবা হলে সেই স্বামীর স্মৃতি আষ্টেপৃষ্টে দাঁত চেপে পড়ে থাকতে হবে। তার নিরাপত্তা, একাকীত্ব, হতশা, কষ্ট এসবের কোনোই মূল্য নেই। শেষে একটা প্রচলিত বাক্য পুরুষতন্ত্রের নারী হলে এতটুকু সহ্য করতেই হয়! কী হাস্যকর সব নিয়মনীতি!

পুরুষতন্ত্রের এই মানসিকতা এর শেকড়-বাকড় গজিয়ে এতদূর অবধি চলে গেছে যে নারীরা এই ফাঁদ থেকে বের হতে পারেননি আজও। মানসিকভাবে নারীদের পঙ্গু করে ফেলার পাঁয়তারা সমাজের। নারীদের যত দূর্বল করে ফেলা যাবে, ঠিক ততটাই তাদের ওপর শোষণ-নিপীড়ন চালানো সহজ হবে। পুরুষতন্ত্রের কূটকৌশল নারীর দুঃখ-কষ্ট, একাকীত্ব, অসহায়ত্বকে তাই আমলে নেয় না। ধর্মের দোহাই যেখানে নেই সেখানে সামাজের রক্তচক্ষু দিয়েই তো নারীদের দমন করতে হবে৷

প্রৌঢ়া নারীর বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পথে একমাত্র অন্তরায় সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। যতদিন নোংরা মানসিকতার পরিত্যাগ না করা যাবে, ততদিন নারীরা মুক্তি পাবে না। তবে পুরুষতন্ত্র কখনোই চাইবে না, নারীরা স্বাধীনভাবে মাথা উঁচু করে বাচুক। ফলে পদক্ষেপ নারীকেই গ্রহণ করতে হবে। গোঁড়ামি না করে শেষজীবন পর্যন্ত নিজের আত্মমর্যাদা, আনন্দপূর্ণ জীবনকে প্রাধান্য দিতে হবে। নারীদের জাগরণ ঘটলেই নারীর মুক্তি সম্ভব। সে প্রৌঢ়া নারীর বিবাহবন্ধন হোক আর স্বামীর অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া হোক।

তবে আশার কথা, সমাজের নারীরা এখন কিছুটা চিন্তাধারার পরিবর্তন আনতে চেষ্টা করছে। পুরুষতন্ত্রের বুকে লাথি দিয়ে নারীরা তার আপন জগৎ সৃষ্টি করুক। বয়সের ফ্রেমে নয় জীবনকে জীবনের মতো স্বাভাবিক পথে চলার আত্মপ্রত্যয় গড়ে তুলুক নারীরা।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ