Skip to content

২১শে মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বউমেলা: লিঙ্গবৈষম্যের আরেক রূপ

জন্মের পর থেকেই কন্যাশিশু ও ছেলেশিশুর চাল-চলন, জীবনযাপন পদ্ধতিকে সমাজ ভিন্নধারায় চালাতে বাধ্য করে। ছেলে শিশু বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে যতটা অনুকূল পরিবেশ পায়, কন্যাশিশু ক্ষেত্রে ঠিক তার ব্যতিক্রম। শৈশব থেকেই কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য শুরু হয়। ছেলে শিশুটাকে মানুষের মতো মানুষ করে তোলার তাগিদ বাবা-মায়ের বা পরিবারের সদস্যদের যতটা থাকে, কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে ততটা নয়।

বেশিরভাগ বাবা-মায়ের প্রকট ইচ্ছে তার কন্যাকে সুপাত্রের হাতে তুলে দেওয়া। তাকে যতটুকু অক্ষরজ্ঞান দান করেন, সেটাও ঠিক এ লক্ষ্যেই। বাবা-মা বা পরিবার-পরিজন কন্যাশিশুটিকে শেখান না যে, তাদের নিজের একটা স্বাধীন জীবন আছে। যে জীবনের অধীশ্বর সে নিজে। আর এর জন্যই তাকে মানুষ হতে হবে। যে হাত পেতে কারও কাছ থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবন নির্বাহ করবে না। বরং নিজে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করবে। নিজে সুস্থভাবে বাঁচতে শিখবে আর পাঁচজনকেও সাহায্য করতে পারবে। এই সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের সমাজের বেশিরভাগ বাবা-মা’ই উদাসীন। তাদের মনোজগতে কন্যা সন্তানের দাসত্ব কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। তারা জানেন ধর্মীয় অনুশাসন। যার নেপথ্যে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বিরজমান। আর আমাদের নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এটাই জীবনবিধানরূপে অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। তবে হ্যাঁ যতটুকু পুরুষতান্ত্রিক সমাজের স্বার্থে যায়, ততটুকুই তারা বোঝেন। তার বাইরে তাদের কোনো বোধই কাজ করে না।

ঘর থেকেই কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যের বীজ বপন করা হয়। যা থেকে যায় সর্বক্ষেত্রেই। গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্রে সর্বত্রই নারীকে একের পর এক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। আর সীতার মতো বারবার নারীরা তাদের যোগ্যতা, দক্ষতা, সতীত্বের প্রমাণ দিলেও সমাজ তাদের একঘরে করেই রাখে। তারই প্রমাণ বউমেলা। কিন্তু নারীদের এমন ক্যাটাগোরাইজড করে ফেলার নেপথ্যে কী? কেনই বা বউমেলা নামকরণ করা হয়?

শব্দের মাঝেও যে লিঙ্গবৈষম্য লুকিয়ে থাকে এবং নারীকে পণ্য করে তোলা হয়, তার প্রমাণ বাংলা ভাষায় বহু। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীকে কোণঠাসা করতে তাদের মনমতো বহুশব্দের জন্ম দিয়েছে। যে শব্দগুলো শুধু নারীর ক্ষেত্রেই খাটে। পুরুষের জন্য লিঙ্গভেদে শব্দের জন্ম হয়নি। তবে বউমেলা শব্দটি দিয়ে যদি শুধু নারীদের উপস্থিতিকে নিশ্চিত করা হয়েছে, তা বোঝাই যায়। যেই মেলায় পুরুষের ন্যূনতম উপস্থিতিও থাকবে না। সেখানের ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই হবেন নারী।

বাড়িতে বাবা-ভাই-মা-দাদিরা যা মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়, সেটাকেই জীবনবিধান মনে করে। অন্যথায় পড়াশোনা, বুদ্ধিচর্চা, জ্ঞানেরবিকাশ ঘটিয়ে নারী হিসেবে নয় মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা।

বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে বউমেলা, বউবাজার নামে বাজার বা মেলা বসে। আর এখানে নারীরাই বেচাকেনা করেন। উদ্যোগটি যে অর্থেই নেওয়া হোক না কেন, এটি লিঙ্গবৈষম্যের মতোই সমাজের মাঝে ভাঙন সৃষ্টিকারী। এমনিতেই সর্বত্র নারীর জীবনযাপনের ওপর রেশ টেনে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের মানসিকতা সমাজের মাঝে আরও প্রকটভাবে নারী-পুরুষের লিঙ্গবৈষম্য তৈরি করবে। নারীদের এই বাজার বা মেলায় যখন পুরুষরা যাবে না বা সবার স্বাধীনতা থাকবে না, তখন পুরুষও নারীকে সর্বত্র বিচরণ করতে বাধা দেবে; এটাই স্বাভাবিক। এটি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রতিফলন।

পুরুষের সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়িয়ে নারীরা কাজ করতে পারে না এই ধরনের বাজার, মেলার উদ্দেশ্য সেটাই প্রমাণ করা। নারীকে মানুষ নয় বরং একটি লিঙ্গে আবদ্ধ করে রাখা। একটি শৃঙ্খল, বেড়ি পরিয়ে দেওয়া। যার বাইরে নারীরা অস্বাভাবিক। কথা হলো নারীরা পূর্ণ মানুষ। আর মানুষ হিসেবে পূর্ণ অধিকার তার থাকা চায়। আমাদের সমাজে কয়টা পুরুষ বাজার, কয়টা পুরুষ মেলা আছে?

এই ধরনের বিভেদ সৃষ্টির পেছনে আমাদের মানসিকতায় দায়ী। সর্বত্র নারীদের ঘরকুনো করে রাখার পাঁয়তারা। তার জন্য যে যে পন্থা দিয়ে নারীকে মানুষ নয় বরং নারী রূপে একটি শব্দসেঁটে দিয়ে বিকল করার চেষ্টা। বোঝানো হয় নারীরা সব পারে না, জানে না, করতে পারে না, চলতে পারে না। আর আমাদের সমাজের নারীরাও এতটাই বোকা যে সেটাকে সুবিধা মনে করে নিজেদের মানুষ রূপে নয় বরং নারী রূপে দেখতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। বাড়িতে বাবা-ভাই-মা-দাদিরা যা মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দেয়, সেটাকেই জীবনবিধান মনে করে। অন্যথায় পড়াশোনা, বুদ্ধিচর্চা, জ্ঞানেরবিকাশ ঘটিয়ে নারী হিসেবে নয় মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করা।

নারী-পুরুষের প্রধান পরিচয় মানুষ। আর মানুষ জীব হিসেবে একই গোত্রের। সেখানে শারীরিক গঠনের কিছু পার্থক্য যা। সেই পরিবর্তন যদি পুরুষ ভিন্ন নারী হয় তবে কিন্তু নারী ভিন্ন পুরুষও। তবে কেনো এত রেশারেশি নারীকে নিয়ে? সমাজের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। একমাত্র পুরুষতন্ত্রের মানসিক সুস্থতায় পারে নারীর প্রতি বৈষম্য কমাতে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ