Skip to content

২৩শে মে, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ | বৃহস্পতিবার | ৯ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

নিরাপদে বেড়ে উঠুক কন্যাশিশুরা

যত দিন গড়াচ্ছে আমরা আধুনিকতার বদলে মধ্যযুগের শাসনতন্ত্রে গিয়ে আটকে পড়ছি ! জাতি হিসেবে আধুনিকতার বুলি আওড়ালেও মস্তিষ্কে আজও বাসা বেঁধে আছে শোষণমূলক চিন্তা। কন্যাশিশু মানেই শোষিত হবে, নিপীড়িত হবে এই নিয়মতন্ত্রের বাইরে যেন আমরা আজও বের হতে পারিনি। একটি পরিবারে যতগুলোই ছেলে সন্তান জন্ম নিক না কেন, তা নিয়ে কখনো কারও মুখে খুব একটা বিরক্তি ভাব, কদর্য কথা শোনা যায় না। কিন্তু উল্টোটা ঘটলে প্রতিনিয়ত বেশ করুণার চোখে দেখা হয় ওই পরিবারটিকে।

আশেপাশে পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজন সবাই নাক-সিটকানি টাইপের নানাবিধ মন্তব্য করে। ১টির অধিক কন্যা সন্তান জন্ম নিলে মেয়েদের কিভাবে মানুষ করবে? বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে দেখার কেউ থাকবে না! বুড়ো বয়সে ছেলে সন্তান বাপ-মায়ের লাঠি, মরে গেলে কবরে মাটিটুকু দেওয়ার মতো কেউ থাকলো না, বংশের উত্তরাধিকার কেউই থাকবে না, এরূপ নানারূপ মন্তব্যে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।

শুধু যে বাইরের মানুষেরই এরূপ মন্তব্যে গিয়ে থেমে যায় চিত্রটা এমন নয় বরং বাবা-মাও তাদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। সেক্ষেত্রে সন্তানকে গড়ে তোলার চিন্তা যতটা তাদের মস্তিষ্কে কাজ করে তার চেয়ে বেশি আফসোস তাদের হয়! ফলে তখন থেকেই বেশিরভাগ বাবা-মা তাদের কন্যা সন্তানদের প্রতি সঠিক যত্নটুকুও নেন না। কারণ এই কন্যা মানুষের মতো মানুষ হলে তার কোনো কাজে আসবে না। বরং অন্যের ঘর আলো করবে। এটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই সাধারণ একটি ধারণা।

ফলে ছেলে সন্তান না থাকায় এই পরিবারগুলোতে মেয়ে সন্তানের প্রতি মন থেকেই একটা বিদ্বেষপরায়ণ মনেভাব দেখা দেয়। কোন রকমে মাধ্যমিকের গণ্ডি পার করলো কি না বাবা-মা পাত্রস্থ করার ব্যবস্থা করেন। সেক্ষেত্রে কন্যা শিশুর ‘জন্মই যেন আজন্ম পাপ’ হয়ে দাঁড়ায়! আবার যদি একই পরিবারে ছেলে-মেয়ে দুজনই থাকে তবে ধরেই নেওয়া হয় এটি একটি সুখী পরিবার। সেখানে কারও কোনো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না পরিবারটিকে। তখন এই কন্যা শিশুটি পরিবারেই নিপীড়িত হয়। ছেলে সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের যতটা দরদ কন্যা সন্তানের জন্য ঠিক ততটা নয়! এক্ষেত্রে মায়েরা হয়তো একটু বেশিই ছেলে সন্তানকে প্রাধান্য দেন। হাতেগোনা কিছু পরিবারের কথা বাদ দিলে বেশিরভাগের চিত্র একই রকম। মানসিকতাও একই রকম। যার প্রমাণ মিলবে বাল্যবিবাহের চিত্র উপস্থাপিত হলে। গড়ে ৫ জন পুরুষ বাল্যবিয়ের শিকার হন কি না সন্দেহ। সেই কাতারে মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত পরিবারের ছেলে সন্তানের থাকার প্রশ্নই ওঠে না! কিন্তু কন্যাদের ক্ষেত্রে খুবই স্বাভাবিক চিত্র।

কন্যাশিশুদের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে হলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ণ করা যায়, তবে একদিন আজকের কন্যাশিশুরা আগামীদিনে একটি সুস্থ সোনার দেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

দিন দিন মেয়েরা নিজেদের যোগ্যতাকে নানাভাবে প্রমাণের চেষ্টা করে চলেছে। দেশের জন্য সুনাম অর্জন করছে। কিন্তু এই কন্যারা সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ আজও পাচ্ছে না। পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক নানাকারণেই তাদের নিরাপদ পরিবেশ দেওয়া যায়নি। কিন্তু আজকের কন্যাশিশু আগামীদিনের ভবিষ্যৎ। জাতির মূল স্তম্ভ। কারণ নেপোলিয়ান বোনাপোর্ট বহু আগেই বলে গেছেন, ‘আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি শিক্ষিত জাতি দেবো।’ তবে সেই জাতি গঠনের নেপথ্যে যেই মমতাময়ী মায়ের অবদান তারাই কিন্তু সঠিক জীবন পাচ্ছেন না। তাদের বেড়ে ওঠাকে নিরাপদ করা যায়নি আজও। কিন্তু কন্যাশিশুদের নিরাপদ করে গড়ে তুলতে সমস্যা কোথায়?

কন্যাশিশুদের জীবনকে নিরাপদ করতে হলে রাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ তাগিদ দিতে হবে। রাষ্ট্রই পারে একজন কন্যাশিশুকে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ সৃষ্টি করতে। রাষ্ট্র যদি কঠোরহস্তে কন্যাশিশুর বেড়ে ওঠা নিশ্চিত করতে পরে তবে পরিবার, সমাজের ধারণা বদলাতে বাধ্য। আমরাজানি মানুষ অভ্যাসের দাস। ফলে রাষ্ট্রকে জাতির মধ্যে একটি অভ্যেস গড়ে তুলতে হবে। যেন তারা কন্যাশিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে বাধ্য হন। হঠাৎ করেই এ চিত্র পাল্টানো সম্ভব নয়। তবে দীর্ঘ দিনের প্রচেষ্টা চলতে থাকলে আজ থেকে ২০-২৫ বছর পরে হলেও জাতির জীবনে সুদিন আসবে। কিন্তু যদি কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয় তবে আজকের অপরাধ, অত্যাচার, নিপীড়ন বাড়বে বৈ কমবে না। ফলে যতই পরিবারগুলোকে সচেতন হতে বলা হোক না কেন, রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে।

স্কুলে কন্যাশিশুদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে এবং ঘরের বাইরে সর্বত্র কন্যাশিশুরা যেন কোনোরকম নিপীড়নের শিকার না হয়, হয়রানির শিকার না হয় সেজন্য স্কুলে বিশেষ মনিটরিং জারি রাখতে হবে। আজকের শিশুদের যতি সঠিক পরিচর্যা, নিয়মতান্ত্রিক জীবনের অভ্যস্ততা গড়ে তোলা যায়, তবে ভবিষ্যতে জাতি একটি সুস্থ পরিবেশ পাবে। তাই জাতিকে সুসভ্য করে গড়ে তুলতে বর্তমান শিশুদের প্রতি গভীর মনোযোগ দিতে হবে। শিশুদের সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। সাইকেলিং, স্কিপিং, ব্যাডমিন্টন, আবৃত্তি, গান, নৃত্য প্রভৃতি কাজে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

খেলাধুলার জন্য উন্মুক্ত মাঠের ব্যবস্থা করতে হবে। যার ফলে শিশু বয়স থেকেই তাদের মধ্যে জ্ঞানের বিকাশ ঘটতে শুরু করবে। দায়িত্ব পালন, নিয়মতান্ত্রিক জীবনের ধারাবাহিকতা গড়ে উঠবে। বাঙালি জাতি হিসেবে সংস্কৃতির ধারক-বাহক হয়ে উঠবে।

কন্যাশিশুদের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে হলে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী যদি প্রতিটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ণ করা যায়, তবে একদিন আজকের কন্যাশিশুরা আগামীদিনে একটি সুস্থ সোনার দেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

ডাউনলোড করুন অনন্যা অ্যাপ