Skip to content

২২ মে, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

প্রায়শ্চিত্ত: পুরুষতন্ত্রের ফাঁদে নারীর জীবনগাথা

প্রায়শ্চিত্ত: পুরুষতন্ত্রের ফাঁদে নারীর জীবনগাথা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রায়শ্চিত্ত’ গল্পটি ‘সাধনা’ পত্রিকার ১৩০১ অগ্রহায়ণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। গল্পের কাহিনী গড়ে উঠেছে বিন্ধ্যবাসিনী ও তার স্বামী অনাথবন্ধুকে কেন্দ্র করে। ঘরজামাই অনাথ নিজেকে ‘অতিপণ্ডিত’ ভাবে। পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দেয় না। এরপর কলেজ ছেড়ে দেয়। কিন্তু স্ত্রীকে বোঝায়, তার জন্য ‘এ পরীক্ষা নয়’। সে এত কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নয় যে, তাকে কলেজের পরীক্ষায় পাস দিতে হবে। বিন্ধ্যও স্বামীর কথায় আস্থা রাখে, স্বামীর যুক্তিকেই ‘ধ্রুব’ জ্ঞান করে। তার স্বামী আর দশটা পুরুষের চেয়ে ভিন্ন সেটা যেন বিন্ধ্যও আত্মায় লালন করে।

এদিকে অনাথের মধ্যে দেখা দেয় অতি দাম্ভিকতা। একদিকে স্বামীর প্রচণ্ড ধূর্ত স্বভাব, অন্যদিকে স্ত্রীর পতিপরায়ণ-স্বভাব গল্পকে দিয়েছে জটিল মনস্তত্ত্বের ভিন্নমাত্রা। অনাথবন্ধু সরলা স্ত্রীকে পেয়ে ইচ্ছের দাস বানিয়ে রাখে। ঘরজামাই থেকেও স্ত্রীর সঙ্গে আচরণে প্রভুত্ব দেখানোর ক্ষেত্রে কোনো কমতি নেই। আর বিন্ধ্যবাসিনীকে স্বামীর সেই প্রভুত্ব বিনাবাক্য ব্যয়ে মেনে নিতে দেখা যায়। বিন্ধ্য আবহমান বাংলার নারীর মানসিকতার প্রতীক। রবীন্দ্রনাথ নিজেও নারীর এই বলয় থেকে তাকে বের করে আনেননি বরং পুরুষতন্ত্রের নিগড়ে নিপীড়িত-নিযার্যাতিতের প্রতিভু হিসেবেই তৈরি করেছেন। স্বামীর শত প্রবঞ্চনা-গঞ্জনার বিরুদ্ধে মুখ খোলে না বিন্ধ্য। উল্টো স্বামীকে ঈশ্বর জ্ঞান করে তার পূজায় নিজেকে সদা ব্যস্ত রাখে। বিন্ধ্যর এই পতিভক্তি যতটা ভালোবাসার, তারচেয়েও বেশি মেরুদণ্ডহীন, পশ্চাদপদ মানসিকতার প্রকাশ। নারী-পুরুষের প্রভুত্ব শিকার করে সেখানে যুক্তি-বুদ্ধি কিছুরই উপস্থিতি থাকে না।

পুরুষ সমাজ তাদের সুবিধার জন্য নারীকে নানা শৃঙ্খল পরিয়ে বশ করে রেখেছে। নারীও পতিব্রতা সাজতে গিয়ে সব ধরনের নির্যাতন-অন্যায়কে হাসিমুখে মেনে নেয়। অনাথ যখন শ্বশুর বাড়ির টাকা চুরি করে বিলাত চলে যায়, তখন সেই চুরির দায় বিন্ধ্য নিজের কাঁধে নেয়। কিন্তু কেন? এর জবাব খুঁজতে গেলে, পাওয়া যাবে, সেখানে ভালোবাসার টান যতটা, তারও বেশি নারীর মানসিকতার বৃত্তকে ভাঙতে না পারার ব্যর্থতা। শত সমস্যার সম্মুখীন হলেও নারী তার স্বামীর সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চায় না। এর কারণ শৈশব থেকেই নারীর মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয় স্বামীর মুখে মুখে কথা বলতে নেই! উচ্চস্বরে হাসতে নেই, নিজের ভাগ বুঝে নিতে নেই। বাবা-ভাই-স্বামীর কথাই শিরোধার্য। তারা পরিবারের কর্তা। তাই তাদের গাইডলাইনের বাইরে গেলেই বিপদ। যদি যুক্তির কথা হয়, তাও নারী সেখানে চুপ থাকবে; এমন মানসিকতা লালন করে নারীরা। তেমনি বিন্ধ্যর মানসিকতা। সেও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নারীর জীবনকে গড়ে তোলা ছকের বাইরের যেতে পারে না। যেতেও চায়নি। বিন্ধ্যের কাছে স্বামী দেবতুল্য। সেখানে পাপ-পঙ্কিলতার ছোঁয়া থাকতে পারে বলে মানতে পারে না বিন্ধ্য। এখানে বিন্ধ্যর সারল্যই তার জন্য বিনাশ ডেকে আনে। ‘যে বিন্ধ্য বাপের কাছে কখনো অর্থ প্রর্থনা করিতে পারে নাই এবং যে স্বামীর লেশমাত্র অসম্মান পরমাত্মীয়ের নিকট হইতেও গোপন করিবার জন্য প্রাণপণ করিতে পারিত, আজ একেবারে উৎসবের জনতার মধ্যে তাহার পত্নী-অভিমান, তাহার দুহিতৃসম্ভ্রম, তাহার আত্মমর্যাদা চূর্ণ হইয়া প্রিয় এবং অপ্রিয়, পরিচিত এবং অপরিচিত সকলের পদতলে ধূলির মতো লুণ্ঠিত হইতে লাগিল।’

অনাথ তো টাকা চুরি করে বিলাতে চলে গেলো কিন্তু একবারও বিন্ধ্যের জীবনে কী ঘটবে, সে কথা মনেও আনেনি। অন্ধ ভালোবাসার কারণে স্বামীর শত অপরাধ অবলীলায় ক্ষমা করে দিয়েছে, যার সুযোগ গ্রহণ করেছে অনাথ। বিলেত থেকে ফিরে আবার বিন্ধ্য’র বাবার সম্পত্তি করায়ত্ত করার চেষ্টা করেছে।গল্পে পায়, ‘এতদিনকার তুচ্ছ জীবনের সমস্ত দুঃখ এবং ক্ষুদ্র অপমান দূর হইয়া সে আজ তাহার পরিপূর্ণ পিতৃগৃহে সমস্ত আত্মীয়-স্বজনের সমক্ষে উন্নতমস্তকে গৌরবের আসনে আরহণ করিল। স্বামীর মহত্ত্ব আজ অযোগ্য স্ত্রীকে বিশ্বসংসারের নিকট সম্মানাস্পদ করিয়া তুলিল।’

অনাথ এতটাই ধূর্ত যে বিলাতি নারীকে বিয়ে করলেও বিন্ধ্য সে সম্পর্কে কিছু আঁচ করতে পারেনি বা চায়ওনি। কারণ তার কাছে অনাথবন্ধু প্রভু। আর প্রভুর শুধু দাসত্ব করা যায়। প্রশ্ন তোলা জায়েজ না। যে কারণে বিন্ধ্য পতিসেবায় ব্যস্ত থাকলেও পতির স্খলন সম্পর্কে খোঁজ নেয়নি। শেষ পর্যন্ত স্বামীর মুখোশ খুলে গেলেও বিন্ধ্য নিজের অবস্থান থেকে নড়ে না। সে বরং নিয়তির হাতেই নিজেকে সমর্পণ করে। এমনকি কখনো আত্ম-জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হয় না। ঠিক-বেঠিক সম্পর্কেও কোনো প্রশ্ন তোলে না। এক্ষেত্রে বিন্ধ্যকে যতটা দোষ দেওয়া চলে, তারচেয়ে বেশি আঙুল তুলতে হয় সমাজব্যবস্থার দিকে। কেন নারীকে পুরুষতন্ত্রের দাসিতে পরিণত করা হয়! কেন নারীকে তার যৌক্তিক দাবি নিয়ে দাঁড়াতে দেয় না। পরিবারগুলো কেন নারীকে ‘প্রথম ঘরই ঘর, প্রথম বরই বর’ ভাবার শৃঙ্খলে আবদ্ধ রাখে? কেন নারীর মনে সেঁটে দেওয়া হয়, ‘বেনারসি পরে স্বামীর ঘরে যেতে হয়, কাফনের কাপড় পরে বের হতে হয়!’

প্রায়শ্চিত্ত গল্পের নায়িকা ‘বিন্ধ্য’র সমস্যা আবহমান নারীর সমস্যা। তাদেরই জীবনচেতনার প্রতীক সে। খোদ রবীন্দ্রনাথও নারীকে নিগড় থেকে মুক্তি দিতে চাননি। তার মধ্যে যুক্তি-বুদ্ধি-তর্কবোধ দেননি। এই গল্পে রবীন্দ্রনাথ সাংবাদিক প্রতিবেদনের মতো শুধু সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন। কিন্তু সেই সমাজ পরিবর্তনের কথা বলেননি। তাই গল্পটি শেষপর্যন্ত পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে নারীকে কোনো স্বপ্ন দেখায় না। বরং পুরুষতন্ত্রের নিগড়ে নারীর জীবনগাথাকে প্রকাশ করে।

অনন্যা/জেএজে