Skip to content

৪ঠা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | মঙ্গলবার | ১৯শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

নারীর উচ্চশিক্ষার পথে বাধা কেন

অর্থনীতি, শিক্ষাসহ বিভিন্ন সূচকে দেশ এগিয়ে গেলেও নারীদের উচ্চশিক্ষার পথ এখনো ‍দুর্গম বলে মনে করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিকূল সমাজব্যবস্থা, সদিচ্ছার অভাবে নারীর উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে আছে। এছাড়া, চাকরিক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশও নারীর উচ্চশিক্ষার পথে বড় বাধা। পাক্ষিক অনন্যা’র সঙ্গে একান্ত আলাপকালে তারা  এই অভিমত ব্যক্ত করেন।

জানতে চাইলে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শারমিন রেজোয়ানা বলেন, ‘যদিও সম্প্রতি বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে পেছনে ফেলে নারী উন্নয়ন সূচকের নানা দিক থেকেই ঈর্ষণীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে, তবু এ কথাও সত্যি যে, উচ্চশিক্ষায় তারা এখনো পর্যন্ত পিছিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থীদের সংখ্যা মাত্র এক-তৃতীয়াংশের কিছু বেশি। চিকিৎসা ও আইনসহ পেশাগত শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণের হার এর সামান্য বেশি। বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩ হাজার ৩৬০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী ১২ হাজার ২৩৮ জন। আর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ হাজার ৮৫৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রী মাত্র ১ হাজার ৮৭৩ জন। এই পরিসংখ্যানগুলো থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, উচ্চশিক্ষায় নারীরা কতটা পিছিয়ে আছে।’ 

শারমিন রেজোয়ানা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নারীর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম প্রতিবন্ধকতা অর্থনৈতিক অবস্থা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। এখনপর্যন্ত সমাজের অনেকেই ভেবে থাকেন, ছেলে সন্তানই এক সময়ে পরিবারের হাল ধরবে, আর কন্যা সন্তান মানেই বিয়ের পরে পর! তাই পুত্র সন্তানের উচ্চশিক্ষার বিষয়ে তারা অর্থনৈতিক ও মানসিক সহায়তা দিতে যতটা আগ্রহী, মেয়েদের ক্ষেত্রে ততটা নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘এছাড়া আমাদের মধ্যবিত্ত সমাজের কিছু সামাজিক সংস্কার এবং রক্ষণশীলতার একটি বড় প্রভাব রয়েছে এই ক্ষেত্রে। যেমন ভাবা হয়, মেয়েরা কর্মমুখী শিক্ষায়,  চ্যালেঞ্জিং কর্মক্ষেত্রে, ব্যবসা-বাণিজ্যে ভালো করতে পারবে না, বয়স বেশি হয়ে গেলে ভালো বিয়ে হবে না ইত্যাদি। এ কারণে উচ্চ মাধ্যমিকের পরে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। আর বিবাহিত নারীদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথটা যে কঠিন, এটা বলাই বাহুল্য।’

শারমিন রেজোয়ানা

এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘আবার অনেক নারী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেও, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সুযোগ পায় না, করে না, বা দেওয়া হয় না। এই সব কিছুই নারীদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ ও তার কার্যকারিতা নিয়ে একটি  শূন্যস্থান তৈরি করে। আবার এ কথাও সত্যি, আমাদের দেশের  উচ্চশিক্ষায় সুযোগ সুবিধা অপর্যাপ্ত। যেমন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজগুলোতে কিন্তু পর্যাপ্ত আবাসনের সুযোগ নেই। আবার সামাজিক নিরাপত্তার অভাব রয়েছে, গণপরিবহনে চলাচলেও রয়েছে হয়রানি আর ঝুঁকির ভয়। এছাড়া উচ্চশিক্ষার ব্যয়ও বেশি। সরকার ও বিভিন্ন এনজিও’র পক্ষ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে কন্যা শিশুদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া হলেও উচ্চ পর্যায়ের কিন্তু কোনো সহায়তা নেই। ফলে এই পর্যায়ে শিক্ষাব্যয়ও বেশি। এই সব কারণে উচ্চমাধ্যমিকের পরে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের অংশ গ্রহণের মাত্রাটা হুট করেই যেন নিচের দিকে নেমে যায়।’

কুবির এই শিক্ষক বলেন, ‘আমি মনে করি, পরিবার ও কর্মক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে উচ্চশিক্ষায় নারীদের সংখ্যা বাড়বে। তবে নারীকে শুধু উচ্চশিক্ষিত হলেই চলবে না, পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও অংশ সুনিশ্চিত করতে হবে। এতে অর্থনৈতিক সাবলম্বিতার পাশাপাশি সে তার অর্জিত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা পরিবার,  সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে প্রয়োগ করতে পারবে।’

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুঞ্জু রানী দাস বলেন, ‘‘নব্বই দশকের ঠিক মাঝামাঝি। হাওরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অতি সাধারণ পরিবার। টিনের চালাঘেরা খুপরি ঘরে জন্ম নেওয়া মেয়েকে সমাজ অভ্যর্থনা জানায়, ‘অহ…! চেরি (মেয়ে) অইসে! চেরি দিয়া কিতা করবো?’ এই প্রশ্ন ছোড়ে। ‘চেরি দিয়া কিতা করবো?’-এই প্রশ্নটি শুধু নব্বইয়ের দশকেই নয় কিংবা শুধু হাওরাঞ্চলের নয়। একুশ শতকের এই সময়েও সামাজিক, পারিবারিক এমনকি বৃহৎ অর্থে এই বঙ্গ ভূখণ্ডেও সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসাচিহ্ন হয়ে আছে নারীর জীবনকে কেন্দ্র করে এই বাক্যটি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘আইয়ামে জাহেলিয়ার যুগে কন্যা শিশুকে জীবন্ত কবর দিয়ে সমাজ তথা পুরুষতন্ত্রের ধ্বজাধারীরা নিজেদের দায় চুকাতেন। বর্তমানে অবশ্য শুধু শারীরিক নয়, জন্মের পরপরই ‘অবলা-অসমর্থ’ প্রভৃতি বিশেষণ জুড়ে দিয়ে নারীর মানসিক শক্তির কবর খোঁড়ার কাজটুকু সম্পন্ন করা হয়।’

মুঞ্জু রানী দাস বলেন, ‘‘পারিবারিক প্রেক্ষাপটে দৃষ্টি ফেরালে চোখে পড়ে লিঙ্গভেদের কতটা উৎকর্ষ লাভ করেছে এই বাংলায়। ছেলে সন্তানদের প্রাইভেট টিউটরের যেখানে অভাব হয় না, মেয়ের বেলায় সেখানে পরিবারের অভাব ঘোচেনা বিধায় নারী শিক্ষার্থীর ভাগ্যে প্রাইভেট টিউটর জোটে না। যদিও বা প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে যায় তৎক্ষণাৎ পরিবার, সমাজ ‘বিয়ে দাও’ বলে তারস্বরে চিৎকার জুড়ে দেয়। ‘বিয়ের পর বরই পড়াবে’ এই বাক্যকে ধারণ করে নারীর উচ্চশিক্ষার পায়ে পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়।’’ তিনি আরও বলেন, ‘সামাজিক মূল্যবোধ নষ্ট হয়ে যাবে। সমাজ বিনষ্ট হবে, এমন চিন্তাও আমাদের তথাকথিত সমাজতাত্ত্বিকদের কম নয়। উচ্চশিক্ষা গ্রহণে নারী সামাজিক মূল্যবোধ হারাবে, সমাজে বিরূপ প্রভাব পড়বে; এমনকি উচ্চশিক্ষিত নারীদের সংস্পর্শে সাধারণ নারীদের মানসিক পরিবর্তন আসতে পারে; এরকম বোধও নারীর উচ্চশিক্ষার পথে অদৃশ্য দুর্গের মতো দণ্ডায়মান।’

মুঞ্জু রানী দাস

নোবিপ্রবির এই শিক্ষক আরও বলেন, ‘বিবাহিত নারীদের ক্ষেত্রে স্বামী নামধারী প্রভুরা সংসারের শেকল পরাতেই অভ্যস্ত। অনেকক্ষেত্রে সমমানের শিক্ষা কিংবা স্বীয় শিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষিত নারীদের বেলায় পুরুষরা হীনমন্যতায় ভোগে। মানসিক অসন্তোষের শিকারে পরিণত হতে হয় নারীকে। নারীর নিজের জীবনের চাবিকাঠির খবরাখবর স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির হাতেই ঘুরপাক খেতে থাকে।’ তিনি বলেন, ‘নারীর উচ্চশিক্ষায় বাহ্যিক এ সব প্রতিবন্ধকতার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে নারীর অভ্যন্তরীণ বাধা যা তার স্বয়ং সৃষ্ট। পাশ্চাত্যে যখন চিন্তা-চেতনা ও মননের গঠনের জন্য নারীরা উচ্চশিক্ষার দ্বারস্থ হয় সেখানে আমাদের সমাজে নারীরা উচ্চশিক্ষাকে বিবাহের অন্দরমহলে একটি উন্নত মানের সার্টিফিকেট হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলেও তার সারমর্মে প্রবেশ করতে পারে না।’ 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) পালি অ্যান্ড বুদ্ধিস্ট স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক রোমানা পাপড়ি বলেন,  ‘সব বাধা পেরিয়ে নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই যাত্রাপথে নারীদের রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা৷ নিজের লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা থাকলেও অনেক সময় দেখা যায় নানা বাধা-বিপত্তির কারণে তা অর্জন করা সম্ভব হয়ে ওঠে না।  বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মেয়েদের উচ্চ শিক্ষার বাধা অনেকটা সামাজিক গোঁড়ামি,  পরিবারের  অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা, কর্মসংস্থানের সংকট,  উৎসাহ ও ইচ্ছার অভাব। সামাজিক গোঁড়ামি হলো: লেখাপড়া বেশি হলে মেয়েরা স্বাবলম্বী হয়। তখন তারা সংসারে মনোযোগ দিতে পারে না। ফলে অনেক সময় উচ্চশিক্ষিত মেয়েদের  সংসার টেকে না ও মেয়ারাই ডিভোর্স দেয়।’

ঢাবির এই শিক্ষক বলেন, ‘সমাজে আরেকটি কুসংস্কার যে, মেয়েরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করলে বয়স হয়ে যায়। তখন এই বয়সে মেয়েদের পাত্রস্থ করা কঠিন। এ কথা ভেবেই পরিবার ও সমাজ মেয়েকে পাত্রস্থ করে। বিয়ের পর নারীর উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থাকলেও সেটা পূরণ হয় না। কারণ নারীর সন্তান লালন-পালন ও দু’হাতে সংসার সামলানো কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। যদি আবার একক পরিবার হয়, তাহলে তো উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন অধরা থেকে যায়। আরেকটি কারণ হলো পরিবারের অর্থনৈতিক দুরবস্থাও নারীদের উচ্চ শিক্ষার অন্যতম বাধা।’

রোমানা পাপড়ি

নারী শিক্ষার অনেক সুযোগ (বিনামূল্যে বই ও  উপবৃত্তি) থাকলেও সেটা দিয়ে বর্তমান সময়ের জন্য উচ্চ শিক্ষার জন্য যথেষ্ট নয় মন্তব্য করে ঢাবির এই শিক্ষক বলেন, ‘শিক্ষা উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যয় ও একই পরিবারের অনেক সন্তানের শিক্ষাদানের ব্যয় পরিবার বহন করতে পারে না। ফলে বাধ্য হয়ে নারী শিক্ষাগ্রহণ থেকে বঞ্চিত হন৷  নারীদের যে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন, তা মাটি চাপা পড়ে যায়। উচ্চশিক্ষা শেষে যে নারীরা চাকরির প্রত্যাশা রাখে, সেখানকার চিত্রটাও হতাশাজনক। নিয়োগ প্রক্রিয়ার জট ও জটিলতা, যথাপোযুক্ত কর্মক্ষেত্রের অভাব, কর্মক্ষেত্রে নারীদের নানা বৈষম্য ও চাকরির প্রতিযোগিতাও নারী উচ্চশিক্ষার জন্য দায়ী। এছাড়া, পরিবারের সমর্থ আছে কিন্তু নারীদের উচ্চ শিক্ষায় অনেক পরিবারের অসহযোগিতা ও উৎসাহের কারণে  (নিরাপত্তা ও হয়রানি) বাধা হয়ে দাঁড়ায়৷ বর্তমানে আবার আরেকটি বিষয় দেখা যায়, অনেক নারীর উচ্চশিক্ষার সুযোগ থাকলেও তাদের ব্যক্তিগত অনীহার কারণে বঞ্চিত হতে হয়।  তারপরও  সমাজের  গদ-বাঁধা নিয়মকে আঙুল তুলে দেখিয়ে অনেক নারী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্রে ও বহির্বিশ্বে অসাধারণ ভূমিকা রাখছে। সর্বোপরি বাংলাদেশের জনসংখ্যা যেমন নারী-পুরুষ সংখ্যায় সমান ও সমতা সমান, ঠিক তেমনি নারীদের উচ্চশিক্ষার হার পুরুষের সমানুপাতিক হোক এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করি।’

ঢাকার  স্কলার্স স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মারুফা আখতার বলেন,  ‘বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তির উৎকর্ষে বহু দিকে এগিয়ে গেলেও পুরুষতন্ত্রের বেড়াজাল ছিঁড়ে নারী এখনো কর্ম সমতায় সেভাবে আসতে পারেনি৷ সে চিত্রের প্রমাণ গবেষণা ও জরিপে পাওয়া যায়। তবু প্রযুক্তিনির্ভর পৃথিবীতে নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে সফলতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। নিজেদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার দরুণ তারা তাদের স্থানকে করেছে প্রদীপ্ত। তবুও তাদের পদচারণার যে প্রতিকূলতা, যুগের আবর্তে এর চেহারা পরিবর্তন হয়েছে মাত্র কিন্তু শেষ হয়ে যায়নি। প্রতিটি পর্যায়ে নারীদের অতিক্রম করতে হচ্ছে পাহাড়সম সমস্যা।’

মারুফা আখতার

মারুফা আখতার বলেন, ‘পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নারীর প্রতি এই বৈষম্য লক্ষ করা যায়। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা এগিয়ে থাকলেও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এই চিত্র ভিন্ন। বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে পুরুষশাসিত সমাজের জাঁতাকলে নারীকে এখনো গৃহিণী, সন্তান উৎপাদন ও লালনকারী, জৈবিক চাহিদা পূরণকারী ও পরিবারের সদস্যদের সেবাযত্নকারী হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। ফলে পরিবারে মেয়েরা পড়ালেখার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ থেকে বঞ্চিত। এরপর সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে নারী যখন শিক্ষাক্ষেত্রে পৌঁছে, সেখানে থাকে নানারকম ভয়-ভীতি। যৌন হয়রানির তার মধ্যে অন্যতম। তাই নারীর উচ্চ শিক্ষায় প্রয়োজন সমাজের সব ক্ষেত্রে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। তবেই সফল হবে নারী। উন্নত হবে সমগ্র জাতি, সমৃদ্ধ হবে দেশ।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী শামিমা নাসরিন সোহানা বলেন, ‘একটি মেয়ের জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়। তাকে রীতিমতো লড়াই করে টিকে থাকতে হয় সমাজে। মুখে যতই  নারী-পুরুষ সমান অধিকার বলা হোক না কেন, এ দেশের প্রায় ৮০% মানুষের মাঝেই নারীকে খাটো করে দেখার মানসিকতা বিদ্যমান। এই ৮০% যে শুধু পুরুষ, তা নয়; এর মাঝে নারী নিজেও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া উচ্চ শিক্ষা অর্জনের পর পেশা নির্বাচনেও তাকে এমনভাবে সতর্ক থাকতে হয়, যেন তাতে তিন কূলই রক্ষা করে চলা যায়।’ তিনি বলেন, ‘অনেকে আবার, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অন্যের অভিমতের প্রাধান্য দিতে গিয়ে নিজের ক্যারিয়ার বিসর্জন দেয়। চাকরিক্ষেত্রে নারীবান্ধব পরিবেশের ঘাটতিও নারী উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে অন্যতম বাধা। সুতরাং, নারী উচ্চশিক্ষার পথে বাধা কেন?—এই প্রশ্নের উত্তরে কোনো একক কারণকে দায়ী করা যাবে না।’

শামিমা নাসরিন সোহানা

শামিমা নাসরিন সোহানা আরও বলেন, ‘পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি, প্রতিকূল সমাজ ব্যবস্থা, সদিচ্ছার অভাব, চাকরিক্ষেত্রে প্রতিকূল পরিবেশ—প্রভৃতি ফ্যাক্টরগুলো এক্ষেত্রে সমন্বিতভাবে কাজ করছে। একজন নারী হয়ে বলতে পারি, আমাদের চলার পথ মসৃণ নয়। মানসিকভাবে খুব দৃঢ় না হলে অতল গহবরে নিমজ্জিত হতে বাধ্য।’