Skip to content

২রা অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ | রবিবার | ১৭ই আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ

শরৎচন্দ্রের ‘বিলাসী’: সর্বংসহা বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি

বাংলা কথাসাহিত্যের জগতে শক্তিশালী ও ক্ষুরধার লেখক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে স্থান দখল করে আছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। অপারাজেয় এই কথাশিল্পী সাধারণ মানুষের জীবন কাহিনিকে সাবলীল ও মর্মস্পর্শী ভাষায় শিল্পিত রূপ দিয়েছেন। অন্ধত্ব, কুসংস্কার মানুষকে শুধু বিবেকবর্জিত পশুরূপেই গড়ে তোলে এমন নয় বরং জীবন চেতনার প্রকৃত সত্য তাদের অজ্ঞানতার কাছে ম্লান হয়ে যায়। যার ফলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এই শ্রেণি। শুধু কিঞ্চিৎ এবং খুবই ঠুনকো চেনতায় জীবন পার করে দেয় তারা। শরৎচন্দ্রের বিলাসী গল্পে এমনই এক শ্রেণির উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়েছে।

শুধু যে গোড়ামির সাক্ষাৎ ঘটেছে, এমন নয়; লেখক স্বয়ং কড়া চপেটাঘাতও করেছেন। ‘বিলাসী’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ভারতী পত্রিকায় ১৩২৫ বঙ্গাব্দ(১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দ) বৈশাখ সংখ্যায়। এই গল্পে লেখক ন্যাড়া নামক যুবকের জবানিতে নিজের প্রথম জীবনের ছায়াপাত ঘটিয়েছেন। জাতিগত বিভেদ ও হিন্দুধর্মের সংকীর্ণ সীমা পেরিয়ে মানব- মানবীর প্রেমই এখানে মহিমান্বিত হয়েছে। প্রথার বিরুদ্ধে সমাজকে জাগরিত করার ক্ষেত্রে শরৎ সাহিত্যের জুড়ি মেলা ভার।

তাই রাতের অন্ধকারে পাশবিকতার শিকার হয় বিলাসী। সমাজের চোখে আজও বিলাসীদের পরিবর্তন হয়নি। সমাজ নামক বেড়াজালে আটকে আছে বিলাসীর আর্তদান।

‘বিলাসী’ সর্বংসহা বাঙালি নারীর প্রতিচ্ছবি। গল্পটি গড়ে উঠেছে এক মহীয়সী নারীর প্রেম, ত্যাগ, তিতিক্ষার কাহিনি। গল্পটিতে প্রেমের সঙ্গে একই সমান্তরালে স্থান করে নিয়েছে জাত-পাত ভেদ, অন্ত্যজ শ্রেণির জীবন চারিত্র্য, স্বজনহীন এক মানবের বেদনাবিধুর জীবন। যেই জীবনকে সেবা, ভালোবাসায় জয় করে নিয়েছে বিলাসী। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বিলাসী ও মৃত্যুঞ্জয়। এছাড়া আরও একটি চরিত্র বিশেষভাবেই স্থান করে নিয়েছে মৃতুঞ্জয়ের জ্ঞাতি খুড়া। যার বৌদলতে মৃতুঞ্জয়ের জীবনে অন্ধকার ঘনীভূত হয়। মৃত্যুঞ্জয় মিত্তির বংশের এক অনাথ যুবক। থার্ড ক্লাসের গণ্ডি সে কোনদিনই পেরুতে পারেনি। সেকেন্ড ক্লাসে বা ফোর্থ ক্লাসে পড়ার ইতিহাসও জানা যায় না। গ্রামের এক প্রান্তে বিশাল আম-কাঠালের বাগান। তার মধ্যে একটা পোড়ো-বাড়ি, সেখানেই মৃত্যুঞ্জয়ের বাস। আম- কাঁঠালের বাগান থেকে যা উর্পাজিত হয়, তা দিয়েই মৃতুঞ্জয় নিজের এবং গ্রামের অন্যদেরও উপকার করতো। যদিও সে উপকার স্বীকার তো দূরে থাক মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে কথা বলেছে, এটাই কেউ স্বীকার করতো না।

গ্রামের মধ্যে তার এমনই সুনাম। এই মৃত্যুঞ্জয় হঠাৎ কঠিন অসুখে পড়ে শয্যাশায়ী হয়। মালপাড়ার এক বুড়া মাল তার চিকিৎসা করে। আর তার মেয়ে বিলাসী দিন-রাত সেবা করে তাকে যমের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে আনে। মৃত্যুঞ্জয়ের শয্যাশায়ী অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে মুক্তি মেলে এবং নীচু জাতের সাপুড়ে কন্যা বিলাসীকে বিয়ে করে। মৃত্যুঞ্জয়ের জ্ঞাতি খুড়া অন্নপাপের দোষে দোষী করে গ্রাম ছাড়া করে তাদের। সবিশেষ সাপুড়ে পেশায় মৃত্যুঞ্জয়কে দেখা যায়। একপর্যায়ে সাপের কামড়েই তার মৃত্যু ঘটে। পতির মৃত্যু হলে সতীর জীবন রাখা দায়। সেই চিরন্তন রীতির ধারাবাহিকতায় এবং ভালোবাসার চরমতম পীড়ায় বিলাসীর আত্মহনই এই গল্পের মূল কাহিনি।

বিলাসী বাঙালি নারীর প্রতীক। বাঙালি নারীরা যেমন শত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করেও অন্যকে সুখে রাখতে সব ত্যাগ করে। বিলাসীও নিজের জীবনের মায়া না করে মৃত্যুঞ্জয়কে রোগশয্যা থেকে সুস্থ করে তোলে। এক্ষেত্রে ন্যাড়ার চোখে ধরা দিয়েছে বিলাসীর অর্ধমৃত জীবন যদিও অন্নপাপ এবং নীচু জাতের গোঁড়ামির কাছে ন্যাড়ার কাছে তা ম্লান হয়ে পড়ে। স্বয়ং লেখকের ন্যাড়ারূপী জবানিতে উঠে এসেছে এভাবে,

‘তাহার বয়স আঠারো কি আটাশ ঠাহর করিতে পারিলাম না। কিন্তু মুখের দিকে চাহিবামাত্র টের পাইলাম, বয়স যাই হোক, খাটিয়া খাটিয়া আর রাত জাগিয়া জাগিয়া ইহার শরীরে আর কিছু নাই৷ ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসী ফুলের মত। হাত দিয়া এতটুকু স্পর্শ করিলে, এতটুকু নাড়াচাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে।’

ন্যাড়ার প্রত্যক্ষ দৃষ্টিতে বিলাসীর যে শীর্ণ রূপ প্রকাশিত হয়েছে তা একজন মা, একজন প্রেমিকা, একজন কন্যার রূপ। প্রতিটি সত্তার সংমিশ্রণে গড়ে ওঠে নারী। নারীর প্রকৃত রূপ কল্যাণকামী। চিরন্তন মাতৃস্নেহের পরশে আগলে রাখার রূপ। ভালোবেসে প্রেমিকের জন্য প্রহর গোনা আর স্বামীর জন্য স্ত্রীর অপরিমেয় ভালোবাসার রূপ। বিলাসী একের ভেতর অনন্য। প্রেমিকের জন্য তার যেমন বিদীর্ণ রজনী ঘুমহীন কেটেছে ঠিক তেমনই তার কল্যাণকামী হয়ে খুড়ার অর্তকিত আক্রমণে নিজের কথা না ভেবে চিন্তার ছাপ পড়েছে। একজন মুমূর্ষু রোগীর কঠিন সেবায় জীবন ফিরিয়ে আনাকে সমাজ সাধুবাদ জানায়নি। বরং খুড়া রূপী মনুষ্যত্বের বলি হওয়া কিছু মানুষের কাছে নীচু জাতের হাতে ভাত খেয়ে অন্নপাপে দুষ্ট মৃত্যুঞ্জয়। তাই রাতের অন্ধকারে পাশবিকতার শিকার হয় বিলাসী। সমাজের চোখে আজও বিলাসীদের পরিবর্তন হয়নি। সমাজ নামক বেড়াজালে আটকে আছে বিলাসীর আর্তদান।

করতেই কী শরৎচন্দ্র শেষে এসেও থমকে গেলেন?

বিলাসী, রতন কি একই চেতনার প্রতিফলিত রূপ? বাঙালি নারী শুধু দুঃখ-শোক-জরাকেই বরণ করে নিজেকে জীবিত রাখে? অন্নপাতের ঘোর টোপ ভেঙে শরৎ বিলাসী এক অমর নারী। যে নির্ভীক। জয়ী। মৃত্যুঞ্জয় নিজের নামকে জয় করতে না পারলেও বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়ী।

বিলাসীর ওপর সমাজের মানুষ নামক মনুষ্যত্বহীন প্রাণীদের অত্যাচার হলেও বিলাসী উদ্বেলিত হয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ের চিন্তায়। বিলাসীকে যখন গ্রামের বাইরে রেখে আসার জন্য টানা-হিঁচড়া করা হচ্ছে তখন সে মিনতি করে বলে, ‘বাবুরা আমাকে একটি বার ছেড়ে দাও, আমি রুটিগুলো ঘরে দিয়ে আসি। বাইরে শিয়াল-কুকুরে খেয়ে যাবে, রোগা মানুষ সমস্ত রাত খেতে পাবে না।’ আলোচ্য বাক্যের মধ্যে দিয়ে বিলাসীর প্রেমভাব, মমতাময়ী মনের প্রকাশ পেয়েছে। এই ভালোবাসার স্পর্শ আমরা পায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পোস্টমাস্টার গল্পের রতনের মধ্যেও। রতন যখন একা নির্জন পল্লীতে পোস্টামাস্টারকে সেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে সেখানেও মমতাময়ী মাতা, প্রেয়সীর রূপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দুই নারীর প্রেমময়ী রূপ দুই মেরুতে গড়ে উঠলেও কেন্দ্রবিন্দু একই। ভালোবাসাই সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে। রতনকে পোস্টমাস্টার জাত-পাতভেদে গ্রহণ না করলেও শরৎ ঠিকই বিলাসীর প্রেমকে স্বাীকৃতি দিয়েছেন। তার ভালোবাসার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে শেষ পর্যন্ত বিয়েও দিয়েছেন। শরৎচন্দ্র যেখানে গোঁড়ামিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ সেখানে গল্পে জিইয়ে রেখেছেন প্রেম। এমনকি শেষ পর্যন্ত তাঁর গল্পে পায়, ‘ফিরিয়া ফল কী, পৃথিবীতে কে কাহার’ (পোস্ট্‌মাস্টার)!

বিলাসী, রতন একই সমান্তরালে গড়ে ওঠা নারী সত্তা। প্রেম, মায়া, মমতায় ভরা দুই নারী। তবে নারীর রূপ ভিন্ন নয়। তাই তাদের আত্মিকতায় তারা আত্মার আত্মীয়। বিলাসী হয়ে উঠেছে চিরন্তন প্রেমিকা। মৃত্যুঞ্জয়ের সাপের কামড়ে মৃত্যু এবং বিলাসীর আত্মহনন ভালোবাসার জয়কে সূচিত করে। কিন্তু সমাজ সবসময়ই এক অন্ধকারে হাতড়ে চলে তাদের চিরন্তন প্রথার সমীকরণে। তাই মৃত্যুঞ্জয়ের মৃত্যু হয়েছে অন্নপাপের ফল আর সেই ফল থেকে রক্ষা পায়নি বিলাসী। এ যেন অনেকটা ঘুরেফিরে জাত-পাতকে ভাঙতে গিয়ে তিমিরেই প্রবেশের নামান্তর। মৃত্যুর মাঝে সর্গজয়ী হলেও সমাজের মাঝে তারা জাত-পাতেই আটকে গেছে। প্রেম, দাম্পত্যের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ধোঁয়াশা হয়ে গেছে। সমাজকে শান্ত করতেই কী শরৎচন্দ্র শেষে এসেও থমকে গেলেন?

বিলাসী, রতন কি একই চেতনার প্রতিফলিত রূপ? বাঙালি নারী শুধু দুঃখ-শোক-জরাকেই বরণ করে নিজেকে জীবিত রাখে? অন্নপাতের ঘোর টোপ ভেঙে শরৎ বিলাসী এক অমর নারী। যে নির্ভীক। জয়ী। মৃত্যুঞ্জয় নিজের নামকে জয় করতে না পারলেও বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়ী।